তবে মুনিয়ার সবচেয়ে ভালো লাগত পুতুলনাচ ৷
বড় হয়ে মুনিয়া এদিক-ওদিক আরো অনেক মেলা দেখেছে — রানিগঞ্জে পিরবাবার মেলা, জয়দেবের মেলা, পৌষমেলা ৷ কিন্তু তাদের তুষকাঠির মেলায় যে পুতুলনাচের দল আসে, এমনটা সে আর কোনো মেলায় দেখেনি ৷
প্রচলিত পুতুলনাচ থেকে একটু অন্যরকমের এই নাচ ৷ এরা ওপর থেকে সুতোর টানে ছোট ছোট পুতুলকে নাচায় না; মানুষপ্রমাণ বড় বড় পুতুলকে কোমরের নীচ থেকে তুলে ধরে ঘোরায় ফেরায় ৷ নিজেরা থাকে মঞ্চের নীচে টিনের শিট দিয়ে আড়াল করা অংশে ৷ সেখান থেকে পুতুলগুলোকে মাথায় ওপর তুলে ধরে নাচায় ৷
পুতুলগুলো বোধহয় হালকা কাগজের মণ্ডের মতন কোনো জিনিস দিয়ে তৈরি, অনেকটা জামাকাপড়ের দোকানের প্লাস্টিকের ম্যানিকিনের মতন করে বানানো ৷ চরিত্র অনুযায়ী সেইসব ন্যাড়া বোঁচা পুতুলের মুখে চুল দাড়ি লাগানো হয় ৷ রাজা সাজালে বাবরি চুল আর পাকানো মোচ ৷ ঝলমলে শেরোয়ানি চুড়িদার ৷ একই পুতুলকে অন্য পালায় প্রয়োজন মতন জটাজুট লাগিয়ে গেরুয়া পোশাক পরিয়ে সন্ন্যাসী বানিয়ে দেওয়া যায় ৷ এমনকী শাড়ি, লম্বা পাটের চুল আর বুকে দুটো নারকোলের মালা ফিট করে রানি ৷
পুতুলের কোমরের নীচে একটা বাঁশের লাঠির মতন কিছু গোঁজা থাকে, যেটা ধরে তাদের নাচানো যায় ৷ দর্শকরা সামনে থেকে দেখতে পায় টিনের শিটের ওপরে জেগে থাকা কোমরের ওপরে অংশটুকু ৷
পুতুলদের হয়ে কথাবার্তা গান টান যা কিছু, সেসব ওই বেদেরাই আড়াল থেকে চালিয়ে যায় ৷
নিতান্তই গ্রাম্য বিনোদন ৷ এক কালে যখন টিভি সিনেমা এইসব ছিল না তখন এই পুতুলনাচ লোক টানত ৷ এখন শহরাঞ্চলে নিশ্চয় পাত্তা পায় না ৷ তবে তুষকাঠির মতন অজ গ্রামে এখনো কিছুটা চাহিদা আছে এই সমস্ত বিনোদনের ৷
.
এ সব দুদিন আগের কথা ৷
আজ কৌশিক রাত দুপুরে বাড়ি ফিরে আসার পর মুনিয়া ওকে জিজ্ঞেস করেছিল কিছু খাবে কি না ৷ ও মাথা নেড়েছিল ৷ আসানসোল হলে মুনিয়া হয়তো কিছু বলত না ৷ কিন্তু এটা তুষকাঠি বলেই সে আর দুয়েকবার কৌশিককে খাওয়ার জন্যে সাধাসাধি করল ৷ কৌশিক সে-সবের উত্তর না দিয়েই বিছানায় চিত হয়ে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ল ৷ পাশে শুয়ে মুনিয়ার ঘুম আসছিল না ৷ বিছানায় শুয়ে শুয়েই সে পায়ের কাছের জানলা দিয়ে দেখতে পাচ্ছিল নদীর তীরে মেলার সারি সারি গ্যাসের আলো টিপ টিপ করে জ্বলছে ৷ পৃথিবীটা এখন কেমন মায়াময় হয়ে আছে ৷ অনেকদিন বাদে আবার তার মনে হচ্ছে কী সুন্দর এই বেঁচে থাকা! সে কি ওই সাদা ধুতি আর উড়নি গায়ে মানুষটার জন্যে, লোকে যাকে ইদানীং খ্যাপা সাধু বলে?
বহুক্ষণ ধরে একটা কথা মুনিয়া মনে মনেও উচ্চারণ করতে পারছিল না ৷ এখন তার বুক ভেঙে সেই কথাটা বেরিয়ে এল ৷ মুনিয়া ফিস ফিস করে বলল, ও কি আমার জন্যেই পাগল হয়ে গেল?
প্রশ্নটা সে কাকে করল, কে উত্তর দেবে, কিছুই জানে না মুনিয়া ৷
.
আসানসোল সদর থানার পেছন দিকের একটা নির্জন ঘর ৷ ঘরটার সবক’টা জানলার পাল্লা শক্ত করে আঁটা ৷ দরজার সামনেও সজাগ পাহারায় একজন কনস্টেবল ৷
ঘরের মধ্যে একটা ছোট টেবিল ৷ তার ওপরে ফাইলপত্র বিশেষ কিছু নেই, কেবল একটা ডেস্কটপ কম্পিউটার ৷ সি.আই.ডি-র সাইবার-ক্রাইম ব্রাঞ্চের ইনভেস্টিগেটিং অফিসার মৃদুল মুস্তাফি সেই কম্পিউটারটার স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে গুম হয়ে বসেছিলেন ৷ তার দুই হাতের মুঠো শক্ত, কপালে বিনবিনে ঘাম জমেছে ৷
মৃদুলবাবুর বয়েস সাতান্ন ৷ পুলিশের চাকরিতে বেশ নীচুতলা থেকে ঘষটে ঘষটে এতদূর উঠেছেন ৷ স্বাভাবিকভাবেই মানবশরীর নিয়ে বীভৎসতা তিনি কম দেখেননি ৷ বোমা বিস্ফোরণে হাত পা উড়ে যাওয়া মৃতদেহ দেখেছেন, রেপ-ভিকটিমের ক্ষতবিক্ষত শরীর দেখেছেন, অগ্নিকাণ্ডে দগ্ধ মৃতদেহের সারি দেখেছেন ৷ কিন্তু এই মুহূর্তে তিনি ল্যাপটপের স্ক্রিনে যা দেখছেন, তা বোধহয় বীভৎসতায় ওই সমস্ত দৃশ্যকে হার মানায় ৷
অথচ তা কোনো মৃত্যুদৃশ্য নয়, বরং নিরপেক্ষ বিচারে তাকে জীবনের উৎসবই বলা যায় ৷ একটি অত্যন্ত প্রাণোচ্ছল কিশোরীর নগ্ন শরীর — ‘ভিডিও ক্যামেরা নানান অ্যাঙ্গেল থেকে ঘুরে ঘুরে সেই শরীরের ছবি দেখাচ্ছে ৷
এই ছবি দেখে যে মৃদুলবাবুর মতন দুঁদে পুলিশ অফিসারেরও গা গুলোচ্ছে তার কারণ, এটা কোনো সাধারণ ব্লু-ফিল্ম নয় ৷ ওই মেয়েটিও নয় কোনো প্রস্টিটিউট ৷
‘মেয়েটার বাড়ি এই আসানসোলেরই মহিশীলা পার্কে ৷ ওর নাম দেবযানী মিত্র ৷ বয়েস আঠেরো বছর সাত মাস ৷ সবেমাত্র বি এ ফার্স্ট ইয়ারে অ্যাডমিশন নিয়েছিল ৷
দেবযানী তিনদিন আগে সুইসাইড করেছে ৷ কারণ ওর ওই ছবিগুলো কেউ একটা জনপ্রিয় সোশ্যাল নেটওয়ার্কে অ্যাটাচ করে দিয়েছিল ৷
দেবযানী কোনো সুইসাইড নোট লিখে যায়নি ৷ সেটাই স্বাভাবিক ৷ সম্ভবত কোনো বান্ধবীর কাছ থেকে নেটে ছবি চালাচালির খবর পাওয়ামাত্রই সে আগে নিজের ল্যাপটপে খবরটার সত্যতা যাচাই করেছিল ৷ ওর সার্চ- মেশিনের হিস্ট্রি মেনুতে এখনো স্ক্রল করলে দেখা যাচ্ছে সেই ছবি ৷ নিজের গোপনতম মুহূর্তগুলোকে এইভাবে বাজারের মাল হয়ে যেতে দেখে মেয়েটা প্যানিকড হয়ে পড়েছিল ৷ যে-ই এ কাজটা করে থাকুক সে যে কতবড় শয়তান তার একটা প্রমাণ যে, সে শুধু ভিডিয়োগুলো অ্যাটাচ করেই ক্ষান্ত হয়নি, তার সঙ্গে দেবযানীর পুরো প্রোফাইল দিয়ে দিয়েছিল — ওর নাম, ঠিকানা, মোবাইল নম্বর সব ৷ ফলে সঙ্গে সঙ্গেই দেবযানীর মোবাইলে ফোন আসতে শুরু করেছিল ৷ ভাষা বিভিন্ন হলেও কলগুলোর বক্তব্য মোটামুটি এক ৷ তোমার শরীর খুব সুন্দর ৷ তোমাকে বিছানায় পেতে চাই ৷ রেট কত?
