লোকদুটো আগাছার ঝোপ হাতে ঠেলে একপাশে সরিয়ে তার ফাঁক দিয়ে ছুটন্ত প্রিয়াংকাকে দেখতে লাগল৷
রোগা লোকটা রিভলভারটা জ্যাকেটের ভেতরের পকেটে চালান করে দিল৷ তারপর মোটা সঙ্গীর দিকে না তাকিয়েই বিড়বিড় করে বলল, ‘মেয়েটার হাতে একটা হ্যান্ডিক্যাম আছে খেয়াল করেছেন?’
‘করেছি—৷’
‘নিশ্চয়ই আমাদের অপারেশানের ছবি তুলেছে৷ নাঃ, মেয়েটাকে বাঁচিয়ে রাখা যাবে না৷’
‘তার চেয়েও জরুরি ওই হ্যান্ডিক্যামের মাইক্রো-ক্যাসেটটা৷ যেভাবে হোক ওটা আমাদের চাই-ই চাই৷ ওটা হাতে পেলে আর কোনও ভয় নেই৷ বাকি সব আমি ম্যানেজ করে নেব৷ তখন মেয়েটা কোর্টে হাজার চেঁচালেও কিছু লাভ হবে না৷ কোর্ট প্রমাণ চায়, প্রমাণ৷’
স্লিভলেস জ্যাকেট পরা লোকটা ঠোঁটের কোণে হাসল : ‘তখন ওই ছামিয়া বাঁচুক কি মরুক কিছু যায় আসে না—৷’
‘উঁহু—’ মাথা নাড়ল ট্র্যাকসুট পরা লোকটা : ‘কোনও রিসক নেওয়ার দরকার নেই৷ আগে মাইক্রো-ক্যাসেট হাতাও, তারপর মেয়েটাকে ওড়াও…৷’
‘কিন্তু মেয়েটার ডিটেইলস তো জানতে হবে৷ কী নাম, কোথায় থাকে…বাড়িতে আর কে-কে আছে…নইলে ওর খোঁজ পাব কী করে?’
‘ইজি—’ এবার ট্র্যাকসুটের বাঁকা হাসির পালা : ‘এখন থেকেই তোমার কাজ শুরু করে দাও৷ ফলো হার—৷’
ঝোপের আড়াল থেকে ওরা দেখতে পাচ্ছিল, প্রিয়াংকা সোনমকে ব্যস্তভাবে কী বলতে-বলতে হাত ধরে টেনে নিয়ে যাচ্ছে৷ আর ছোট ছেলেটা ওর খেলার কিটব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে একটা স্লিভলেস সোয়েটার হাতে মেয়েটার সঙ্গে তাল মিলিয়ে হাঁটতে চেষ্টা করছে৷
ওদের কয়েক সেকেন্ড লক্ষ করার পরই লোকদুটো বুঝতে পারল, প্রিয়াংকা আর সোনম মাঠ পেরিয়ে পিচের রাস্তার দিকে এগোচ্ছে৷ আর সেখানে রাস্তার ধার ঘেঁষে পার্ক করা রয়েছে মেরুন রঙের একটা মারুতি অলটো৷
মোটা লোকটা চাপা শিস দিয়ে উঠল, বলল, ‘থ্যাংক গড! মেয়েটা মনে হয় ওই মেরুন গাড়িটায় উঠবে৷ কুইক—ওদের গাড়ির নম্বরটা আমাদের দরকার৷ তারপর রুটিন এনকোয়ারি—দু-তিনদিনেই সব খবর বেরিয়ে পড়বে৷ শিগগির চলো—৷’
ঝোপ থেকে হাত সরিয়ে নিল মোটা লোকটা৷ তারপর দুজনে পা চালাল নিজেদের গাড়ির দিকে৷ যাওয়ার সময় রোগা লোকটা ঘাসের ওপরে পড়ে থাকা অসাড় মৃতদেহটা একলাফে টপকে গেল৷
চারপাশে ভোরের আমেজ তখনও ছড়িয়ে আছে৷ তবে মেঘের ফাঁক দিয়ে সূর্য এখন উঁকি মেরেছে৷ বড়-বড় গাছের পাতার আড়াল থেকে পাখির ডাক শোনা যাচ্ছে৷ গাছগাছালির কাছ থেকে কিছুটা দূরে খোলা জায়গায় ঘাসের শিষ ছন্নছাড়াভাবে গজিয়ে উঠেছে৷ সেই শিষের ওপরে ছোট-ছোট হিমের ফোঁটা৷ সকালের মিষ্টি আলো পড়ে চিকচিক করছে৷
এদিকটায় কোনও লোকজন নেই৷ যত ভিড় খেলার মাঠের দিকে৷ সেই কারণেই হিরেগুলো নিয়ে একটা হেস্তনেস্ত করার জন্য ওরা দুজনে এই জায়গাটা বেছে নিয়েছিল৷ ট্র্যাকসুট পরা মোটা লোকটা রোজ ভোরে ময়দানে মর্নিং ওয়াক করতে আসে৷ সে জানে, এখনও অন্তত ঘণ্টাখানেকের মধ্যে এই ডেডবডিটা কারও নজরে পড়বে না৷ শুধু ওই জিনস পরা মেয়েটা ব্যাপারটা আচমকা দেখে ফেলেছে, তাই৷ এখন চটপট গাড়িতে উঠে ওই মেরুন অলটোটাকে ধরতে হবে৷ ওটার নম্বর নিতে হবে৷
কিছুটা দূরে মাঠের ওপরে ওদের রুপোলি স্যান্ট্রো গাড়িটা দাঁড়িয়ে ছিল৷ ওরা দুজনে আরও জোরে পা চালাল সেই গাড়ির দিকে৷
ভেজা ঘাস মাড়িয়ে যেতে যেতে পিছন ফিরে তাকাল ট্র্যাকসুট৷ মৃতদেহটার পাশে তিনটে কাক এসে বসেছে৷ ডাকাডাকি করছে৷
৷৷তিন৷৷
মিমোর কথা শুনে-শুনে বাবলি প্রিয়াংকার ঠিকানাটা লিখে নিল৷
ঠিকানা জানার পর মিমো ওকে বলল, ‘আমরা এক্ষুনি থানায় যাচ্ছি৷ আপনার ফোন-নাম্বারটাও পুলিশকে দিচ্ছি৷ ওরা যদি আপনাকে কনট্যাক্ট করতে চায় তা হলে…৷’
প্রিয়াংকা উদভ্রান্তের মতো বলল, ‘কোনও লাভ নেই৷ আমার মোবাইল ওরা কেড়ে নিয়েছে৷ আমি ওদের একটা ভাঙা টেলিফোন থেকে ফোন করছি৷ আপনি বরং আমার বাবার মোবাইল নাম্বারটা লিখে…৷’
যাঃ, লাইনটা আবার কেটে গেল! বিরক্তির একটা শব্দ করে মিমো নিজের ঊরুতে একটা থাপ্পড় মারল৷
বাবলি জিগ্যেস করল, ‘কী হল?’
‘সেই এক কেস—লাইন কেটে গেল৷ চল, আমরা বরং থানায় যাই—৷’
‘কোন থানায় যাবি?’
‘কেন, মানিকতলা থানায়৷ আমাদের বাড়ি তো ওই এরিয়ায়৷’
মিমো আর বাবলি চটপট পা চালাল৷ এখান থেকে মিমোদের বাড়ি অন্তত আট-দশ মিনিটের হাঁটা পথ৷
মিমো মোবাইল ফোনটা হাতে ধরে রেখেছিল৷ ভাবছিল, এই বোধহয় প্রিয়াংকার ফোন আসবে৷
ওরা গলির নানান প্যাঁচ পেরিয়ে বড় রাস্তায় এসে পড়ল৷ সামনেই অরবিন্দ সেতু—সমতল রাস্তা ধীরে-ধীরে উঁচু হয়ে গেছে৷ অটো, বাস কিংবা গাড়ির সংখ্যা এখনও তেমন বাড়েনি৷ আর ঘণ্টাখানেক পরই এই রাস্তাটা ব্যস্ততায় উপচে পড়বে৷
খাল পেরিয়ে ব্রিজের মাঝামাঝি জায়গায় এসে নীচে নামার সিঁড়ি ধরল ওরা৷ এখানে নেমে খালধারের রাস্তা বরাবর মিনিটদশেক হেঁটে গেলে মানিকতলা থানা৷ সেখানে একজন পুলিশ অফিসারের সঙ্গে মিমোর সামান্য পরিচয় আছে৷ ভদ্রলোক কী পোস্টে চাকরি করেন মিমো জানে না৷ তবে মাসদুয়েক আগে অরবিন্দু সেতুর পশ্চিম প্রান্তে—মিমোদের বাড়ির কাছাকাছি—একটা অ্যাকসিডেন্ট হয়েছিল৷ বলতে গেলে মিমোর চোখের সামনেই দুর্ঘটনাটা ঘটেছিল৷ তারপর পুলিশ যখন স্পটে আসে তখন সেই অফিসার মিমোর এজাহার নিয়েছিলেন৷ মিমোর সঙ্গে বেশ কিছুক্ষণ কথাও বলেছিলেন৷ এর পরে জিপে করে মিমোদের পাড়া দিয়ে যাতায়াতের সময় ওঁর সঙ্গে মিমোর কয়েকবার দেখা হয়েছে৷ দুবার তো তিনিই গাড়ি থামিয়ে কথা বলেছেন৷ কিন্তু ওঁর নামটা মিমোর জানা নেই৷ কে জানে, এখন ওঁকে থানায় পাওয়া যাবে কি না৷
