তেওয়ারি চলে গেল৷
ডিউটি অফিসারের এই কাণ্ড দেখতে-দেখতে মিমো আর বাবলি অধৈর্য হয়ে পড়েছিল৷ একইসঙ্গে এই গয়ংগচ্ছ ভাব ওদের অসহ্য লাগছিল৷
মিমো আশেপাশে তাকাল—যদি অন্য কোনও পুলিশ অফিসারকে দেখতে পায়৷ নাঃ, সেরকম কেউ নেই৷ থানার ও. সি-র ঘরও এখন খালি৷ নইলে ওঁর কাছে গিয়ে ব্যাপারটা…৷
যখন ও ভাবছে, কী করা যায়…ঠিক তখনই ওর মোবাইল ফোন বেজে উঠল৷
ইনকামিং কলের নম্বরটা দেখেই মিমো বুঝল, প্রিয়াংকার ফোন৷ ও চটপট বোতাম টিপে ‘হ্যালো’ বলতেই ওপাশ থেকে প্রিয়াংকার ভয় পাওয়া গলা শোনা গেল : ‘আপনি পুলিশে খবর দিয়েছেন? জলদি! আর বেশি সময় নেই৷ এই ফোনটা খারাপ৷ বারবার লাইন কেটে যাচ্ছে…৷ যা করার জলদি করুন…৷’
মিমো তাড়াতাড়ি বলে উঠল, ‘আমরা এখন মানিকতলা থানায়৷ এই নিন, ডিউটি অফিসারের সঙ্গে কথা বলুন—৷’
মিমোর ফোন বেজে ওঠার সঙ্গে-সঙ্গে অফিসার ভদ্রলোক সজাগ হয়েছিলেন৷ এখন মিমো ওর মোবাইলটা বাড়িয়ে দিতেই তিনি তাড়াতাড়ি সেটা কানে দিয়ে ‘হ্যালো’ বললেন৷ হাতের বিড়িটা মেঝেতে ফেলে পা দিয়ে ঘষে নিভিয়ে দিলেন৷
প্রিয়াংকা তখন কান্নায় ভেঙে পড়েছে৷ কাঁদতে-কাঁদতেই ও বলল, ‘স্যার, স্যার…আমাকে বাঁচান৷ এরা আমাকে খুন করে ফেলবে…৷’
‘কোনও ভয় নেই—আমরা এখুনি অ্যাকশান নিচ্ছি৷ আপনাকে কোথায় আটকে রেখেছে বলুন তো? জায়গাটা ডেসক্রাইব করতে পারেন?’
প্রিয়াংকা উত্তরে কী যেন বলছিল—কিন্তু তখনই ফোনে একটা ‘গোঁ-ও-ও’ শব্দ শোনা গেল৷ ওর কথা আর ভালো করে বোঝা গেল না৷
অফিসার অবাক হয়ে জিগ্যেস করলেন, ‘কীসের শব্দ হচ্ছে?’
‘একটা প্লেন উড়ে গেল৷ আমাকে যে করে হোক বাঁচান…৷’
প্রিয়াংকার কথা শেষ হওয়ার আগেই লাইনটা কেটে গেল৷ বারকয়েক ‘হ্যালো! হ্যালো!’ করেও ডিউটি অফিসার আর কোনও সাড়া পেলেন না৷ তখন ফোনটা মিমোকে ফিরিয়ে দিয়ে বললেন, ‘দ্যাখো তো, ওই নম্বরটায় লাগাতে পারো কি না—৷’
মিমো জানত চেষ্টা করে কোনও লাভ নেই, তবুও তিনবার প্রিয়াংকার নম্বরটায় কল করল৷ প্রত্যেকবারই শুধু রিং বেজে গেল৷ কেউ ধরল না৷ হয়তো ফলস রিং হচ্ছে—মিমো ভাবল৷
ডিউটি অফিসার চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন৷ মিমো আর বাবলির দিকে সহজ চোখে দেখলেন৷ নাঃ, এই ছেলেদুটো তো সত্যি কথাই বলেছে! আর ফোনে মেয়েটার কান্নাকাটি শুনে মনে হয় না মজা করার জন্য এইরকম অভিনয় করছে৷ সুতরাং কিছু একটা করা দরকার৷
হঠাৎই মিমো আর বাবলি দেখল, ডিউটি অফিসার ওদের পিছনদিকে তাকিয়ে কাকে যেন সেলাম ঠুকলেন৷
পিছন ফিরে তাকিয়েই মিমোর মুখ খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল৷ ওর চেনা সেই পুলিশ অফিসার৷ গায়ে য়ুনিফর্ম৷ মাথার টুপিটা হাতে ধরা৷ পাশে একজন কনস্টেবল৷ মনে হয়, আউটডোর ডিউটিতে কোথাও বেরিয়েছিলেন—এইমাত্র ফিরেছেন৷
মিমোকে লক্ষ করে তিনিই প্রথম কথা বললেন, ‘কী ব্যাপার? তুমি থানায় কেন?’
ডিউটি অফিসার চটপট বললেন, ‘ওরা একটা রিপোর্ট লেখাতে এসেছিল৷’ তারপর অবাক হয়ে ওপরওয়ালাকে জিগ্যেস করলেন, ‘ওকে চেনেন নাকি, স্যার?’
‘খুউব চিনি—’ হেসে বললেন তিনি৷ তারপর মিমোর পিঠ চাপড়ে দিয়ে বললেন, ‘এসো—এ-ঘরে এসো৷ তোমাদের কথা শোনা যাক৷’ ডিউটি অফিসারের দিকে তাকিয়ে : ‘তুমিও এসো, পালচৌধুরী৷’
ও. সি.-র ঘরের লাগোয়া একটা ঘরে ঢুকে পড়লেন তিনি৷ ওঁর পিছন-পিছন মিমো, বাবলি আর ডিউটি অফিসার পালচৌধুরী৷
৷৷চার৷৷
কলেজ ছুটি হওয়ার পর ক্যাম্পাসের বাইরে বেরিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে খানিকক্ষণ আড্ডা মারা প্রিয়াংকার রোজকার অভ্যেস৷ আজও ওরা সাতজন বন্ধু ক্যাম্পাসের মেনগেটের বাঁ-দিক ঘেঁষে দাঁড়িয়ে তুমুল আড্ডা মারছিল৷ আড্ডা ঠিক নয়—আসলে বিতর্ক৷ ফিল্মের সবচেয়ে সুপুরষ নায়ক কে? এই বিতর্কে শেষ তিনজন প্রতিযোগীকে নিয়ে এখন লড়াই চলছে : সলমান খান, হৃতিক রোশন এবং জন আব্রাহাম৷
প্রিয়াংকা সলমানের অন্ধ ভক্ত—তাই সলমানকে ‘সেরা’ প্রমাণ করার জন্য গলা ফাটাচ্ছিল৷ হঠাৎই ওর হাতের মোবাইল ফোন বেজে উঠল৷
‘হ্যালো—৷’
‘কী রে, এখনও ছুটি হয়নি?’ ও-প্রান্ত থেকে বাপি জিগ্যেস করল৷
চার বছর আগে আচমকা হার্ট অ্যাটাকে ওর মা চলে যাওয়ার পর থেকে সোনম আর ওর কাছে বাপি একাই ‘বাপি’ আর ‘মা-মণি’৷ সবসময়ে ওদের জন্য চিন্তা করে—কখনও কারণে, আর বেশিরভাগ সময়েই অকারণে৷
প্রিয়াংকা বাপিকে বলল, ‘এইমাত্র প্র্যাকটিক্যাল শেষ হয়েছে৷ তুমি চিন্তা কোরো না৷ বন্ধুদের সঙ্গে একটু কথা বলেই গাড়িতে উঠছি—৷’
বাপি বলল, ‘যাকগে, বেশি দেরি কোরো না৷ মণিরাম অনেকক্ষণ রওনা হয়ে গেছে৷ বোধহয় এতক্ষণে পৌঁছে গেছে৷’
মণিরাম প্রিয়াংকাদের ড্রাইভার৷ বয়েস পঞ্চাশ পেরিয়ে গেছে৷ বহুবছর ধরে ওদের গাড়ি চালায়৷ খুব বিশ্বাসী৷ প্রিয়াঙ্কা আর সোনমকে বলতে গেলে নিজের ছেলেমেয়ের মতো ভালোবাসে৷ ওর কলেজে আসতে বা সোনমের স্কুলে যেতে মণিরাম আজ পর্যন্ত কখনও দেরি করেনি৷
বাপির সঙ্গে কথা শেষ করেই বন্ধুদের বলল, ‘অ্যাই, বাপি তাড়া দিচ্ছে৷ টা-টা৷ কাল আবার এই ইস্যুটা রিওপেন করে ঝগড়া করব৷ ও.কে.?’
বন্ধুদের হাত নেড়ে চটপট পা চালাল প্রিয়াংকা৷ সামনে ডানদিকে ঘুরেই যে-সাইডরোডটা পাওয়া যায়, মণিরাম বরাবর সেখানেই গাড়ি নিয়ে দাঁড়ায়৷
