প্রিয়াংকার মাথার ভেতরে সবকিছু যেন গোলমাল হয়ে যেতে চাইল৷ সামনে এ কী দৃশ্য দেখছে ও!
ঝোপের কাছ থেকে হাত-দশেক দূরে তিনজন মাঝবয়েসি মানুষ৷ একজন প্রিয়াংকার দিকে পিছন ফিরে মাঠের ওপরে হাঁটুগেড়ে বসে আছে৷ তার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে দুজন৷ তাদের মধ্যে একজন একটা মোটা নল লাগানো রিভলভার হাঁটুগেড়ে বসে থাকা লোকটির মাথার একপাশে ঠেকিয়ে রেখেছে৷ দেখে প্রিয়াংকা বুঝতে পারল, রিভলভারটা সাইলেন্সার লাগানো৷ কারণ, সিনেমায় ও এরকম হ্যান্ডগান অনেক দেখেছে৷
অন্য লোকটি কোমরে হাত দিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল৷ তার ময়াল সাপের মতো ঠান্ডা চোখ হাঁটুগেড়ে বসে থাকা লোকটির দিকে স্থির৷
রিভলভার-হাতে লোকটা আবার প্রশ্ন করল, ‘এবার মনে পড়েছে, হিরেগুলো কোথায় আছে?’
হাঁটুগেড়ে বসে থাকা লোকটি ভিক্ষা চাওয়ার ভঙ্গিতে আঙুলে আঙুল জড়িয়ে দু-হাত মুঠো করে মাথা নামিয়ে প্রণামের ভঙ্গি করল৷ এপাশ-ওপাশ মাথা ঝাঁকিয়ে কান্না-ভাঙা গলায় বলল, ‘আমি জানি না—আমি জানি না৷’
প্রিয়াংকার গলা শুকিয়ে গিয়েছিল৷ ও কী করবে ভেবে পাচ্ছিল না৷ এখানে দাঁড়িয়েই ‘বাঁচাও! বাঁচাও!’ বলে চিৎকার করবে? নাকি এই মুহূর্তে সোনমদের মাঠের দিকে ছুট লাগাবে?
কিন্তু ওই লোকটা যদি গুলি চালায়?
প্রিয়াংকার জিভটা যেন নারকোল-দড়ির তৈরি পাপোশ—খড়খড়ে, শুকনো৷ ওর গলা দিয়ে কি এখন কোনও চিৎকার বেরোনো সম্ভব?
হঠাৎই প্রিয়াংকার মনে পড়ে গেল হ্যান্ডিক্যামটার কথা৷ অসাড় হাতে ওটা যে এখনও ধরা আছে সেটা ওর মনেই ছিল না৷
সুতরাং কাঁপা হাতে ভিডিয়ো ক্যামেরাটা তুলে ধরল৷ ঝোপের আড়াল থেকে সামনের লোকগুলোকে তাক করে ক্যামেরা চালু করে দিল৷ ওর কান ভোঁ-ভোঁ করছিল, ঢোঁক গিলতে গলা ব্যথা করছিল, পা দুটোও মনে হয় কাঁপছিল, কিন্তু তা সত্ত্বেও ওর ক্যামেরা চলতে লাগল, ছবি উঠতে লাগল৷
পাঁচ-দশ সেকেন্ড কেটে যাওয়ার পর প্রিয়াংকা খানিকটা সুস্থির হল৷ ওর মধ্যে যেন ‘ফটোগ্রাফার’ প্রিয়াংকা জেগে উঠল৷ ছবি তুলতে-তুলতে লোকগুলোকে ও খুঁটিয়ে দেখতে লাগল৷
কোমরে হাত দিয়ে যে-লোকটা দাঁড়িয়ে আছে সে-ই মনে হয় আসল লোক৷
লোকটার রং ফরসা৷ মাথায় টাক৷ জংলা ভুরু চোখে চশমা৷ পুরু গোঁফ৷ বেশ মোটাসোটা চেহারা৷ একটা মাঝারি মাপের মানানসই ভুঁড়ি কোমরের ওপরে উপচে পড়ছে৷
লোকটার গায়ে নীল-সাদা ট্র্যাকসুট৷ গলায় ঝুলছে ফিতেয় বাঁধা মোবাইল ফোন৷
যে-লোকটা শত্রুর মাথায় রিভলভার ঠেকিয়ে রেখেছে সে তুলনায় বেশ রোগা৷ তবে চোয়াল, কাঁধ, চওড়া কবজি আর হাতের শিরা দেখে বোঝা যায় তার শক্তি মোটেও কম নয়৷ আর মুখে বেশ একটা পোড়-খাওয়া ভাব৷ যেন এরকম দৃশ্য তার কাছে জলভাত৷
লোকটার গায়ে ঘিয়ে রঙের হাফহাতা টি-শার্ট৷ তার ওপরে একটা কালো রঙের বুকখোলা স্লিভলেস জ্যাকেট৷ পায়ে বাদামি রঙের কটন প্যান্ট৷ বাঁ-হাতের কবজিতে স্টিল ব্যান্ড লাগানো রিস্টওয়াচ, আর ডানহাতের মধ্যমায় একটা স্টিলের আংটি৷
লোকটার গায়ের রং তামাটে৷ মাথায় কাঁচা-পাকা কোঁকড়ানো চুল৷ চোখজোড়া মুখের তুলনায় বেশ বড় মাপের৷ বাঁ-গালে একটা ছোট জড়াল মতন রয়েছে৷
হাঁটুগেড়ে বসে থাকা লোকটার মাথায় কাঁচাপাকা চুল—তবে পাকার ভাগটাই বেশি৷ চেহারা মোটার দিকে৷ গায়ে গাঢ় নীল রঙের পোলো নেক টি-শার্ট, কোমরে কালো চামড়ার বেল্ট, তার নীচে ছাই রঙের ঢোলা প্যান্ট৷
প্রিয়াংকার দিকে পিছন ফিরে থাকায় ও মুখটা দেখতে পাচ্ছিল না৷ শুধু লোকটার ঘাড়ের কাছে, চুল যেখানে শেষ হয়েছে, সেখানে দুটো চর্বির থাক আর একটা ভারী সোনার চেন ওর নজর টানছিল৷
লোকটার ‘আমি জানি না’ উত্তর শোনার পর রিভলভারওয়ালা চাপা গলায় হাসল৷ বলল, ‘তা হলে আর কী! কাম তামাম৷ খাল্লাস!’
রিভলভারের সেফটি ক্যাচ খোলার ‘ক্লিক’ শব্দ হল৷
সঙ্গে-সঙ্গে অসহায় লোকটা কঁকিয়ে উঠল, ‘বলছি, বলছি—প্লিজ, প্লিজ…৷’
রিভলভার-হাতে লোকটা ঠোঁট বেঁকিয়ে একবার হাসল৷ তারপর পাশে দাঁড়ানো সঙ্গীর দিকে তাকিয়ে এমনভাবে হাসল যার অর্থ হল : ‘দেখলেন তো, কীভাবে মুখ খোলাতে হয়!’
হাঁটুগেড়ে বসে থাকা লোকটা দু-হাত জোড় করে কান্নায় হাঁউমাঁউ করতে-করতে জড়ানো গলায় বলল, ‘আমার বেডরুমের ড্রেসিং টেবিলে—একটা কোল্ড ক্রিমের কৌটোর ভেতরে হিরেগুলো আছে— সাতটা—ক্রিমের ভেতরে লুকোনো আছে…৷’
লোকটার কথা পুরোপুরি শেষ হওয়ার আগেই একটা চাপা ‘ফট’ শব্দ হল৷ পিচবোর্ডের দেওয়ালে একটা ছোট্ট ঢিল ছুড়ে মারলে যেরকম শব্দ হয়৷ আর সঙ্গে-সঙ্গে নীল টি-শার্ট পরা মোটা লোকটা ঢলে পড়ল মাটিতে৷ ওর দেহটা কেমন যেন অদ্ভুত ভঙ্গিতে ভাঁজ হয়ে ঘাসের ওপরে পড়ে রইল৷ মাথাটা বাঁ-দিকে কাত হয়ে থাকায় কপালের ডানপাশের ছোট কালো ফুটোটা প্রিয়াংকা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিল৷
সামনাসামনি এই খুনের দৃশ্যটা দেখে প্রিয়াংকা একটা বিশাল ধাক্কা খেল৷ ওর গোটা শরীরটা কাঁপতে লাগল৷ ওর অজান্তেই মুখ দিয়ে একটা চাপা শব্দের টুকরো বেরিয়ে এল৷
লোকদুটো চকিতে শব্দ লক্ষ করে চোখ ফেরাল৷ তারপর দৌড়ে এগিয়ে আসতে লাগল আগাছার ঝোপের দিকে৷
প্রিয়াংকা আর দেরি করল না৷ ঘুরে দাঁড়িয়েই ছুট লাগাল সোনমদের খেলার মাঠের দিকে৷ আর একইসঙ্গে ‘সোনম! সোনম!’ করে পাগলের মতো চিৎকার করতে লাগল৷
