আঃ, এই তো! এই তো তিনি যা চাইছিলেন ৷ একটা হাত ৷ পুরো হাতও নয়, কব্জির ওপর থেকে বাহু অবধি সামান্য অংশ ৷ ডানহাতে ভিডিও ক্যামেরাটা ধরে বাঁ হাত দিয়ে লোকটা নিশ্চয় মেয়েটার অবস্থান ঠিক করতে গিয়েছিল ৷ সেই সময়েই বাড়িয়ে ধরা বাঁ হাতের কিছুটা অংশ এই ফ্রেমটার মধ্যে চলে এসেছিল ৷ মৃদুলবাবু মনিটরের ওপর ঝুঁকে পড়লেন ৷ পাওয়া যাবে না? কোনো সূত্রই কি পাওয়া যাবে না এই ছবিটা থেকে? কোনো আইডেন্টিফিকেশন মার্ক? কোনো ক্ষতচিহ্ন? জরুল?
নাঃ, কিচ্ছু দেখা যাচ্ছে না ৷ মৃদুলবাবু ফ্রেমটাকে জুম করে শুধু হাতটাকে অনেকগুণ বর্ধিত করে তুললেন ৷ আরেঃ! ওই দাগগুলো কীসের? কনুইয়ের একটু ওপরে খুব ছোট ছোট লালচে ফোটাগুলো? আশেপাশে একই রকম ছোট ছোট দাগ, একটু কালো হয়ে এসেছে ৷ সিরিঞ্জের পাংচার মার্ক ৷ কোনো ভুল নেই এতে ৷ বার বার ছুঁচ ফোটানোর ক্ষতচিহ্ন ওগুলো ৷ কোনোটা টাটকা, আবার কোনোটা লুকিয়ে এসেছে ৷ ছেলেটা ড্রাগ অ্যাডিক্ট ৷
মৃদুলবাবু টেবিল থেকে ফোনটা তুলে এক্সটেনশন নাম্বার ডায়াল করে সদর থানার ও.সি. বিপুল সরকারকে ডাকলেন ৷ একটা জিনিস দেখে যান মিস্টার সরকার ৷ মজার জিনিস ৷ তার গলা শুনেই বোঝা যাচ্ছিল এখন তিনি অনেক রিল্যাক্সড ৷
সন্ধের মধ্যে সদর থানার লক-আপে শহরের ন’জন ড্রাগ পেডলারকে ঘাড় ধরে বসিয়ে দিলেন বিপুল সরকার ৷ হাতে দেবযানীর একটা ছবি নিয়ে সেখানে ঢুকলেন মৃদুল মুস্তাফি ৷
ন’জনের মধ্যে তিন জন পেডলার ফোটো দেখে দেবযানীকে চিনতে পারল ৷ বলল, মেয়েটাকে একজন খরিদ্দারের সঙ্গে ঠেকে আসতে দেখেছে ৷ সেই তিনজনের কাছ থেকে যা ডেসক্রিপসন পাওয়া গেল তাতে খরিদ্দারটি লম্বা, রোগা, গায়ের রং ফর্সা ৷ বয়েস চৌত্রিশ- পঁয়ত্রিশ হবে ৷ তবে তাকে চেনার সবচেয়ে সহজ উপায় মাথার চুল ৷ একদম স্প্রিং-এর মতন কোঁকড়া চুল ছিল ছেলেটার ৷
আরো জানা গেল, গত তিন দিন ছেলেটা মালের সাপ্লাই নিতে আসেনি ৷
মৃদুল মুস্তাফি পেডলারদের থেকে যা জানবার জেনে নিয়ে বিপুলবাবুকে বললেন, এদের ছেড়ে দিন মিস্টার সরকার ৷ তারপর একটু আমার সঙ্গে বেরোবেন ৷
জিপটাকে থানার বাইরে বার করে ও.সি. বিপুল সরকার বললেন, কোনদিকে যাবেন স্যর?
ছেলেটা যদি ট্রেনে বা বাসে করে কোথাও পালিয়ে গিয়ে থাকে তাহলে লোকেট করতে সময় লাগবে ৷ তবে যদি গাড়ি ভাড়া করে গিয়ে থাকে … আচ্ছা এখানকার ট্যাক্সি স্ট্যান্ডটা কোথায়?
স্টেশনেই ম্যাক্সিমাম গাড়ি দাঁড়ায় ৷
তাহলে চলুন, স্টেশনের দিকেই যাই ৷
ট্যাক্সি অ্যাসোসিয়েশনের ঘরে অ্যাসোসিয়েশনের সেক্রেটারি রতন কোঙার দুই পুলিশ অফিসারকে মহা সমাদর করে ডাবের জল টল খাওয়ালেন ৷ মেম্বারদের কাছে কোঁকড়া চুল ফর্সা মতন প্যাসেঞ্জারের খোঁজটাও তিনিই করে দিলেন ৷ পনেরো মিনিটের মধ্যে বছর পঁচিশের একজন ড্রাইভারকে নিয়ে মৃদুলবাবুদের সামনে হাজির করলেন সেক্রেটারিসাহেব ৷ মুখে সাপল্যের হাসি ৷ বললেন, এই যে স্যার শ্যামল ৷ উনচল্লিশ শূন্য ছয় গাড়িটা চালায় ৷ ওই-ই নিয়ে গিয়েছিল ৷ কী জিজ্ঞেস করবেন ওকে জিজ্ঞেস করুন ৷ না, না, কিচ্ছু লুকোবে না স্যর ৷ ওর কী স্বার্থ বলুন ৷
একটু পরে থানার দিকে ফিরতে ফিরতে মৃদুলবাবু বললে, আজ রাত হয়ে গেছে ৷ কাল সকালেই তাহলে আমরা রওনা হয়ে যাব তুষকাঠি ৷ শ্যামল, তুমি আজ তোমার গাড়ি নিয়ে থানা কম্পাউন্ডেই থাকো ৷ আর তোমার মোবাইল ফোনটাও আমাকে দিয়ে দাও ৷ কিছু মনে কোরো না, সামান্য সাবধানতা আর কী?
.
হেমন্তের পূর্ণিমা আজ ৷ মেলার শেষদিন ৷
মুনিয়া দুপুরবেলা খাওয়াদাওয়ার পরে কিছুক্ষণ নীচে বাবার কাছে বসেছিল ৷ বাবা চেয়ারে, ও লাল সিমেন্টের মেঝের ওপর থেবড়ি কেটে ৷ বাবা ওর চুলে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলেছিলেন, এত রোগা হয়ে গেছিস কেন বল তো মুন্নি-মা? তারপরে একটু ইতস্তত করে এমন একটা প্রশ্ন করেছিলেন, যেটা বাবাদের নয়, মায়েদের প্রশ্ন ৷ — কৌশিকের সঙ্গে তোর মিলমিশ আছে তো?
মনের দুঃখ মনে লুকিয়ে রেখে মুনিয়া বাবার হাঁটুতে চিবুক রেখে জিজ্ঞেস করেছিল, হঠাৎ এই কথা?
না, দুজনে কীরকম যেন ছাড়া ছাড়া ঘুরে বেড়াচ্ছিস ৷
ওসব কিছু না, বর-বউয়ের মধ্যে মাঝে মাঝে মন কষাকষি তো হবেই ৷ তোমাকে অত ভাবতে হবে না ৷
বিপত্নীক, হৃদরোগে জর্জরিত মানুষটাকে কোনো দুঃখের কথাই জানাবে না মুনিয়া ৷ এ ব্যাপারে সে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ৷ জানালে মানুষটা বাঁচবে না ৷
একটু বাদে বাবা ঘুমিয়ে পড়লে মুনিয়া দোতলায় নিজের ঘরে উঠে এসেছিল ৷ কৌশিক যথারীতি কোথায় কোথায় ঘুরে বেড়াচ্ছে ৷ একবার ফিরেছিল ৷ স্নান করল না ৷ ভাতের থালার সামনে নাম কে ওয়াস্তে একবার বসল ৷ মুখে প্রায় কিছুই তুলল না ৷ মুনিয়ার বুক ভেঙে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল ৷ এই মানুষটাকে সে কিন্তু ভালোবাসার কম চেষ্টা করেনি ৷ একে জড়িয়ে ধরেই রঞ্জনের শোক ভুলতে চেয়েছিল ৷ কিন্তু কিছুই হল না ৷ বালিশের মধ্যে মুখ গুঁজে মুনিয়া ভাবছিল, তার মতন কপাল ক’টো মেয়ের হয়? একদিকে এক সন্ন্যাসী, আর এক দিকে মাদকাসক্ত ৷ দুজনের মধ্যে ছিন্নভিন্ন হয়ে যাচ্ছে তার সমস্ত অস্তিত্ব ৷
বালিশের নীচে কী যেন গোঁজা আছে, শক্ত জিনিসটা মুনিয়ার গালে বিঁধছিল ৷ সে হাত গলিয়ে বুঝল কৌশিকের সেল-ফোন ৷ মুনিয়া ওটাকে বালিশের নিচ থেকে বার করে আনল ৷ এই তুষকাঠি গ্রামে জিনিসটার কোনো উপযোগিতা নেই ৷ সেইজন্যেই কৌশিক এটা ফেলে গেছে ৷ বালিশে মাথা রেখে মুনিয়া অন্যমনস্কভাবেই ফোনটার মেনু বাটন-এ হাত দিল ৷ সে অন্যমনস্কভাবেই ক্লিক করল ক্যামেরা অপশনে ৷ সেখান থেকে আর এক ক্লিকে পৌঁছে গেল ফোটো অ্যালবামে ৷ মোবাইলে স্টোর করে রাখা ছবিগুলো এক এক করে দেখতে লাগল ৷
