নতুন গাড়িটা প্রায় আধঘণ্টা কি তার বেশিক্ষণ চলার পর একটা সাদামাঠা দোতলা বাড়ির কাছে এসে থামল৷ বাড়ির সঙ্গে লাগোয়া বিশাল ফাঁকা জমি৷ সেখানে অগোছালোভাবে ছোট-বড় গাছ দাঁড়িয়ে আছে৷ প্রিয়াংকাকে গাড়ি থেকে নামিয়ে হাত ধরে হাঁটিয়ে নিয়ে চলল ওরা দুজন৷
বাড়িতে ঢোকার পর ওর চোখের ওপর থেকে ইলাস্টিক ব্যান্ড খুলে দিল৷ ওর সাইডব্যাগটা ওর হাতে ফিরিয়ে দিল৷
প্রিয়াংকা চোখ পিটপিট করে চারপাশে তাকাল৷
কয়েক সেকেন্ড পর ওর দৃষ্টি স্বাভাবিক হল৷ তখন বুঝল, বাইরে অন্ধকার হয়ে গেছে৷ বাড়ির ভেতরে টিউবলাইট জ্বলছে৷
লাগেজ টানার ঢঙে ওকে করিডর দিয়ে টেনে নিয়ে চলল ওরা৷ প্রিয়াংকা নিঃশব্দে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল৷ ওর গাল বেয়ে জলের রেখা নেমে চলেছে৷ এতক্ষণে বাপি নিশ্চয়ই ওর খোঁজ করে-করে পাগল হয়ে গেছে৷
করিডরের শেষ প্রান্তে একটা ঘরের সামনে এসে দাঁড়াল ওরা৷ একজন মোবাইল ফোন বের করে কাকে যেন ডায়াল করল৷ তারপর বলল, ‘পাখি খাঁচায় এসে গেছে৷’ বলেই ফোন অফ করে দিল৷
ততক্ষণে আর-একজন ঘরের দরজা ঠেলে প্রিয়াংকাকে ভেতরে ঢুকিয়ে দিয়েছে৷
ঘরটা মাপে মাঝারি গোছের৷ দু-দিকের দেওয়ালে দুটো জানলা—কিন্তু দুটো জানলাই বন্ধ৷ ঘরটা দেখে মনে হয়, গোডাউন বা ভাঁড়ার ঘর৷ বাঁ-দিকের দেওয়াল ঘেঁষে কয়েকটা সিমেন্টের বস্তা আর প্লাস্টার অফ প্যারিসের প্যাকেট৷ তার পাশে দুটো প্লাস্টিকের ড্রাম আর রঙের টিন৷ এ ছাড়া বেশ কয়েকটা ভাঙা চেয়ার-টেবিল এদিক-ওদিক দাঁড় করানো রয়েছে৷ ডানদিকের মেঝেতে কয়েকটা জলের পাইপ আর লোহালক্কড়৷ তার পাশে নীল রঙের কয়েকটা পলিথিন শিট ভাঁজ করে রাখা৷ সবমিলিয়ে মনে হয়, ঘরটা কোনও কনস্ট্রাকশন কোম্পানির গোডাউন৷
ঘরের মেঝেটা নিট সিমেন্ট দিয়ে ফিনিশ করা নেই৷ দেখে বোঝা যায়, এ-ঘরটাকে প্রিয়াংকার অস্থায়ী আস্তানা করার জন্য মালপত্র এদিক-ওদিক সরিয়ে মেঝেটা ঝাঁট দিয়ে সাফ করা হয়েছে৷ ঘরের পিছনের দেওয়ালের কাছাকাছি মেঝেতে একটা বিছানা পাতা রয়েছে৷ সস্তা সবুজ রঙের বেডশিট দিয়ে বিছানাটা ঢাকা৷ পায়ের দিকে ভাঁজ করে রাখা একটা বেডকভার৷
প্রিয়াংকা বুঝল, এই গোডাউনে ওকে এখন থাকতে হবে৷ শুতে হবে এই জঘন্য বিছানায়৷ সঙ্গে-সঙ্গে নতুন একটা ঢেউ শরীরের ভেতর থেকে ওর কান্নাটাকে উথলে দিল৷
প্রিয়াংকাকে ঘরে ঢুকিয়ে দিয়ে যে-লোকটা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ছিল সে বলল, ‘এই ঘরটায় তুমি ক’দিন থাকবে৷ তোমার যা-যা দরকার ওই মাসিকে বলবে—মাসি ব্যবস্থা করবে৷’
লোকটা আঙুল তুলে ঘরের একদিকে দেখিয়েছিল৷ প্রিয়াংকা সেদিক লক্ষ করে তাকাল৷
প্রথমে ভেবেছিল কোনও মূর্তি৷ কিন্তু চোখের পাতা পড়তেই বুঝল মূর্তি নয়—এর প্রাণ আছে৷ প্লাস্টিকের ড্রামের পিছনে শরীরটাকে খানিক আড়াল করে মানুষটা উবু হয়ে মেঝেতে বসে আছে৷ রোগা, আদিবাসী টাইপের চেহারা, কুচকুচে কালো গায়ের রং, চোখ দুটো অস্বাভাবিক উজ্জ্বল, নাকে নথ, কানে দুল, গায়ে একটা ময়লা গোলাপি শাড়ি৷
লোকটা ইশারায় মাসিকে ডাকল৷
মাসি উঠে দাঁড়াল৷ একটু খুঁড়িয়ে-খুঁড়িয়ে হেঁটে এগিয়ে এল প্রিয়াংকাদের কাছে৷
প্রিয়াংকা লক্ষ করল, মাসি পানপরাগ জাতীয় পানমশলা চিবোচ্ছে৷ গাল ফোলা, ঠোঁট শক্ত করে চেপে আছে৷
লোকটা বলল, ‘মেয়েটা রইল৷ ঠিকমতো নজর রেখো৷ দেখো, কোনও অসুবিধে না হয়—৷’
মাসি ‘উঁ’ শব্দ করে মাথা হেলাল৷ প্রিয়াংকাকে আপাদমস্তক খরচোখে জরিপ করল৷ ওর কেমন যেন অস্বস্তি হল৷
লোকটা দু-আঙুলে টুসকি বাজিয়ে প্রিয়াংকার মনোযোগ চাইল৷ তারপর বলল, ‘এবারে তোমার বাবার মোবাইল নম্বরটা ঝটপট দাও৷ আজ রাতে কথা বলতে হবে৷ তারপর দেখি কী বলে…তোমাকে ক’দিন এখানে রাখতে হয়…৷’
প্রিয়াংকা ওর বাপির মোবাইল নম্বর বলল৷ লোকটা পকেট থেকে একটা সেলফোন বের করে বোতাম টিপে নম্বরটা স্টোর করে নিল৷
প্রিয়াংকা কান্না-কান্না গলায় জিগ্যেস করল, ‘আমাকে এখানে…নিয়ে… এসেছেন কেন?’
‘বস জানে৷’ বলে লোকটা গটগট করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল৷
মাসি পিছন-পিছন গিয়ে ঘরের দরজাটা ভেজিয়ে দিল৷ প্রিয়াংকা লক্ষ করল দরজাটায় ভেতর থেকে খিল কিংবা ছিটকিনি লাগানোর কোনও ব্যবস্থা নেই৷
মাসি আঙুল তুলে ওকে ইশারা করে বিছানাটা দেখাল৷ প্রিয়াংকা কোনও কথা না বলে বিছানার কাছে গিয়ে ব্যাগটা নামিয়ে রাখল৷ তারপর ধপ করে বসে পড়ল৷ কান্নাটা ভেতর থেকে আরও জোরে উথলে উঠল৷ মুখে হাত চাপা দিয়ে প্রিয়াংকা শব্দ করে কেঁদে উঠল৷ কান্নার সঙ্গে-সঙ্গে ওর শরীরটা ফুলে-ফুলে উঠতে লাগল৷
কান্নার মধ্যেই প্রিয়াংকা প্লেন উড়ে যাওয়ার শব্দ পেল৷ একবার নয়—বেশ কয়েকবার৷ ওর মনে হল, জায়গাটা নিশ্চয়ই এয়ারপোর্টের কাছাকাছি৷ ওর মাথার মধ্যে নানান চিন্তা ঘুরপাক খেয়ে-খেয়ে গুলিয়ে যাচ্ছিল৷
বাপি নিশ্চয়ই ওর খোঁজ না পেয়ে পাগলের মতো হয়ে গেছে৷ হয়তো পুলিশকেও জানিয়েছে৷ পুলিশ ওর কলেজ, বন্ধুদের বাড়ি, আত্মীয়ের বাড়ি—কোনও জায়গাতেই বোধহয় খোঁজ করতে বাকি রাখেনি৷ তারপর তারা হয়তো কিডন্যাপারদের ফোনকলের জন্য অপেক্ষা করছে৷
কিন্তু এরা মণিরামকে কোথায় সরাল, কী করেই-বা সরাল? প্রিয়াংকাদের গাড়িটাই-বা এখন কোথায়?
