এই ব্যায়ামটায় অসম্ভব শক্তি খরচ হয়৷ কয়েকবার শরীরটা ওঠানামা করালেই হাঁপ ধরে যায়৷ কিন্তু মিমো মনে-মনে জেদ ধরে ছিল৷ আজ ও চিনিংটা সাতবার করবেই৷
জিমের ঘরটা প্রায় বিশ ফুট বাই তিরিশ ফুট৷ ঘরের সব দেওয়ালে সুন্দর করে আয়না বসানো৷ যেন হঠাৎ করে মনে হয় আয়নামহল৷ সেই সব আয়নার ফাঁকে-ফাঁকে কাচের শার্সি দেওয়া স্টিল উইন্ডো৷ সব আয়নাগুলোই জানলার মাথা পর্যন্ত গিয়ে শেষ হয়েছে৷ তার ওপরে দেওয়ালে পৃথিবীর বিখ্যাত সব ব্যায়ামবীরের রঙিন ছবি সার দিয়ে টাঙানো৷ তারই মাঝে এক জায়গায় লাগানো একটা বড় মাপের ইলেকট্রনিক দেওয়াল-ঘড়ি৷
জিমের ঘরে ডিভিডি প্লেয়ারে হিমেশ রেশমিয়ার গান বাজছিল৷ ব্যায়াম করার সময় সবসময়েই কোনও গান কিংবা মিউজিক বাজানো হয়৷ এতে নাকি ব্যায়ামের রিদম ঠিক থাকে৷ বিশ্বজিৎদা বলেছেন৷
মিমো ফোনে ‘হ্যালো’ বলতেই প্রথমে একটু কড়কড় শব্দ ভেসে এল৷ তারপরই শোনা গেল একটি মেয়ের উদভ্রান্ত স্বর : ‘কে, বাপি? আমি পিয়া বলছি—৷’
‘বাপি?’ অবাক হয়ে মিমো বলল, ‘সরি, রং নাম্বার…৷’
কথাটা বলেই ও লাইন কেটে দিতে যাচ্ছিল, কিন্তু মেয়েটা বিপর্যস্ত গলায় বলে উঠল, ‘লাইন কাটবেন না, প্লিজ৷ আপনি কে বলছেন? চট করে বলুন—৷’
মিমো একটু বিরক্ত হল৷ সাতসকালে ও মোবাইল ফোন সঙ্গে নিয়ে বেরোয় শুধুমাত্র মায়ের জন্য৷ কারণ, ওর কোনও বন্ধুবান্ধবই এ সময়ে ফোন-টোন করে না৷ আর এই উটকো মেয়েটা অসময়ে ফোন করে ওকেই জিগ্যেস করছে, ‘আপনি কে বলছেন?’ অদ্ভুত তো!
‘আপনি ফোন করেছেন, আপনি বলুন আপনি কে বলছেন৷ হঠাৎ এই অড টাইমে ফোন করে আমাকে ডিসটার্ব করছেন কেন?’ রুক্ষ গলায় বলে উঠল মিমো৷
‘প্লিজ—প্লিজ৷ আমার হাতে সময় নেই৷ আপনি একটু পুলিশে খবর দিন…প্লিজ…৷’
ডিভিডি প্লেয়ারের আওয়াজের জন্য কথাগুলো শুনতে মিমোর বেশ কষ্ট হচ্ছিল৷ ফোনটাকে ও এত জোরে কানে চেপে ধরেছিল যে, কান ব্যথা করছিল৷
পুলিশে খবর দেওয়ার কথাটা শুনেই মিমো চমকে উঠল৷ ব্যাপারটা মনে হল সিরিয়াস৷ কারণ, ওর কোনও বন্ধুবান্ধব এ সময়ে ফোন করে কিছুতেই এ ধরনের ইয়ারকি করবে না৷
‘আপনি কোত্থেকে বলছেন? আপনার নাম কী? পুলিশে খবর দেব কেন?’
‘আমি…আমাকে এখানে…৷’
কানেকশানটা পট করে কেটে গেল৷
মিমো বারবার ‘হ্যালো-হ্যালো’ করেও ও-প্রান্ত থেকে কোনও সাড়াশব্দ পেল না৷ তখন ও বোতাম টিপে ‘কলার আইডি’ দেখল৷ অচেনা একটা ফোন-নম্বর৷ ল্যান্ডলাইন—নম্বরটা 2573 দিয়ে শুরু৷
একটু দূরে বাবলি চিত হয়ে শুয়ে বেঞ্চ প্রেস করছিল৷ মিমো মোবাইলে কথা বলা শুরু করতেই ও ব্যায়ামটা থামিয়ে দিয়েছিল৷ নিশ্চয়ই মিমোর মা ফোন করেছে৷ বাড়িতে হয়তো কোনও ঝামেলা হয়েছে৷ হয়তো সাতসকালেই পিসিদের সঙ্গে কলতলার ভাগাভাগি নিয়ে ঝগড়া শুরু হয়ে গেছে৷ প্রায়ই এরকম হয়৷
কিন্তু মিমোর কথাবার্তা বাবলি যেটুকু শুনতে পেল তাতে বুঝল, কেসটা অন্যরকম৷ তাই ও বেঞ্চ প্রেস ছেড়ে উঠে পড়ল৷
জিমে ঢোকার বড় দরজাটার পাশেই একটা ক্যাবিনেটে ডিভিডি প্লেয়ারটা রাখা আছে৷ তার স্পিকার দুটো দুপাশের দেওয়ালে প্রায় সিলিং-এর কাছাকাছি বসানো৷ সেগুলো থেকে জোরালো আওয়াজ বেরোচ্ছিল৷ এই আওয়াজের মধ্যে কথাবার্তা বলা বেশ অসুবিধে৷ তাই বাবলি চেঁচিয়ে বলল, ‘এই পঞ্চাদা, গানটা একটু অফ করো তো—৷’
পঞ্চাদা এই মুহূর্তে জিমের কেয়ারটেকার৷ জিমের বকেয়া চাঁদার তাগাদা করা, কেউ চাঁদা দিলে তাকে বিল কেটে দেওয়া, খাওয়ার জলের ব্যবস্থা করা, ডিভিডি প্লেয়ারের সিডি পালটানো কিংবা ভলিয়ুম বাড়ানো-কমানো—সবই পঞ্চাদার দায়িত্বে৷
ডিভিডি প্লেয়ারের কাছেই একটা বড় টেবিল৷ টেবিলের একদিকে একটা শৌখিন রিভলভিং চেয়ার৷ বিশ্বজিৎদা এলে এই চেয়ারটাতেই বসেন৷ এখন সেখানে কেয়ারটেকার পঞ্চাদা বসে আছে৷
জিমে ভরতি হওয়ার সময় বিশ্বজিৎ সাহাকে দেখে যেমন মনে ভরসা হয়, কেয়ারটেকার পঞ্চাদাকে দেখলে সেই ভরসা ফরসা হয়ে যেতে পারে৷ কারণ, পঞ্চাদা টিংটিঙে রোগা, তালগাছের মতো ঢ্যাঙা৷ ওর গায়ের রং কালো, চুল খোঁচা-খোঁচা, ছানাবড়া চোখে মেটাল ফ্রেমের চশমা, আর গায়ে সবসময় ক্যাটক্যাটে রঙের জামা৷
এই পঞ্চাদা যখন জিমের মেম্বারদের ওপরে খবরদারি করে তখন মিমোর ভীষণ হাসি পায়৷
পঞ্চাদা চেয়ারে বডি এলিয়ে চোখ বুজে গানের তালে-তালে দোল খাচ্ছিল৷ বাবলির কথায় ওর ঘোর ভাঙল৷ তাড়াতাড়ি সোজা হয়ে বসে হাত বাড়াল টেবিলে রাখা ডিভিডি প্লেয়ারের রিমোটের দিকে৷
গান থেমে গেল৷
মিমো অ্যাব কিং প্রো মেশিনটার কাছে দাঁড়িয়ে কী যেন ভাবছিল৷ বাবলি ওর কাছে এগিয়ে এসে জিগ্যেস করল, ‘কী রে, কেসটা কী? পিসিদের সঙ্গে ক্যাচাল হয়েছে?’
বাবলি উচ্চতায় মিমোর চেয়ে একটু খাটো৷ এই জিমে ও মিমোর তিনমাস আগে ভরতি হয়েছে৷ এর মধ্যেই বেশ মাসল বানিয়ে ফেলেছে৷ ওর ল্যাটতো দেখার মতো৷
বাবলির মাথায় ঘন কোঁকড়ানো চুল৷ ফরসা কপালের একপাশে একটা কাটা দাগ৷ লেখাপড়ার চেয়ে জিম ঢের বেশি ভালোবাসে৷ আর সবসময়েই উৎসাহে টগবগ করছে৷
মিমো বাবলির দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল : ‘না রে৷ কেসটা পিকিউলিয়ার৷ জানি না, কেউ মজাক করছে কি না…৷’
