‘কে ফোন করেছে?’
‘জানি না৷ একটা মেয়ের গলা৷ আননোন মেয়ে—আননোন ফোন-নাম্বার…৷’
বাবলি ঠোঁটের কোণে হেসে চোখ টিপল : ‘শালা আননোন মেয়ে! বস, আমার কাছে লুকোলে কাকিমার কাছে কেস বিলা করে দেব…৷’
‘বিশ্বাস কর৷ গড ক্রস৷ মেয়েটা বলছিল পুলিশে খবর দিতে৷ তাই তো অবাক লাগছে৷’
কথাটা শুনে বাবলি চুপ করে গেল৷ চারপাশটা একবার দেখল৷ ওরা ছাড়া আরও তিনজন ব্যায়াম করছে৷ তুহিন চেন-পুলি নিয়ে ল্যাট তৈরি করছে৷ বিষাণ লেগ পুশ নিয়ে লড়ে যাচ্ছে৷ আর মাঝবয়েসি পুলিনবাবু ভুঁড়ি কমানোর জন্য টুইস্টারে দাঁড়িয়ে হাঁপাতে-হাঁপাতে কোমরে মোচড় দিচ্ছে আর আয়নায় নিজের ভুঁড়ির উন্নতি, কিংবা অবনতি আঁচ করার চেষ্টা করছে৷
না, মিমো আর বাবলির দিকে ওদের নজর নেই৷ তবে পঞ্চাদাটা ড্যাবডেবে চোখে ওদের দিকে তাকিয়ে আছে৷ ভাবটা এমন, যেন চোখ দিয়েই ওদের সব কথা শুনে ফেলবে৷
বাবলি চাপা গলায় বলল, ‘চল, বাইরে চল—দেখি ফোনটা আবার আসে কিনা৷’
মিমো বাবলির কথায় সায় দিল৷ ওরা দুজনে তাড়াতাড়ি দেওয়ালের হুক থেকে জামাকাপড় নিয়ে জিমের এক কোণে চলে গেল৷ নিজেদের তোয়ালে দিয়ে ঘাম মুছে জলদি ড্রেস করে নিল৷ তারপর চলে এল পঞ্চাদার টেবিলের কাছে৷
টেবিলে রাখা অ্যাটেনডেন্স রেজিস্টার খুলে ‘আউট’ কলামে সই করে সময় লিখল মিমো৷
মিমোর পর বাবলি যখন সই করছে তখন পঞ্চাদা জিগ্যেস করল, ‘কী রে, আর ব্যায়াম করবি না? কুড়ি মিনিটেই হয়ে গেল!’
বাবলি জানে, পঞ্চাদার হেভি কৌতূহল৷ সবসময় সকলের হাঁড়ির খবরের খোঁজ করে বেড়ায়৷ ও শান্ত গলায় বলল, ‘না, মানে, শরীরটা খারাপ লাগছে—৷’
‘দুজনেরই?’ পঞ্চাদা চোখ কুঁচকে জিগ্যেস করল৷
‘হ্যাঁ, দুজনেরই৷ তোমার কোনও প্রবলেম আছে?’ মিমো বলল৷
সঙ্গে-সঙ্গে ওর মোবাইল ফোনটা আবার বাজতে শুরু করল৷
পঞ্চাদা কী যেন একটা জবাব দিচ্ছিল, কিন্তু সেদিকে মিমো আর বাবলি মন দিতে পারল না৷ ওরা তাড়াহুড়ো করে জিমের কাচের দরজার দিকে প্রায় ছুটে গেল৷ তারপর একটানে দরজা খুলে জিমের বাইরে৷ সেখানে সিঁড়ির ল্যান্ডিং-এ বেশ কয়েকজোড়া নতুন-পুরোনো চটি৷ কারণ, জিমে খালি পায়ে ঢোকার নিয়ম, যাতে কার্পেট নোংরা না হয়৷
মিমো আর বাবলি তাড়াতাড়ি যার-যার চটিতে পা গলাতে লাগল৷ চটি পরতে-পরতেই মোবাইল ফোনের সুইচ টিপে ‘হ্যালো’ বলল মিমো৷ সিঁড়ি নামতে শুরু করল৷
আবার সেই মেয়েটির গলা৷
‘আমার নাম প্রিয়াংকা—প্রিয়াংকা মজুমদার৷ আমাকে এরা কিডন্যাপ করে নিয়ে এসেছে৷ আটকে রেখেছে৷ শিগগির পুলিশে খবর দিন৷ প্লিজ! যে করে হোক…আমাকে…বাঁচান৷ এরা বোধহয় আমাকে মেরে ফেলবে৷ আপনি…৷’
প্রিয়াংকা ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করল৷
মিমো বলল, ‘আমি এখুনি থানায় যাচ্ছি৷ আপনি ভয় পাবেন না৷ খবরটা দিলেই পুলিশ অ্যাকশান নেবে…৷’
মিমো আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু কড়কড় শব্দ করে টেলিফোনের লাইনটা হঠাৎ কেটে গেল৷
‘যাঃ, কেটে গেল৷’ বলে বাবলির দিকে তাকাল মিমো৷
বাবলি একরাশ কৌতূহল আর উৎকণ্ঠা নিয়ে মিমোর মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল৷ মিমো মোবাইল ফোনটা পকেটে ঢোকাতেই ও বলল, ‘কী করবি এখন? থানায় যাবি?’
‘এ ছাড়া তো আর কোনও পথ নেই—৷’
সিঁড়ি নামতে-নামতে ওরা দোতলা থেকে একতলায় চলে এল৷
একতলায় একটা মেঠো উঠোন৷ উঠোনের বাঁদিকে কলতলা৷ সেখানে বালতি, কলসি, হাঁড়ির লাইন লেগেছে৷ সেগুলো ঘিরে তাদের মালিকরা দাঁড়িয়ে৷ আর ডানদিকে একটা বড় ঘরে ছোট-ছোট বাচ্চাদের কিন্ডারগার্টেন স্কুল চলছে৷ তার লাগোয়া একটা সিমেন্ট বাঁধানো স্টেজ৷ সেখানে মাঝে-মাঝে জিমের অনুষ্ঠান হয়৷ আবার কখনও-বা কোনও ফাংশানের জন্য অল্প টাকায় ভাড়া দেওয়া হয়৷
মিমো আর বাবলি কথা বলতে-বলতে উঠোন পেরিয়ে গেল৷
উঠোনের পরই একটা গ্রিলের গেট৷ গেট পেরোলেই বাইরে যাওয়ার পথ—সিমেন্ট বাঁধানো একটা সরু গলি—এঁকেবেঁকে চলে গেছে চওড়া রাস্তার দিকে৷
মিমোকে খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে প্রশ্ন করে বাবলি ব্যাপারটা বুঝতে চাইছিল৷ প্রিয়াংকা নিজের নাম বলেছে বটে কিন্তু কোথায় থাকে সেটা বলেনি৷ তা ছাড়া ‘এরা’ মানে কারা? প্রিয়াংকাকে ওরা কোথায়ই-বা আটকে রেখেছে? ওকে কিডন্যাপ করেছে কেন? মুক্তিপণের জন্য?
বাবলি হঠাৎ বলল, ‘অ্যাই, তুই এক্ষুনি মেয়েটার নাম্বারে ফোন করে দেখ তো—৷’
মিমোরও এই কথাটা মনে হচ্ছিল৷ একবার ফোন করে দেখলে তো হয়! মেয়েটা কেন বারবার লাইন কেটে দিচ্ছে সেটা অন্তত বোঝা যাবে৷
ইনকামিং কলের লিস্ট দেখে সেই নম্বরটায় ফোন করল মিমো৷
কয়েক সেকেন্ড পরেই ও-প্রান্তে রিং বাজতে শুরু করল৷ বাজছে তো বাজছেই৷ কেউ ফোন ধরছে না৷
বেশ কয়েকবার চেষ্টা করেও কোনও লাভ হল না৷ শুধু রিং বেজেই গেল৷
মিমো কপালে ভাঁজ ফেলে বাবলিকে বলল, ‘কেসটা কিছু বুঝতে পারছি না৷ কেউ ফোন ধরছে না…৷’
ব্যাপারটা খুবই গোলমেলে মনে হল বাবলির৷ ফোন করলে ফোন ধরছে না, অথচ মাঝে-মাঝে মিমোর মোবাইলে ফোন করছে!
কিন্তু মেয়েটা হঠাৎ মিমোর মোবাইলে ফোন করল কেন? ওর ফোন-নম্বর পেল কোথায়? আর কথা বলতে-বলতে হুট-হাট করে লাইনই-বা কেটে দিচ্ছে কেন?
এসব কথা আলোচনা করতে-করতে ওরা দুজনে গলি ধরে এগোচ্ছিল৷ বাবলি গালে হাত বোলাতে-বোলাতে বলল, ‘মিমো, এক্ষুনি একটা কাগজ আর পেন জোগাড় করি চল৷ প্রিয়াংকা আবার যদি ফোন করে তা হলে ওর কাছ থেকে কী-কী জানতে চাইব তার একটা লিস্ট করে ফেলি৷ তারপর ও যা-যা জবাব দেবে সেগুলো চটপট টুকে নেব৷ কারণ, বস, থানায় গিয়ে তোমাকে তো কিছু সলিড খবর দিতে হবে৷ তা না পারলে পুলিশ হয়তো আমাদেরই ভেতরে ভরে দেবে—৷’
