কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রিয়াংকার উথালপাথাল মন শান্ত হয়ে এল৷ ও বুঝল রাগ বা জেদ দেখিয়ে এদের হাত থেকে ছাড়া পাওয়া যাবে না৷ আর কান্নাকাটি করেও কোনও লাভ নেই৷ বরং কীভাবে বাপিকে একটা খবর দেওয়া যায় সেই বুদ্ধি বের করতে হবে৷
ওকে কেন কিডন্যাপ করা হয়েছে সেই কারণটা প্রিয়াংকা মনে-মনে বুঝতে চাইছিল৷ ময়দানে খুনের ঘটনাটা আটদিন আগের কথা৷ ভয়ে ব্যাপারটা ও কাউকে জানায়নি—বাপিকেও না, সোনমকেও না৷ শুধু সেই মাইক্রো-ক্যাসেটটা হ্যান্ডিক্যাম থেকে বের করে একটা অদ্ভুত জায়গায় লুকিয়ে রেখেছে৷ বহুবার ভেবেছে, বাপিকে সঙ্গে নিয়ে ও থানায় যাবে—সব জানাবে৷ কিন্তু তারপরই একটা ভয় ওকে থামিয়ে দিয়েছে৷ যদি পুলিশ ওদের ঝামেলায় জড়িয়ে দেয়, হ্যারাস করে?
বেশ মনে আছে, সেইদিনটা খুব ভয়ে-ভয়ে দুরুদুরু বুকে কাটিয়েছে ও৷ রাতে সোনমের পাশে শুয়ে সারাটা রাত ছটফট করেছে—একফোঁটা ঘুমোতে পারেনি৷ পরদিন খবরের কাগজে ময়দানে খুনের খবরটা ছোট্ট করে বেরিয়েছে : ‘…অজ্ঞাতপরিচয় একজন মাঝবয়েসি লোকের গুলিবিদ্ধ মৃতদেহ পাওয়া গেছে৷ পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে…৷’
হতে পারে এই লোকগুলো সেই খুনের ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে আছে৷ তাই সেই মাইক্রো-ক্যাসেটটার খোঁজে প্রিয়াংকাকে তুলে এনেছে৷ কিন্তু এরা প্রিয়াংকার খোঁজ পেল কী করে? কীভাবে জানতে পারল ও কোন কলেজে পড়ে, কখন কোন গাড়ি করে বাড়ি ফেরে? তবে যে-তিনজন লোককে প্রিয়াংকা এ পর্যন্ত দেখেছে—দুজন কিডন্যাপার আর ড্রাইভার—তাদের কাউকেই ও চেনে না৷
তবে কি এই লোকগুলো ময়দানের খুনের ব্যাপারটার কিছুই জানে না? স্রেফ ওর বাপির কাছ থেকে মোটা টাকা আদায়ের জন্য ওকে ধরে নিয়ে এসেছে?
প্রিয়াংকার মাথার ভেতরে আবার চিন্তার ঝড় বইতে শুরু করল৷ ও মাসির দিকে আড়চোখে তাকাল৷ ওকে বিছানায় পাঠানোর পর থেকে মাসি দেওয়ালের কাছে গিয়ে ছবি হয়ে বসে আছে৷ চোখ দুটো আধবোজা৷ ওর নিশ্চিন্ত ভাব দেখে বোঝা যায়, ও জানে প্রিয়াংকার এখান থেকে পালানোর কোনও পথ নেই৷ এই ঘরটার দরজা খোলা থাকলেও বাড়ির সদরে নিশ্চয়ই তালা দেওয়া আছে৷
প্রিয়াংকা ওর ব্যাগটা টেনে নিল৷ জিপ খুলে একটা খাতা আর পেন বার করে নিল৷ তারপর এ পর্যন্ত যা-যা হয়েছে, যা-কিছু ও দেখেছে, সব ইংরেজিতে লিখে ফেলল৷ এমনকী লোকগুলোর চেহারার বর্ণনাও বাদ দিল না৷
ও ঠিক করল, যখনই ও প্লেনের শব্দ শুনবে তখনই সময়টা টুকে রাখবে৷ এই তথ্যটা পরে কাজে লাগলেও লাগতে পারে৷
লেখার কাজ যখন শেষ হল তখন প্রিয়াংকার মন অনেক শান্ত হয়ে গেছে৷ প্রথমদিকের ভয় আর মনখারাপের ঝোঁকটাও অনেক কমে গেছে৷
ও খাতা-পেন রেখে উঠে দাঁড়াল৷ হাতঘড়িতে চোখ রাখল : আটটা দশ৷ তারপরই ওর নজর গেল ওর পাহারাদারের দিকে৷ দেওয়ালে হেলান দিয়ে বসে থাকা মূর্তিটা কখন যেন সজাগ হয়ে উঠেছে, পিটপিট করে প্রিয়াংকাকে দেখছে৷
প্রিয়াংকা মাসিকে লক্ষ করে জিগ্যেস করল, ‘এ জায়গাটা কোথায়? এয়ারপোর্টের কাছে মনে হচ্ছে…৷’
মাসি মুখে কোনও জবাব দিল না৷ শুধু হাত ঘুরিয়ে বোঝাল, কে জানে কোথায়!
‘আমাকে এখানে আটকে রেখেছে কেন? টাকার জন্যে?’
স্থির চোখে প্রিয়াংকার দিকে তাকিয়ে থেকে আবার একই ভঙ্গিতে হাত ঘোরাল মাসি৷
প্রিয়াংকা কাঁধ ঝাঁকাল৷ আচ্ছা বোবা-কালার পাল্লায় পড়া গেছে!
ও ঘরের মধ্যে পায়চারি করতে শুরু করল৷ কী করে যে সময় কাটায় এখন! দু-একটা গল্পের বই সঙ্গে থাকলে বেশ হত৷ কিংবা একটা কম্পিউটার থাকলে দিব্যি কম্পিউটার গেমস খেলা যেত৷
প্রিয়াংকা এলোমেলোভাবে ঘোরাঘুরি করছিল আর ঘরটাকে খুঁটিয়ে জরিপ করছিল৷ দুটো চেয়ারকে পাশ কাটিয়ে দেওয়াল ঘেঁষে রাখা একটা টেবিলের কাছে পৌঁছল প্রিয়াংকা৷
টেবিলটা ধুলো মাখা৷ একটা পায়া জোড়তালি দেওয়া৷ টেবিলের নীচে চার-পাঁচটা খালি সিমেন্টের বস্তা আর ছ’-সাতখানা ইট৷ কিন্তু তার পাশে ওটা কী?
একটা পুরোনো আমলের টেলিফোন৷
কিন্তু টেলিফোনটা যে বাতিল সেটা তার চেহারা দেখলেই বোঝা যায়৷ হাতলের প্লাস্টিক কভারটা ভাঙা—কভারের বেশ খানিকটা উধাও৷ ভেতরের যন্ত্রপাতি দেখা যাচ্ছে৷ বেস ইউনিটটার অবস্থাও একইরকম—তবে নম্বর লেখা মেটাল ডায়ালটা এখনও অক্ষত আছে৷
যন্ত্রটার সর্বাঙ্গে ধুলো৷ বোঝাই যায়, বহুকাল ওটা কেউ ব্যবহার করেনি৷ হ্যান্ডসেট থেকে বেরিয়ে থাকা টেলিফোনের তারটা মরা কেঁচোর মতো মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে আছে৷
মাসির দিকে একবার তাকাল প্রিয়াংকা৷ একটা প্লাস্টিকের ড্রামের পাশ দিয়ে মহিলার শরীরের খানিকটা অংশ দেখা যাচ্ছে৷ প্রিয়াংকা হঠাৎই একটা গান ধরল—‘ঝুম বরাবর ঝুম—৷’ লক্ষ করল, মাসি সামনে খানিকটা ঝুঁকে পড়ে প্রিয়াংকাকে একবার দেখল৷ তারপর তার মুখটা আবার ড্রামের আড়ালে সরে গেল৷
গান গাইতে-গাইতে খানিকটা ঝুঁকে পড়ল প্রিয়াংকা৷ টেবিলের নীচ দিয়ে লাগোয়া দেওয়ালের দিকে তাকাল৷ টেলিফোন কানেকশানের একটা প্লাগ দেখা যাচ্ছে৷ সেটা থেকে তার উঠেছে দেওয়াল বেয়ে৷ তারপর একটা জানলার ফ্রেমের কাঠ ফুটো করে তারটা বেরিয়ে গেছে বাইরে৷
এই ভাঙা টেলিফোনটা দিয়ে কিছু একটা করা যায় না?
প্রিয়াংকার বুকের ভেতরটা ধকধক করে উঠল৷
