অথচ এই চারজন কোকোর কেউ নয়!
মাকু এই সমীকরণটা বুঝতে পারছিল না৷ রক্তের সম্পর্কের বাইরের সম্পর্কটা ওকে অবাক করে দিয়েছিল৷ ওর মনের ভেতরে অন্যরকম একটা ঝড় উঠেছিল৷
একটা টাকমাথা বেঁটে শয়তান আমাদের গ্রাম থেকে একজনকে এভাবে তুলে নিয়ে যাবে! নয়তো লাশ ফেলে দেবে বলছে! আর আমি চুড়ি পরে বসে থাকব! এটা না আমার গ্রাম! আমাদের গ্রাম!
এই কথাগুলো মনে-মনে ভাবল মাকু৷ একইসঙ্গে ওর মনে হল, এতক্ষণ ধরে ও ভেবেছে অনেক কিন্তু কিছু করেনি—এবার কিছু করা দরকার৷
মাকু যে-দৌড়টা শুরু করল সেটা বোধহয় ওর বাইককে হারানোর মতন৷ শূন্য গতিবেগ থেকে এক অদ্ভুত ত্বরণ তৈরি করল ও৷ এবং যখন ওর শরীরটা মাস্টারজির শরীরে গিয়ে ধাক্কা খেল তখন মাস্টারজির মনে হল একটা প্রকাণ্ড উল্কার সঙ্গে তার সংঘর্ষ হয়েছে৷
মাস্টারজির শরীরটা দেওয়াল ঘেঁষে রাখা একটা বুককেসে গিয়ে ধাক্কা খেল৷ ঝনঝন শব্দে বুককেসের কাচ ভেঙে পড়ল৷ মাস্টারজির হাতের পিস্তল আর রিমোট দু-দিকে ছিটকে পড়ল৷ আর মাকু হাত-পা মুড়ে কাত হয়ে পড়ে গেল চেয়ার-টেবিলের ওপরে৷
মাস্টারজির জীবনীশক্তির তারিফ করতে হয়৷ কারণ, ভাঙা কাচের ওপরে সে স্থির হয়ে পড়ে রইল মাত্র কয়েক সেকেন্ড৷ তারপরই দু-দিকে নজর চেলে দেখে নিল পিস্তল আর রিমোটটাকে৷ চট করে যে কোনও একটাকে ঝাঁপিয়ে পড়ে তুলে নেওয়া যায়৷ কিন্তু কোনটা?
পিস্তলটাই বেছে নিল মাস্টারজি৷ এবং সেখানেই ভুল হয়ে গেল৷
‘ফাইটার’ বয় কোকো এই কয়েক সেকেন্ড সময়ের মধ্যেই উঠে দাঁড়িয়েছিল৷ মাস্টারজি যখন পিস্তল আর রিমোটের দিকে নজর চালিয়েছে তখনই ও মেঝেতে পড়ে থাকা রানাকে মাথার ওপরে তুলে নিয়েছে৷ মাস্টারজির হাত পিস্তলের দিকে এগোনোমাত্রই ও রানার দেহটা মাস্টারজিকে লক্ষ্য করে স্রেফ ছুড়ে দিয়েছে৷
সংঘর্ষের শব্দ হল৷ আর কোকো একইসঙ্গে লাফিয়ে পড়েছে মাস্টারজির ওপরে৷ রানার শরীরের নীচ থেকে মাস্টারজিকে টেনে বের করেছে৷ জামার কলার ধরে তার মুখটা তুলে এনেছে নিজের মুখের কাছে৷
হাপরের মতো হাঁপাতে-হাঁপাতে কোকো বলল, ‘রাহুলকে ছেড়ে আমি যাব না৷’ তারপর একটা ভয়ংকর হেডবাট৷ নিজের মাথাটা মাস্টারজির মাথায় ও সাংঘাতিক জোরে ঠুকে দিয়েছে৷
‘রাহুলকে ছেড়ে…আমি কোথাও যাব না৷’ আবার বলল কোকো৷
আবার হেডবাট৷
‘রাহুলকে ছেড়ে আমি কোথাও যাব না৷ কিছুতেই না৷’
আবার মাথায়-মাথায় সংঘর্ষ৷
কোকো যেন সত্যিই পাগল হয়ে গেছে৷ বারবার ও একই কথা বলছে আর ওর মাথাটা ঠুকছে মাস্টারজির টাকমাথায়৷ মাস্টারজির কপাল রক্তে ভেসে যাচ্ছে৷
‘কোকো! কোকো, থামো!’ চেঁচিয়ে উঠল রাহুল৷ ছুটে গেল ওর কাছে৷ ওকে শান্ত করার চেষ্টা করতে লাগল৷
বাপি, মাম আর সুলতানও ওকে থামাতে চেষ্টা করল৷
কোকো মাস্টারজির শরীরটা ছেড়ে দিতেই সেটা জাপানি পাখার মতো ভাঁজ হয়ে মেঝেতে পড়ে গেল৷
মাকু খোঁড়াতে-খোঁড়াতে ওদের কাছে এসে বলল, ‘আমি থানায় খবর দিচ্ছি—৷’
বাপি ওর দিকে ফিরে তাকিয়ে বললেন, ‘চলো, আমিও তোমার সঙ্গে যাচ্ছি—৷’
ঘর থেকে বেরোতে গিয়েও থমকে গেল মাকু৷ মেঝেতে পড়ে থাকা শিকলি, রানা আর মাস্টারজির দিকে দেখল৷ বলল, ‘আমরা দুজনেই যাব? এখানে যদি কিছু হয়?’
হাসলেন বাপি৷ কোকোর দিকে আঙুল দেখিয়ে বললেন, ‘কোনও ভয় নেই৷ কোকো আছে৷’
ওরা দরজা খুলে বৃষ্টির মধ্যে বেরিয়ে গেল৷
সরি, রং নাম্বার
৷৷এক৷৷
মিমোর শর্টস-এর পকেটে রাখা মোবাইল ফোনটা হঠাৎই বাজতে শুরু করল৷ চিনিং করতে-করতে থেমে গেল মিমো৷ মাথার ওপরের রডটা ছেড়ে দিয়ে লাফিয়ে নেমে পড়ল মেঝেতে৷ জিমের ফ্লোরে ভালকানাইজড রাবারের ফ্লোর ম্যাট, তার ওপরে সবুজ রঙের জুট কার্পেট৷ তাই কোনও শব্দ হল না৷
নিশ্চয়ই মা ফোন করেছে৷ পকেট থেকে মোবাইল ফোনটা বের করতে-করতে ভাবল মিমো৷ কারণ, ওর মা একটুতেই উতলা হয়৷ সবসময় টেনশানে ভোগে৷ তাই ইনকামিং কলের নম্বরের দিকে না তাকিয়েই ফোনটা কানে লাগিয়ে ‘হ্যালো’ বলল৷ এবং তখনই বুঝল, মা ফোন করেনি৷ তার বদলে অন্য একটা মেয়ের গলা৷
আজ জিমে মেম্বাররা বেশি আসেনি৷ অবশ্য শীতকালে এমনিতেই লোক কম হয়৷ এখন ‘শীতকাল’ চলে গেলেও শীতটা যেন পুরোপুরি যায়নি৷ ভোরের দিকে বেশ ঠান্ডা থাকে৷ তাই সাতসকালে জিমে এসে ব্যায়াম করার উৎসাহ বেশির ভাগেরই নেই৷ কিন্তু মিমোর ওসব ব্যাপার নেই৷ জিমে ভোরবেলা এসে শরীরটাকে তনদুরস্ত করা ওর নেশা৷ প্রায় বছরখানেক হল ও নিয়মিত এই জিমে আসছে৷
জিমের নাম শক্তি সংঘ জিমনাশিয়াম৷ ব্যায়ামের এই ক্লাবটার তদারকি অনেকে মিলে করলেও আসল লোক হল বিশ্বজিৎদা—বিশ্বজিৎ সাহা৷ যেমন সাহেবদের মতো টকটকে ফরসা গায়ের রং তেমনই আর্নল্ড সোয়ার্ৎজেনেগারের মতো বডি৷ জিমে প্রথমদিন ভরতি হতে এসে বিশ্বজিৎদাকে দেখেই ভরসা পেয়েছিল মিমো৷ ওর মনে হয়েছিল, এই জিমটায় ঢুকলে ওর বডির সত্যি কিছু হবে৷
আজ হালকা ওয়ার্ম-আপের পর মিমো চিনিং করছিল৷ স্লিভলেস গায়ে হলদে রঙের ওর বামচাম গেঞ্জি আর পায়ে কালো শর্টস৷ দু-হাতে কালো চামড়ার হাফ-দস্তানা৷ কবজিতে কালো রিস্টব্যান্ড৷
মাথার ওপরের রডটাকে আঁকড়ে ধরে ও নিজের শরীরটাকে ধীরে-ধীরে টেনে ওপরে তুলছিল৷ আবার একইভাবে শরীরটা নামিয়ে ঝুলে পড়ছিল৷
