এরপরেই মেয়েটা ওদের ফ্ল্যাটের সাততলার ছাদ থেকে ঝাঁপ মেরেছিল ৷ এ ক্ষেত্রে গুছিয়ে লেখা সুইসাইড- নোট আশাই করা যায় না ৷ তাছাড়া এটা কি নিছক সুইসাইড? এর চেয়ে নিষ্ঠুরভাবে কোনো মেয়েকে খুন করা যায় কি?
অতএব প্রশ্ন থেকেই যায়? কে সেই খুনি? কী ছিল তার মোটিভ?
মৃদুলবাবু শখের গোয়েন্দা নন, পুলিশ ৷ তাই তিনি খুব প্রথাগত পথে তদন্ত শুরু করলেন ৷ প্রথমে জানবার চেষ্টা করলেন, কোন মেল-অ্যাড্রেস থেকে ওই নগ্ন ছবিগুলো নেটে ছড়ানো হয়েছে ৷ উত্তর এল, আসানসোলেরই একটা সরকারি অফিসের ই-মেল অ্যাড্রেস থেকে ৷ সময়টা রাত সাতটার পর, যখন ওই অফিস তালাবন্ধ থাকে ৷ স্পষ্টতই অ্যাড্রেসটা হ্যাক করে বার করা হয়েছে ৷ ইন্টারন্যাশনাল পাসওয়ার্ডটাও ওই অফিসের ৷ অতএব ওইদিকে তদন্তের পথ বন্ধ হয়ে গেল ৷
এরপর মৃদুল মুস্তাফি দেবযানীর বাবা-মা এবং দিদির সঙ্গে দেখা করলেন ৷ তাদের যা যা প্রশ্ন করলেন, এবং যা উত্তর পেলেন তার সারমর্ম হচ্ছে পরিবারটার মধ্যে কোনো বাঁধন বা শৃঙ্খলা কিছুই নেই ৷ দেবযানীর বাবা, মা আর দিদি তিনজনেই চাকরি করেন ৷ বাবার চাকরিটা কর্পোরেট ম্যানেজারের, কোটিপতি লোক ৷ দেবযানী কোথায় যাচ্ছে, কী করছে তার ওপরে কারুরই নজর রাখার সময় ছিল না ৷ ভিডিওতে যে ঘর, যে বিছানা দেখা যাচ্ছে তা দেবযানীর নিজের ঘর, নিজের বিছানা ৷ এই কথাটা জানার পর মৃদুলবাবু লুকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন ৷ হোটেল হলে খোঁজখবর নেওয়া যেত ৷ হোটেলের কর্মচারীদের কাছে মেয়েটার ছবি দেখিয়ে পুরুষ-সঙ্গীটির একটা ডেসক্রিপশন বার করে নেওয়া যেত ৷ কিন্তু আপাতত সে আশাতেও চিটেগুড় ৷
দেবযানীর মোবাইলের কলবুকে একটা নম্বর থেকে প্রচুর কল এবং এস.এম.এস এসেছে ৷ সেই নম্বরটাতেই দেবযানীও অনেক কল করেছে ৷ স্পষ্টতই এই সেই প্রেমিকের নম্বর ৷ সার্ভিস প্রোভাইডারের কাছে খোঁজ নিয়ে জানা গেল, নম্বরটা সিকিমের ৷ সেন্ডুপ লামা নামে জনৈক বৌদ্ধ সন্ন্যাসীর নামে সিমকার্ডটা কেনা হয়েছিল ৷ শিলিগুড়ির পানের দোকানগুলোতে পয়সা দিলে যে এরকম জাল নাম-ঠিকানার সিমকার্ড পাওয়া যায় সে কথা মৃদুলবাবুর জানা ছিল ৷ অতএব ওদিকেও তিনি আর পণ্ডশ্রম করলেন না ৷ আরো একটা জিনিস জানা গেল — কলগুলো সব এই আসানসোলের টাওয়ার থেকেই করা ৷ তবে এটা তো আন্দাজ করাই যাচ্ছিল ৷ এমন শারীরিক প্রেম তো দূরে বসে করা যায় না ৷ অতএব সেই গোপন প্রেমিক এই আসানসোলেরই বাসিন্দা, পার্মানেন্ট অথবা টেম্পোরারি ৷
দেবযানীর মা একটা তথ্য দিলেন ৷ যেদিন দুর্ঘটনাটা ঘটেছে তার থেকে ঠিক একসপ্তাহ আগে দেবযানী কলেজ-এক্সকার্সনের নাম করে ওনার কাছ থেকে চারহাজার টাকা নিয়েছিল ৷ দেবযানীর নিজস্ব একটা অ্যাকাউন্ট খুলে দিয়েছিলেন ওর বাবা, যাতে ওনাদের অনুপস্থিতিতে হঠাৎ কোনো প্রয়োজনে দেবযানী ডেবিট কার্ডে টাকা তুলে নিতে পারে ৷ সেখানে প্রায় হাজার পঁচিশেক টাকার ব্যালেন্স সবসময়ইে থাকে ৷ তবু মেয়ে তার কাছে টাকা চাইছে কেন ভেবে ওর মা একটু অবাক হয়েছিলেন ৷ মেয়েকে জিজ্ঞেসও করেছিলেন সে কথা ৷ তাতে দেবযানী না কি উত্তর দেয়, এ টি এমে বড় নোট, মানে পাঁচশো হাজার টাকার নোটে পেমেন্ট দেয় ৷ অথচ কলেজ কর্তৃপক্ষ ওদের বলেছে একশো টাকার নোটে ফিজ জমা দিতে ৷ ওর মা আর কিছু না বলে টাকাটা দিয়ে দিয়েছিলেন ৷
দেবযানীর কথাটা একটা তাড়াতাড়িতে বানানো হাস্যকর মিথ্যে অজুহাত সেটা বুঝতে মৃদুলবাবুর অসুবিধে হল না৷ তিনি দেবযানীর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে খোঁজ নিলেন এবং যখন দেখলেন যে সেখানে এক পয়সাও ব্যালেন্স নেই তখন একটু নিশ্চিন্ত হলেন ৷ তাহলে ব্ল্যাকমেইলড হচ্ছিল মেয়েটা ৷ এবং যে মুহূর্তে ছেলেটাকে আর টাকা জোগাতে পারেনি, সেই মুহূর্তেই ছেলেটা ওর সর্বনাশ করে দিয়েছে ৷ মোটিভ পাওয়া গেল ৷ কিন্তু কালপ্রিটকে খুঁজে পাওয়ার ব্যাপারে তো এখনো হাতে রইল পেন্সিল … থুড়ি, কি-বোর্ড ৷
থানার বাইরের চায়ের দোকানের ছেলেটা গ্লাসে চা দিয়ে গিয়েছিল ৷ সেই চায়ে একটা চুমুক দিয়ে মৃদুলবাবু আবার নতুন করে ভিডিও-টা দেখতে বসলেন ৷ একটা অদ্ভুত চিন্তা তার মাথার মধ্যে উঁকি দিয়ে গেল ৷ মানুষের যৌনতা ব্যাপারটা কী ভীষণভাবে মনের সঙ্গে জড়িত ৷ তিনি যেহেতু জানেন যে মেয়েটা মরে গেছে, সুইসাইড করেছে, তাই তার নগ্ন ছবি তাকে এতটুকুও উত্তেজিত করছে না ৷ যদি না জানতেন, তাহলে বাকি যে একলক্ষ কতহাজার পুরুষ যেন ভিডিওটায় লাইক দিয়েছ তিনিও নিশ্চয় তাদের মতনই ওটাকে চোখ দিয়ে চাটতেন ৷
কম্পিউটারের কিছু অ্যাডজাস্টমেন্টের ফলে ছবিগুলো এখন খুব ধীর গতিতে একটার পর একটা ফ্রেম হিসেবে তার চোখের সামনে দিয়ে ভেসে যাচ্ছে ৷ প্রত্যেকটি ফ্রেমকে তিনি খুঁটিয়ে দেখছেন, যদি কোনো তথ্য পাওয়া যায় ব্ল্যাকমেইলারটার সম্বন্ধে ৷ নাঃ ৷ অত্যন্ত ধূর্ত এই ফোটোগ্রাফার ৷ কোথাও সে নিজে ধরা দেয়নি ৷ একটা রুমাল, একটা সানগ্লাস, ছেড়ে রাখা জামা, এমন কিচ্ছু নেই কোনো ফ্রেমের মধ্যে যার থেকে তাকে কোনোভাবে আইডেন্টিফাই করা যায়৷ ক্রমশ হতাশা গ্রাস করছিল সি.আই.ডির পোক্ত অফিসারটিকে ৷ হঠাৎ একটা ফ্রেম তার চোখের সামনে দিয়ে চলে যেতেই খাড়া হয়ে বসলেন মৃদুলবাবু ৷ মাউসের একটা ক্লিকে আবার ফ্রেমটাকে ফিরিয়ে আনলেন মনিটরে ৷ তারপরে ফ্রিজ করে দিলেন সেটাকে ৷
