ও আর বাবলি যখন থানার প্রায় কাছাকাছি চলে এসেছে তখন মিমোর মোবাইল বেজে উঠল৷ ও তাড়াতাড়ি ফোনের উইন্ডোর দিকে তাকাল৷ না, প্রিয়াংকার নয়, মায়ের ফোন৷
ফোন ধরতেই মায়ের একরাশ কথা৷ জিমে এতক্ষণ লাগছে কেন? ফিরে এসে ব্রেকফাস্ট খেয়ে পড়তে বসবি কখন? আর তো দু-সপ্তাহ পরেই পরীক্ষা—সে-খেয়াল আছে!
মায়ের কথার তোড়ের মুখে মিমো প্রিয়াংকা কিংবা পুলিশের কথা মাকে বলতে ভরসা পেল না৷ বললেই মা হয়তো ছুটে চলে আসবে মানিকতলা থানায়৷ তারপর দুনিয়া মাথায় করে ছাড়বে৷
মিমো জানে, বিশ্বজিৎদাকে মা বেশ পছন্দ করে, ভরসাও করে৷ জিমে মিমোকে ভরতি করার সময় মা এসেছিল, বিশ্বজিৎদার সঙ্গে আলাপও হয়েছিল৷ তা ছাড়া মিমোকে জুনিয়ার বডি-শো কম্পিটিশানে নানান জায়গায় নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে বিশ্বজিৎদা বেশ কয়েকবার মায়ের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছে৷
সুতরাং মায়ের কাছে জবাবদিহি করার এই বিপদের সময় মিমো বিশ্বজিৎদাকেই মনে-মনে আঁকড়ে ধরল এবং টেলিফোনে বলে বসল, ‘একটা বডি-শো কম্পিটিশানের ব্যাপারে আমরা বিশ্বজিৎদার সঙ্গে ডিসকাস করছি৷ চিন্তা কোরো না—আধঘণ্টার মধ্যেই বাড়ি ফিরব৷’
বাবলি জিগ্যেস করল, ‘কে?’
মিমো ক্লান্ত গলায় বলল, ‘মা—আর কে!’
ততক্ষণে ওরা থানায় ঢুকে পড়েছে৷ সামনে চওড়া করিডরের একপাশে একটা লম্বা বেঞ্চি পাতা রয়েছে৷ সেখানে বসে আছে একজন কনস্টেবল৷
একটু এগিয়েই ডানদিকে লোহার দরজা লাগানো হাজতঘর৷ ভেতরে একটা লোক গারদ ধরে দাঁড়িয়ে৷ তার আর-একজন সঙ্গী দূরের দেওয়ালে ঠেস দিয়ে উবু হয়ে বসে আছে৷
অকারণেই মিমোর ভয়-ভয় করতে লাগল৷ এর আগে কখনও ও থানায় আসেনি৷
বাঁ-দিকে তাকাল মিমো৷ সাদা য়ুনিফর্ম পরা একজন অফিসার চেয়ার-টেবিল নিয়ে বসে আছেন৷ টেবিলে দুটো বড়-বড় খাতা, খাতার পাশে একটা বলপয়েন্ট পেন, আর একটা টেলিফোন৷ ইনিই বোধহয় ডিউটি অফিসার—ডায়েরি-টায়েরি লেখেন৷
মিমো আর বাবলি ওঁর কাছে এগিয়ে গেল৷ মিমো বারবার ভাবছিল, ইস, ওর সেই চেনা অফিসার থাকলে কত ভালো হত৷ কে জানে, তিনি হয়তো এর মধ্যে অন্য কোনও থানায় বদলি হয়ে গেছেন৷ সেই চেনা মানুষটার খোঁজে ও এপাশ-ওপাশ তাকাতে লাগল৷ কিন্তু তাঁকে দেখতে পেল না৷
মিমো আর বাবলিকে দেখে ডিউটি অফিসার ভুরু কুঁচকে ওদের দিকে তাকালেন৷ বছর ষোলো কি সতেরোর দুটো ছেলে৷ চোখে পড়ার মতো স্বাস্থ্য৷ একজন একটু লম্বা, অন্যজন উচ্চতায় খাটো৷
ডিউটি অফিসারের টেবিলের সামনে একটা ছোট বেঞ্চি পাতা ছিল৷ ‘বসছি’, বলে মিমো সেটাতে বসে পড়ল৷ দেখাদেখি বাবলিও৷
‘কী ব্যাপার?’ খানিকটা বিরক্ত ভাব দেখিয়ে ডিউটি অফিসার জানতে চাইলেন৷
‘আমরা—আমরা একটা…কিডন্যাপিং-এর ব্যাপারে রিপোর্ট করতে এসেছি৷’ মিমো বলল৷
‘কিডন্যাপিং?’ প্রশ্নের ঢঙে কথাটা বলে অফিসার একটা খাতা টেনে নিয়ে খুললেন৷ পাতা উলটে-উলটে ঠিকঠাক পৃষ্ঠায় এলেন৷ পেনটা তুলে নিয়ে লেখার জন্য বাগিয়ে ধরলেন৷
মিমো পুরো ঘটনাটা ওঁকে বলল৷ তারপর বাবলি পকেট থেকে ভাঁজ করা কাগজটা বের করে প্রিয়াংকার নাম-ঠিকানা বলল৷ অফিসার খাতায় লিখতে শুরু করলেন৷ ব্যাপারটা পরিষ্কার করে বোঝার জন্য মাঝে-মাঝে ওদের প্রশ্ন করতে লাগলেন৷
লেখার কাজ মিটে গেলে অফিসার মিমো আর বাবলির নাম-ঠিকানা, গার্জেনের নাম, কোন স্কুলে ওরা পড়ে—এসব জেনে নিয়ে খাতায় লিখলেন৷ তারপর খাতাটা ওদের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, ‘তোমরা মাইনর—মানে, আঠেরো বছর তো হয়নি—তবুও এই জায়গাটায় সই করে দাও—৷’
মিমো আর বাবলি সই করে দিল৷
তারপরই ওদের অবাক করে দিয়ে অফিসার ভদ্রলোক ওদেরই জেরা করতে শুরু করলেন৷
হঠাৎ মিমোর ফোনেই বা প্রিয়াংকা ফোন করতে গেল কেন?
মিমোরা গল্পটা বানিয়ে বলছে না তো?
প্রিয়াংকা নামের মেয়েটিকে যে কিডন্যাপ করা হয়েছে সেটা ওরা বুঝল কেমন করে? এইসব কমবয়েসি ছেলেরা বা মেয়েরা অনেকসময় নানারকম মজা করে৷ এটাও হয়তো সেরকমই কিছু৷
এইসব পুলিশি প্রশ্নের আক্রমণের মুখে পড়ে মিমো আর বাবলি সাধ্যমতো আত্মরক্ষার চেষ্টা করতে লাগল৷ মিমো ওর মোবাইলের বোতাম টিপে প্রিয়াংকার ল্যান্ডলাইন নম্বরটা আগেই অফিসারকে দেখিয়েছিল৷ সেটা তিনি ডায়েরির খাতায় লিখেও নিয়েছিলেন৷ কিন্তু এতসব সত্ত্বেও ভদ্রলোকের মুখ থেকে সন্দেহের ভাবটা যাচ্ছিল না৷
মিমো বারবার করে বলল, ‘দেখুন স্যার, মেয়েটার মনে হয় হেভি বিপদ৷ ও ফোন করলে লাইনটা বারবার কেটে যাচ্ছে৷ আর আমি ওই নাম্বারে ফোন করলে কোনও কানেকশান পাচ্ছি না৷ বিশ্বাস করুন, মেয়েটাই বারবার বলছে পুলিশে খবর দিতে৷ আপনারা প্লিজ কিছু একটা করুন—৷’
ডিউটি অফিসার একটা হাই তুললেন৷ তারপর ‘তেওয়ারি!’ বলে চেঁচিয়ে কাকে যেন ডাকলেন৷
কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই রোগা চেহারার একজন কনস্টেবল সামনে এসে দাঁড়াল৷ গাল বসা শুকনো মুখে একজোড়া পেল্লাই গোঁফ ভীষণ বেমানান লাগছে৷ উর্দি পরতে-পরতেই সে ‘স্যার’-এর ডাক শুনে ছুটে এসেছে৷ এখন জামাটাকে ব্যস্তভাবে প্যান্টের ভেতরে গুঁজে দিচ্ছে৷
ডিউটি অফিসার তখন চেয়ারে হেলান দিয়ে আড়মোড়া ভাঙছিলেন৷ একটা হাই তুলতে-তুলতে বললেন, ‘লাইটারটা দে—৷’
তেওয়ারি হুকুম শোনামাত্রই পালন করতে ঝট করে পকেটে হাত ঢুকিয়ে দিল৷ সে লাইটার বের করতে-করতেই ডিউটি অফিসারের ঠোঁটে একটা বিড়ি জায়গা করে নিয়েছে৷ তেওয়ারি ঝুঁকে পড়ে লাইটার জ্বেলে বিড়িটা ধরিয়ে দিল৷ অফিসার চোখ বুজে বিড়িতে টান দিলেন৷ বাঁ-হাতের আঙুল নেড়ে তেওয়ারিকে বুঝিয়ে দিলেন ওর কাজ আপাতত শেষ৷ ও এখন যেতে পারে৷
