সেদিকে এগোতে-এগোতে চারপাশের গাছপালার দিকে তাকাল ও৷ সবে সাড়ে পাঁচটা বাজে, কিন্তু এর মধ্যেই আকাশ ছাইরঙা হয়ে গেছে৷ বড়-বড় গাছের ফাঁকফোকরে ছোট-ছোট অন্ধকার জমাট বেঁধেছে৷ সেখানে রাত্রিবাস করতে আসা পাখিদের দেখা না গেলেও তাদের ডাক শোনা যাচ্ছে৷
প্রিয়াংকাদের ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজটা সল্ট লেকে৷ কলেজের ক্যাম্পাসটা দারুণ—গাছপালা আর আধুনিক ছাঁদের ঘরবাড়ি দিয়ে একটা মিনি শহরের মতো করে সাজানো৷ ক্যাম্পাস ঘিরে চওড়া-চওড়া রাস্তা৷ রাস্তার দুপাশে কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া, শিমুল আর দেবদারু গাছ৷ কলেজের শুরু আর শেষের সময়টা ছাড়া রাস্তাগুলো প্রায় নির্জন থাকে৷ মাঝে-মাঝে ছুটে যাওয়া গাড়ির আওয়াজ যদি না থাকত তা হলে শুধু পাখির ডাকই শোনা যেত৷ কী দারুণ হত তখন!
প্রিয়াংকার বিষয় ইলেকট্রনিক্স অ্যান্ড কমিউনিকেশান ইঞ্জিনিয়ারিং হলেও পাখির নেশা ওর ছোটবেলা থেকেই৷ পাখির ডাক নকল করে পাখিকে ঠকানোর জন্য ও বাপির কাছে শিস দেওয়া শিখেছে৷ বেশ মনে আছে, তখন ও ক্লাস নাইনে পড়ে৷
এখন রাস্তায় কলেজ ছুটির ব্যস্ততা৷ প্রিয়াংকা জানে, মিনিট-কুড়ি কি আধঘণ্টা পর এই ব্যস্ততা কমে যাবে৷ নেমে আসবে নির্জনতা এবং অন্ধকার৷
গাড়ির দিকে তাড়াতাড়ি পা চালাল ও৷ একটু পরে ডানদিকে ঘুরেই মেরুনরঙা মারুতি অলটোটা ওর চোখে পড়ল৷
গাড়ির কাছে গিয়ে রোজকার অভ্যেস মতো পিছনের দরজা খুলে কাঁধের ব্যাগটা ভেতরে ছুড়ে দিয়ে সিটে বসে পড়ল৷ এবং সঙ্গে-সঙ্গে গাড়ি স্টার্ট দিয়ে মণিরাম গাড়ি ছুটিয়ে দিল৷
প্রিয়াংকা মণিরামের দিকে কোনওরকম নজর না দিয়ে ওর ব্যাগটা টেনে নিল৷ ব্যাগ থেকে ক্লাসনোটের লম্বা খাতা বের করল৷ কাল সুনীতা ম্যাডাম কমিউনিকেশান সিস্টেমস-এর ক্লাস টেস্ট নেবেন৷ কমিউনিকেশান প্রিয়াংকার ফেভারিট সাবজেক্ট৷ তা ছাড়া সুনীতা ম্যাডাম ব্যাপক পড়ান৷ ক্লাসে যা বলেন সব যেন মনে গেঁথে যায়৷ এই টেস্টটায় প্রিয়াংকাকে হায়েস্ট পেতেই হবে৷ নইলে ম্যাডামের কাছে ওর প্রেস্টিজ থাকবে না৷
প্রিয়াংকা বেশ মন দিয়ে ক্লাস নোট দেখছিল৷ ফলে খেয়াল করেনি যে, গাড়ি জোরে ছুটছে৷ এও খেয়াল করেনি, গাড়ি ওর বাড়ির দিকে নয়, ছুটে চলেছে অন্য রাস্তা ধরে৷ আর গাড়ি মণিরাম চালাচ্ছে না, তার বদলে অন্য একজন লোক স্টিয়ারিং-এ বসে আছে৷
গাড়িটা হঠাৎ বেশ জোরে ব্রেক কষল৷ প্রিয়াংকা ঝুঁকে পড়ল সামনের দিকে৷ মণিরামকে লক্ষ করে ‘কী হল, মণিদা?’ বলতে গিয়েই ও প্রথম খেয়াল করল, অন্য লোক গাড়ি চালাচ্ছে৷
ও চিৎকার করতে যাবে অমনই গাড়ির দুপাশের দরজা খুলে দুটো লোক চটপট ওর পাশ ঘেঁষে বসে পড়ল৷ রোগা মতন একজন ওর কোমরে একটা পিস্তল চেপে ধরে চাপা গলায় বলল, ‘স্ট্যাচু হয়ে বসে থাকো৷ নইলে খতম৷’
আর অন্য লোকটা—সামান্য মোটাসোটা গালফোলা চেহারা—ওর ব্যাগ হাতড়ে মোবাইল ফোনটা বের করে সুইচ অফ করে দিল৷ তারপর পকেটে পুরে নিল৷
ব্রেক কষার পর থেকে পুরো ব্যাপারটা ঘটতে সময় লেগেছে বড়জোর পাঁচ-সাত সেকেন্ড৷ তারপরই গাড়ি আবার চলতে শুরু করেছিল৷ যেন কিছুই হয়নি৷
পিস্তল-ধরা লোকটা রুক্ষ গলায় প্রিয়াংকাকে বলল, ‘চোখে হাত চাপা দিয়ে কোলের ওপর মাথা ডাউন করো—জলদি৷’
লোকটা শুধু হুমুমই দিল না—হুকুমটাকে জোরদার করতে সেইসঙ্গে একটা পিস্তলের খোঁচাও দিয়েছে৷
প্রিয়াংকা সঙ্গে-সঙ্গে চোখে হাত চাপা দিয়ে মাথা নীচু করল৷ গাড়িটা ব্রেক কষার পর ও একপলক রাস্তার দিকে তাকাতে পেরেছিল৷ তাতে রাস্তাটা বা এলাকাটা ওর চেনা বলে মনে হয়নি৷ আর এখন এই অবস্থায় তো পথ চেনার কোনও প্রশ্নই নেই৷
গাড়ির ইঞ্জিনের শব্দ শুনতে পাচ্ছিল প্রিয়াংকা, আর গাড়ির হর্ন৷ এ ছাড়া পথচলতি গাড়ির হর্নের শব্দও পাচ্ছিল৷ কিন্তু লোকগুলোর কোনওরকম কথাবার্তা শুনতে পাচ্ছিল না—কারণ, অচেনা তিনটে লোক নিজেদের মধ্যে একটি কথাও বলছিল না৷
প্রিয়াংকা বুঝল, ওদের প্ল্যান এতই নিখুঁত যে, নিজেদের মধ্যে কথাবার্তার কোনও প্রয়োজন নেই৷
কিডন্যাপিং-এর ঘটনাটা এমন আচমকা ঘটেছে যে, প্রিয়াংকা হকচকিয়ে গিয়েছিল৷ কিন্তু তারপর, সেই ঝোঁকটা কেটে যেতেই, একটা ঠান্ডা ভয় ওর মধ্যে চারিয়ে গেল৷ বুকের ভেতরে হৃৎপিণ্ডের ছটফটানির শব্দ ও স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিল৷ ভয় আর চাপা কান্নায় ওর গলার কাছটা অসহ্য যন্ত্রণায় টনটন করছিল৷ সোনমের কথা মনে পড়ছিল, বাপির কথা মনে পড়ছিল, আর মনে পড়ছিল মা-মণির কথা৷ দম আটকানো কান্নায় ওর শরীরটা ফুলে-ফুলে উঠতে লাগল৷
হঠাৎই গাড়িটা কোথাও একটা থামল৷ দুটো শক্ত হাত ওর কাঁধ চেপে ধরল৷ প্রিয়াংকা প্রতিবাদে ছটফট করে উঠতেই একটা কাঁধ থেকে হাত সরে গেল৷ তারপরই পিঠের ঠিক মাঝখানে একটা রুক্ষ খোঁচা টের পেল৷ সেই সঙ্গে হুকুম : ‘একদম চুপ৷ ফড়ফড় করলেই ওপরে ফুঁকে দেব৷’ একটু থেমে : ‘চোখ থেকে হাত সরাও—৷’
প্রিয়াংকা হাত সরাতেই অন্য লোকটা দুটো ইলাস্টিকের হেডব্যান্ড ওর চোখের ওপরে পরিয়ে দিল৷ ইলাস্টিকের চাপ টের পেল ও৷ তারপর একজন বলল : ‘গাড়ি থেকে নেমে পড়ো—৷’
ওর হাত ধরে টেনে কেউ গাড়ি থেকে ওকে নামাল৷
কয়েক পা এলোমেলো হাঁটানোর পর ওকে অন্য আর-একটা গাড়িতে তোলা হল৷ স্টার্ট দিয়েই গাড়িটা ছুটতে শুরু করল৷ আর প্রিয়াংকাদের অলটো গাড়িটা ‘ইউ’ টার্ন নিয়ে যে-রাস্তা দিয়ে এসেছিল সেদিকেই ছুটে চলল৷
