কথাটা মিমোর মনে ধরল৷ কারণ, ল্যান্ডলাইনের ওই একটা নম্বর আর প্রিয়াংকার নাম ছাড়া আর কিছুই ওরা জানে না৷
ও এপাশ-ওপাশ তাকিয়ে একটা ছোট্ট স্টেশনারি দোকান দেখতে পেল৷ দোকানটার একপাশে মাদার ডেয়ারির দুধের ট্যাঙ্ক৷ মালিক লুঙ্গি পরে উবু হয়ে বসে ট্যাঙ্কের কল খুলে পাবলিককে দুধ বিক্রি করছে৷ দোকানের বাকি অংশে ছোট কাউন্টার—সেখানে লজেন্স-বিস্কুট বোতলে সাজানো৷
মিমো পকেট থেকে একটা পাঁচ টাকার কয়েন বের করল৷ দোকানদারের কাছে গিয়ে বলল, ‘একটা সাদা কাগজ আর পেন দিন তো৷ কুইক!’
দোকানদার অবাক চোখে মিমো আর বাবলিকে দেখল৷ সাত-সকালে ছেলেদুটোর এত তাড়া কীসের!
এমন সময় মিমোর মোবাইল আবার বাজতে শুরু করল৷
ফোন ধরতে-ধরতেই মিমো দোকানদারকে ইশারায় তাড়া দিল৷
বাবলি দুধের খদ্দেরদের শুনিয়ে মন্তব্য ছুড়ে দিল, ‘জলদি করুন! এমার্জেন্সি৷ পুলিশ কেস—৷’
‘পুলিশ’ শব্দটা ম্যাজিকের মতো কাজ করল৷ দোকানদার ভদ্রলোক লুঙ্গি সামলে চট করে উঠে দাঁড়াল৷ লজেন্স-বিস্কুটের বোতলের ওপর ঝুঁকে পড়ে হাত বাড়িয়ে দিল কাউন্টারের ওপারে৷ একটু পরেই দিস্তে কাগজের একটা শিট আর একটা নীল রঙের বল পয়েন্ট পেন বাবলির হাতে তুলে দিল৷ বলল, ‘সাড়ে চার টাকা৷’
মিমো তখন ফোনে কথা বলছে৷ পাঁচ টাকার কয়েনটা ও দোকানদারের হাতে দিয়েই বাবলিকে লিখে নেওয়ার জন্য ইশারা করল৷ বাবলি পঞ্চাশ পয়সা ফেরত নিয়ে এদিক-ওদিক তাকিয়ে লেখার সুবিধের জন্য একটা জুতসই জায়গা খুঁজতে লাগল৷ এবং পেয়েও গেল৷ সামনেই একটা ছোট মন্দিরের চাতাল৷ তার একপাশ দিয়ে একটা বটগাছ ওপরে উঠে গেছে৷
মিমোকে জামা ধরে টান মারল বাবলি৷ পা চালিয়ে চাতালের কাছে গিয়ে বসে পড়ল৷ পেন বাগিয়ে ধরল কাগজের ওপর৷ মিমোর দিকে তাকিয়ে চাপা গলায় বলল, ‘মেয়েটা যা-যা বলবে জোরে জোরে সেগুলো বলবি—যাতে আমি টুকে নিতে পারি…৷’
মিমো তখন টেলিফোনে বলছে, ‘আপনি কোথায় থাকেন? বাড়ির অ্যাড্রেসটা বলুন…৷’
৷৷দুই৷৷
বেনেবউ পাখিটাকে অনেক দূর থেকে দেখতে পেল প্রিয়াংকা৷ ভোরের আলো এসে পড়েছে পাখিটার গায়ে৷ হলুদ রং ঝকঝক করছে৷ কালো কুচকুচে মাথা৷ ডানার শেষদিকটা মাথার মতোই কালো৷
বাইনোকুলার চোখে দিল প্রিয়াংকা৷ ওঃ, দারুণ! মনে হচ্ছে, পাখিটা হাতের নাগালে এসে গেছে৷ এইবার একটা ফটো তোলা দরকার৷ সুতরাং বাইনোকুলার ছেড়ে হ্যান্ডিক্যাম তাক করল ও৷ ‘জুম’ মোডে গিয়ে চট করে বেনেবউটার ছবি ক্যামেরাবন্দি করে নিল৷
প্রিয়াংকা ওর ছোটভাই সোনমকে নিয়ে প্রতিদিন ভোরবেলা ময়দানে আসে৷ সোনম খেলা করে, ছুটোছুটি করে৷ আর প্রিয়াংকা জগিং৷ সেইসঙ্গে আছে ওর পাখির নেশা৷ ও পাগলের মতো পাখি দেখে বেড়ায়, পাখি খুঁজে বেড়ায়৷ তখন ওর গলায় ঝোলে বাইনোকুলার, আর হাতে স্ট্র্যাপ দিয়ে বাঁধা থাকে সনি হ্যান্ডিক্যাম৷ এই বাইনোকুলার আর ভিডিয়ো ক্যামেরা—দুটোই এসেছে আমেরিকা থেকে৷ ওর ছোটকাকু ওকে প্রেজেন্ট করেছে৷
প্রিয়াংকা ঘড়ি দেখল৷ ছ’টা প্রায় বাজে৷ মাথার ওপরে ঘোলাটে আকাশ৷ গাছের পাতায়-পাতায় শিশিরের ফোঁটা৷ শীত চলে গেলেও ভোরবেলায় তার ছোঁয়া ভালোই রয়ে গেছে৷ সেইজন্য প্রিয়াংকা সোয়েট কাপড়ের একটা হলদে ফুলহাতা টপ আর জিনস পরে এসেছে৷
মাথা তুলে চারপাশের গাছগুলোর দিকে তাকাল৷ ঝাঁকড়া-ঝাঁকড়া বিশাল সব গাছ৷ একটা অশ্বত্থ বলে চিনতে পারল—বাকিগুলোর নাম ও জানে না৷ সবুজ পাতার ঘন ভিড়ের মধ্যে ও পাখির নড়াচড়া খুঁজতে লাগল৷ পাখিগুলো যদি নড়াচড়া না করে চুপটি করে পাতার ফাঁকে বসে থাকত তা হলে ওদের খুঁজে বের করাই মুশকিল হত৷
কখনও খালি চোখে কখনও বাইনোকুলার চোখে দিয়ে পাখির খোঁজ করে চলল প্রিয়াংকা৷ একবার চোখ ফিরিয়ে তাকাল দূরের মাঠের দিকে৷ সেখানে আট-দশজন ছেলে ব্যাট-বল নিয়ে ক্রিকেট খেলছে৷ তার মধ্যে সোনমও আছে৷ বাইনোকুলার চোখে দিয়ে সোনমের মুখটাকে খুঁজে বের করল ও৷ ফুটফুটে স্পষ্ট মুখ৷ ক্রিকেট খেলার উৎসাহে টগবগ করছে৷ খেলতে-খেলতে গা গরম হওয়ায় হাফ-হাতা সোয়েটারটা এখন খুলে রেখেছে৷
হঠাৎই কথাবার্তার শব্দ কানে এল৷ কারা যেন কাছেই কোথাও কথা বলছে৷
প্রিয়াংকা অবাক হয়ে গেল৷
পাখির খোঁজে ও যেদিকটায় এসেছে সেখানে শুধুই বড়-বড় গাছ, আর আশেপাশে কিছু খাটো ঝোপ৷ লোকজনের ভিড় এখানে নেই৷ খেলাধুলো করা ছেলেরা বা ভোরবেলা ময়দানে পায়চারি করতে আসা মানুষজনের ভিড় ওই মাঠের দিকে৷ তা হলে এখানে কথা বলছে কারা?
কথাগুলো যেদিক থেকে আসছে বলে মনে হল অনুমানে সেদিকে কিছুটা এগিয়ে গেল প্রিয়াংকা৷ ওর সামনে দুটি বিশাল গাছের গুঁড়ি আর একমানুষ সমান আগাছার ঝোপ৷ তার আড়ালে দাঁড়িয়ে ও কথাগুলো স্পষ্ট শুনতে পেল৷
‘হিরেগুলো এখন কোথায়?’ শক্ত গলায় কেউ জানতে চাইল৷
‘আ-আমি জানি না৷ বিশ্বাস করুন, আ-আমি জানি না৷’ কাতর অনুনয়ের সুর৷
‘এবার মনে পড়েছে?’
ঝোপের আড়াল থেকে উঁকি মারল প্রিয়াংকা৷ এবং যা দেখল তাতে ওর মুখ থেকে হেঁচকি তোলার মতো শব্দ বেরিয়ে আসতে চাইছিল৷ কোনওরকমে মুখে হাত চাপা দিয়ে ও শব্দটাকে আটকাল৷ বুকের ভেতরে হৃৎপিণ্ড লাফিয়ে উঠল, পাগলা ঘোড়ার মতো ছুটতে শুরু করল—ধক-ধক-ধক-ধক৷
