বেশিরভাগ ছবিই নির্মীয়মাণ ফ্ল্যাটের ছবি ৷ ক্লায়েন্টদের দেখাবার জন্যে বোধহয় তুলে রেখেছে কৌশিক ৷ একটা ছোট হাই তুলে ফোনটা রেখে দিতে যাচ্ছিল মুনিয়া ৷ হঠাৎ শেষ ছবিটায় চোখ পড়তেই সে ধড়মড় করে উঠে বসল ৷ মনে হল তাকে যেন সাপে ছোবল মেরেছে ৷ আরে! এই মেয়েটার মুখটা তো চেনা ৷ কে যেন? কে যেন?
দেবযানী ৷ দেবযানী মিত্র ৷ সেদিন দুপুরে কৌশিক যখন ঝড়ের মতন ঘরে ঢুকেছিল, বলেছিল প্রাণ বাঁচাতে ও তুষকাঠিতে গিয়ে লুকোবে, সেই মুহূর্তে টেলিভিশনের প্রত্যেকটা চ্যানেলে ব্রেকিং-নিউজ হিসেবে এই মেয়েটার আত্মহত্যার খবর দেখাচ্ছিল ৷
হ্যাঁ, কোনো ভুল নেই ৷ সেদিন আরো লক্ষ লক্ষ মানুষের মতন শোকে আতঙ্কে স্তব্ধ হয়ে অনেকক্ষণ ধরে এই মুখ দেখেছে মুনিয়া ৷ মনে মনে ভেবেছে, কী ভুল যে করতে পারে এই অ্যাডেলোসেন্ট মেয়েগুলো! আর পুরুষগুলোও কম জানোয়ার হতে পারে না ৷ অনেকক্ষণ ধরে অনেক আগ্রহ নিয়ে দেখেছিল বলেই মুনিয়ার বুকের মধ্যে মেয়েটার ছবি আর তার করুণ পরিণতি গাঁথা হয়ে গিয়েছিল ৷ এই মুহূর্তে তার চোখের সামনে জ্বলজ্বল করছে সেই মেয়েটারই অন্য একটা ছবি, একটু পাশ থেকে তোলা ৷ উজ্জ্বল হাসিতে ভরে আছে দেবযানীর মুখ ৷ বেপরোয়া প্রাণশক্তি যেন উপচে পড়ছে মুখের প্রত্যেকটা রেখা থেকে ৷ ও জানত না, ওই বেপরোয়া স্বভাবের জন্যেই ও মরবে ৷
দেবযানীর মৃত্যু আর কৌশিকের ঊর্ধ্বশ্বাসে আসানসোল ছেড়ে পালানো — এই দুটো ঘটনাকে এক সুতোয় গেঁথে ফেলতে ঠিক এক সেকেন্ড সময় লাগল মুনিয়ার ৷ কৌশিক … কৌশিকই তার মানে দেবযানীর হত্যাকারী ৷
মুনিয়া তারপর অনেকক্ষণ ধরে ভাবল, সে কী করবে? সে কি সকলকে জানিয়ে দেবে ওই খুনিটার স্বরূপ? তাহলে তার নিজের জীবনটা শেষ হয়ে যাবে ৷ সেটা বড় কথা নয় ৷ শেষ হয়ে যাবে বেচারা বাবা-ও ৷ সেটা মুনিয়া ভাবতে পারে না ৷
তাহলে কি সে গোপন করে যাবে পুরো ব্যাপারটাই? তার বদলে প্রতিদিন, প্রতিমুহূর্ত এক খুনি বদমাইশের সঙ্গে দিনযাপনের যন্ত্রণা সহ্য করবে?
কে তাকে বলে দেবে কোনটা ঠিক রাস্তা?
একজনের কথাই মনে পড়ল মুনিয়ার ৷
.
রঞ্জন আজকাল খুব শান্তি খোঁজে, কিন্তু পায় না ৷ তার মাথার ভেতরটা সবসময়ে কেমন যেন জ্বালা করে ৷ কখনো কখনো সে তুষকাঠি গ্রাম পেরিয়ে চলে যায় অজয়ের তীরে ৷ সেখানে গভীর রাতে যারা আসে তারা কেউ মুনিয়াকে চেনে না ৷ তারা কেউ মানুষী ভালোবাসার কথা বলে না ৷ বলে অনেক দূরের রহস্যময় জগতের কথা ৷ তারা রঞ্জনকে নিয়ে তন্ত্রের মণ্ডলের ধারে বসিয়ে রাখে ৷ সেখান থেকে রঞ্জন আবার উঠে যায় অন্য কোনো ছায়াশরীরের কাছে, সেখান থেকে আবার আর এক জায়গায় ৷ কেউ একা বসে থাকে, আবার কোথাও দুজন নারীপুরুষ ৷ দলবদ্ধভাবেও সাধকেরা দাঁড়িয়ে থাকেন কোথাও কোথাও ৷ কেউ নারী নিয়ে সাধনা করে, কেউ শবদেহ নিয়ে ৷ নিভন্ত হোমের কুণ্ডের মধ্যে ফটাস শব্দ করে ফেটে যায় শ্মশান থেকে তুলে আনা করোটি ৷ কোথাও আগুনে দেশি মদের আহুতি পড়লে দপ দপ করে জ্বলে ওঠে নীল শিখা ৷
এই সবই রঞ্জনের ভারী পছন্দ ৷ তার মাথার মধ্যে নিরন্তর অর্থহীন যে ছবিগুলো ভেসে যায়, তাদের সঙ্গে অজয়ের তীরের এই কায়াসাধকদের সাধনপদ্ধতির ভারী মিল ৷ এদের মনের ভেতরেও তার মতন একটা জ্বালা আছে ৷ এরাও মনে হয় শান্তির খোঁজেই এত সব করে বেড়াচ্ছে ৷ এরাই তাহলে তার আত্মীয় — ভাবে রঞ্জন ৷
সে খুব একটা ভুল ভাবে না ৷ ওইসব হঠযোগীরাও রঞ্জনকে ভালোবাসে, কাছে ডাকে ৷ কেউ কেউ বলে, তুমি বাবা আমাদের থেকে অনেকটা এগিয়ে গেছ ৷ তারাই কেউ কেউ রঞ্জনকে নানারকম ক্রিয়াকরণের কথা বলে ৷ রঞ্জন ঘরে বসে হোম করে, শিবাভোগ দেয় ৷ কিন্তু সবকিছুর মধ্যেও থেকে থেকে তার মনকে ভাসিয়ে নিয়ে চলে যায় অলকা-তিলকায় সাজানো মিষ্টি এক কনেবউয়ের মুখ — মুনিয়ার মুখ ৷
ঈশ্বরের প্রতিদ্বন্দ্বী ওই মেয়েটা ৷ বাড়ির পেছনের বাগানে ছায়াচ্ছন্ন এক কোণে বসে রঞ্জন ভাবে, মুনিয়াকে ভুলতে না পারলে সে পরম আনন্দকে পাবে কেমন করে?
লেবুগাছের ঘন ডালপালার আড়ালে চিড়িক-পিড়িক করে একটা টুনটুনি ডেকে চলে ৷ আর কোথাও কোনো শব্দ নেই ৷ রঞ্জন ভাবে পুতুলনাচ দেখানো সেই বেদেদের দলটার কথা ৷ তার মুখ থেকে দুর্ভাবনার মেঘটা একটু একটু করে সরে যায় ৷ সে ভাবে, বেদেরা যদি পারে তাহলে আমিই বা পারব না কেন? ওরাও তো সাধক ৷ তাই বলে কি সংসার ছেড়েছে? সংসারকে সঙ্গে নিয়েই ওরা কেমন গ্রাম থেকে গ্রামে, দেশ থেকে দেশে ঘুরে বেড়ায় ৷ তাহলে?
বেদেদের ব্যাপারে রঞ্জনের ভাবনাটার ভেতরে পাগলামি নেই ৷ সত্যিই এই পুতুলনাচ দেখানোটা একইসঙ্গে বেদেদের জীবিকা এবং ধর্ম ৷ ধর্মীয় নিষ্ঠায় ওরা এই কাজ করে ৷
হাজার জমিজিরেত দিলেও ওরা চাষ করবে না, পাকা ঘর বাঁধবে না; ওরা যাযাবরের জীবনই যাপন করবে ৷ মেলা থেকে মেলায় ঘুরে ঘুরে খেলা দেখিয়ে বেড়াবে ৷
বছরের পর বছর কেটে যায়, যুগের পরে যুগ ৷ কত লোকশিল্পে কতরকমের বেনোজল ঢুকে যায় ৷ কিন্তু ওদের পুতুলের পালাগানে কোনো বদল আসে না ৷ বদল আসে না পুতুলগুলোর চেহারায় কিংবা সাজপোশাকেও ৷ অদ্ভুত কিছু প্রেম, প্রতিহিংসা আর পুনর্মিলনের গল্প ৷ নায়ক-নায়িকাদের নামগুলো হিন্দু পুরাণ বা রূপকথার কোনো চরিত্রের সাথে মেলে না ৷
