মুনিয়া নিজের এই হীন জীবন নিয়ে নিজের মধ্যে গুটিয়ে গিয়েছিল ৷ কাউকে কিছু বলত না, কোথাও যেত না ৷ বিয়ের একবছরের মধ্যে মা মারা গেল ৷ তাতে একদিক দিয়ে সুবিধেই হল ৷ মা যতটা খুঁটিয়ে সন্তানের খোঁজ নেয়, তার মুখের রেখা থেকে খুঁজে বার করে সুখ-দুঃখের কথা, তেমনটা তো আর কেউ পারে না ৷ অতএব মুনিয়া আসানসোলের সেই দু-কামরার ফ্ল্যাটেই বন্দিজীবন বেছে নিয়েছিল ৷ তুষকাঠি যেত বছরে একবার, পুজোর পরে ৷ যেদিন যেত সেদিনই ফিরে আসত ৷ বাবা হাজার বললেও থাকত না বেশিক্ষণ ৷ আর কৌশিক তো বিয়ের পর থেকে কোনোদিনই শ্বশুরবাড়ির রাস্তা মাড়ায়নি ৷
তাই দুদিন আগে কৌশিক নিজেই যখন তুষকাঠি যাবার কথা বলল, তখন মুনিয়া দারুণ অবাক হয়েছিল ৷ সাধারণত যে সময়ে ও বাড়ি ফেরে সেদিন তার থেকে অনেক আগেই কৌশিক বাড়ি ফিরে এল ৷ দেখেই বোঝা যাচ্ছিল অসম্ভব টেনশনের মধ্যে রয়েছে ৷ ঘরে ঢুকেই মুনিয়ার পা দুটো জড়িয়ে ধরে আর কি ৷ খালি বলে, ‘তুষকাঠি যেতে হবে ৷ চলো, এক্ষুনি বেরিয়ে পড়ি ৷
ব্যাপারটা কী? ভারী অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল মুনিয়া ৷ শ্বশুরবাড়ির ওপর হঠাৎ এত টান?
এখানে থাকলে মারা পড়ে যাব ৷
কেন? জিজ্ঞেস করল মুনিয়া ৷
ন্যাটা দুলাল-কে অনেকদিন ধরে ঘোরাচ্ছি ৷ এইমাত্র শুনলাম ও সুপারি কিলার ফিট করেছে আমাকে মারার জন্যে৷ পালাই … চলো পালাই ৷ হাঁফাচ্ছিল কৌশিক ৷
ওর কথাটা বিশ্বাস করেছিল মুনিয়া ৷
আধঘণ্টার মধ্যে ফ্ল্যাটের দরজায় তালা দিয়ে, স্টেশন থেকে একটা প্রাইভেট-কার ভাড়া করে বর্ধমান আর বীরভূম জেলার সীমানায় গাছপালার মধ্যে লুকিয়ে থাকা এই গ্রামে পৌঁছেছিল ওরা ৷
তুষকাঠি পৃথিবীর সেই বিরল কয়েকটা জায়গার মধ্যে একটা, যেখানে মোবাইলের টাওয়ার নেই ৷ আসলে মাইল মাইল বালিয়াড়ির মধ্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মাত্র দু-তিনটে গ্রামের কয়েকশো মানুষের জন্যে অত হাঙ্গামা করে টাওয়ার বসানোর ব্যাপারটা কোনো সার্ভিস প্রোভাইডারই বাণিজ্যসফল মনে করেনি ৷
বলাই বাহুল্য, তুষকাঠিতে বিদ্যুতও পৌঁছয়নি ৷
বছরের মধ্যে তিনশো পঞ্চান্ন দিন তুষকাঠি তার নিজের অন্ধকার একাকিত্বে ডুবে থাকে, আর দশদিন অদ্ভুত আদিম এক জনসমাগম ঘটে এখানে ৷ সময়টা হেমন্ত মাসের শুক্লপক্ষের শেষ দশদিন ৷ তুষকাঠির ধর্মবাবার থানে সেই ক’দিন এক মেলা বসে, ধর্মরাজের মেলা ৷
ধর্মরাজ অনার্য দেবতা ৷ তার ভক্তরাও অন্ত্যজ ৷ এই মানুষগুলো নিজেদের জন্যে তৈরি করে নিয়েছে ভারী গোপন সব সাধনপদ্ধতি ৷ দেখা যায়, যে মানুষটা সারাবছর অজয়ের ধু ধু বালুর চরে একা একা চাষ করে, তারও রয়েছে এক বীজমন্ত্র ৷ যে অল্পবয়সি বিধবাটি নদীর স্রোতে সারাদিন মাছ খোঁজে, রাত হলে সে-ই এলোচুলে শ্মশানচারিনী ৷ এরকম হাজার হাজার তান্ত্রিক, উদাসী, অবধূতের জন্যে তীর্থের সার তীর্থ হল তুষকাঠি নামে এই গ্রাম, যা নাকি আসলে এক কূর্মপীঠ ৷ গোপন সাধকদের গোপন তীর্থ ৷
হেমন্তের শুক্লপক্ষের ওই ক’দিন সারা রাত ধর্মরাজের থানে পুজোআচ্চা চলে ৷ কুয়াশা এবং তারার আলোর নীচে কিছু ছায়াশরীর অজয়ের জলে অবগাহন সেরে নিয়ে মিলিয়ে যায় তীরভূমির জঙ্গলে ৷ কে জানে, সেখানে কেমন তাদের হঠযোগ?
ওই ধর্মরাজের যানকে ঘিরেই মেলাটা বসে ৷ একেবারেই গ্রামীণ মেলা ৷ চারিপাশে চোদ্দোমাইলের মধ্যে তেমন পয়সাওলা লোকজন নেই বলে বড় বড় দোকানিরা কোনোদিনই এই মেলায় আসতে আগ্রহ বোধ করেনি, আজও করে না৷ বিদ্যুৎ নেই বলে বৈদ্যুতিক নাগরদোলা বসে না, আলো ঝলমল সার্কাসের তাঁবুও দেখা যায় না ৷ আসে কেবল কাঠ আর লোহার গেরস্থালি জিনিস, খাজা আর কদমার হালুইকর, মাটির বেহালা, তালপাতার পাখা, জলভরা রঙিন হাঁস, মাটির পুতুল, টিনের কামান — বছর বছর বাংলার অতীত ফিরে আসে এই মেলায় ৷
কাকতালীয়ভাবে মুনিয়ারা এখানে এসে পৌঁছেছে সেই মেলার মাঝখানে ৷
যেদিন এখানে পৌঁছল তার পরদিন সকালের দিকে মুনিয়া হাতে একটা ঝাড়ন নিয়ে ঘুরে ঘুরে বাপের বাড়ির ফার্নিচারগুলো থেকে ধুলো ঝাড়ছিল আর গুনগুন করে গান গাইছিল ৷ হ্যাঁ, সত্যি ৷ কী যে রয়েছে তুষকাঠির এই লাল ধুলোর পথ, ক্যানালের ধারে সার দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সোনাঝুড়ির সবুজ বন আর মৌরির শরবতের মতন সোনালি মিষ্টি রোদ্দুরের মধ্যে, কী যে ম্যাজিক রয়েছে বাবার ওই মুন্নি-মা ডাকটার মধ্যে, মুনিয়ার বুকের ভেতর জমে থাকা পাথরটা এক রাত্তিরেই একটু হালকা হয়ে এসেছিল ৷
মুনিয়া ধুলো ঝাড়তে ঝাড়তে মেলার কথাই ভাবছিল ৷
কোনো এক সিদ্ধপুরুষের পত্তন করা এই মেলার বয়েস না কি দেড়শো বছরের কাছাকাছি ৷ ক্রেতা এবং বিক্রেতা সকলেই বহু বছর ধরে বংশ পরম্পরায় এখানে আসছে ৷ আজ যে ছেলেটা নাগরদোলার বাঁ পাশে বসে মাটির বেহালা বিক্রি করছে, পঁচিশ বছর আগে ওর বাবা ঠিক ওইখানটাতেই বসে মাটির বেহালা বিক্রি করেছিল ৷ আজ যে বাচ্চাটা ছেঁড়া প্যান্টুলুনের পকেট থেকে পয়সা বার করে ওর কাছ থেকে বেহালা কিনল, পঁচিশ বছর আগে তার বাবা ওইখানে দাঁড়িয়ে, ঠিক ওইভাবে বেহালা কিনেছিল ৷
মুনিয়াও জ্ঞান হওয়ার পর থেকেই মেলার জন্যে সারাবছর হাঁ করে তাকিয়ে থাকত ৷ এত আনন্দ আর কিছুতেই ছিল না ৷ ছোটবেলায় ওদের মতন কমবয়সি ছেলেমেয়েরা ঘুরে ঘুরে বড়দের কাছ থেকে চারআনা আটআনা পার্বণী আদায় করত ৷ তারপর সেই পয়সা নিয়ে দৌড় দিত মেলার দিকে ৷ মাটির বেহালা, চুলের ফিতে, বাদামতক্তি, জলভরা কাচের হাঁস কিনত ৷ নাগরদোলা ঘোরদোলায় চাপত ৷
