মাস্টারজি মাথা পিছিয়ে নিল৷ ভয়ংকর একটা থাপ্পড় কষিয়ে দিল রাহুলের গালে৷
সাইকেলের টায়ার ফাটার মতো শব্দ হল৷ রাহুল কাত হয়ে পড়ে গেল মেঝেতে৷
মাম চিৎকার করে উঠলেন৷ সেইসঙ্গে বাপিও৷
আর কোকোর হাত বিদ্যুতের মতো ঝলসে উঠল৷ পলকে মাস্টারজির টুঁটি চেপে ধরল৷ মাস্টারজি জলে তলিয়ে যাওয়া মানুষের মতো দু-হাত শূন্যে ছুড়ে খাবি খেতে লাগল৷
‘রাহুলকে মারবে না!’ কোকো পশুর মতো গর্জন করে উঠল৷
‘শিকলি! শিকলি!’ মাস্টারজি চেঁচিয়ে উঠতে চাইল : ‘রানা! রানা! জানোয়ারটাকে ধর!’
ব্যাঙের ডাকের মতো আওয়াজ বেরোল মাস্টারজির গলা থেকে৷ শিকলি আর তার সঙ্গে দাঁড়িয়ে থাকা শাগরেদ ছুটে এল মাস্টারজির দিকে৷ শিকলির হাতে একটা লিকলিকে ফলার ছুরি ঝিকিয়ে উঠল৷
বাপি আর মাম ততক্ষণে রাহুলকে ধরে মেঝে থেকে তুলেছেন৷ রাহুলের ফরসা গালে পাঁচ আঙুলের লালচে দাগ বসে গেছে৷
শিকলি কোকোকে লক্ষ্য করে ছুটে আসছিল বুলেটের মতো৷ আর কোকো মাস্টারজির টুঁটি ধরে দাঁড়িয়ে ছিল৷ ও চকিতে একটা পা ভাঁজ করে শূন্যে তুলল—ঠিক একপায়ে দাঁড়িয়ে থাকা সারসের মতো৷ এবং পরমুহূর্তে সেই পা-টা ছুটে আসা শিকলিকে লক্ষ্য করে ছুড়ে দিল৷
শিকলির শরীরটা আবার বুলেটের গতিতেই ছিটকে গেল পিছনদিকে৷ দেওয়ালে গিয়ে সপাটে বাড়ি খেল৷ তারপর খসে পড়ল মেঝেতে৷ ছুরিটা ওর হাত থেকে কোথায় যেন ঠিকরে পড়ল৷
রাহুল ওর স্তম্ভিত ভাবটা কাটিয়ে চিৎকার করতে শুরু করল৷ মাম তখন হাউহাউ করে কাঁদছেন আর কোকোর নাম ধরে ডাকছেন৷
রানা নামের পাবলিক বোধহয় নিজেকে একটু বেশি বুদ্ধিমান ভেবেছিল৷ কারণ, ও কোকোর দিকে ছুটে আসতে-আসতে আচমকা মেঝেতে শুয়ে পড়ল৷ ফলে ওর দেহটা মসৃণ মেঝেতে পড়ে কোকোর পা লক্ষ্য করে দ্রুতগতিতে পিছলে এল৷
সংঘর্ষটা যদি ঠিকঠাক হত তা হলে কোকো নির্ঘাত উলটে পড়ত৷
কিন্তু কোকোর তৎপরতায় সেটা ঠিকঠাক হল না৷
ও মাস্টারজিকে এক ধাক্কা দিয়ে পিছনে ফেলে দিল৷ এবং বেড়ালের ক্ষিপ্রতায় শূন্যে লাফিয়ে উঠল৷
যখন কোকো নীচে পড়ল তখন ওর পায়ের নীচে রানা৷ ঢেঁকির পাড় দেওয়ার মতো কোকোর পা রানার শরীরে বারবার আছড়ে পড়ল৷ তারপর ওকে চুলের মুঠি ধরে এক ঝটকায় কোকো দাঁড় করিয়ে দিল৷ নিজের মাথা ঠুকে দিল ওর মাথায়৷
পাথরে-পাথরে ঠোকাঠুকি হল যেন৷ একটা ‘আঁক’ শব্দ করে রানা গোড়াকাটা কলাগাছের মতো পড়ে গেল৷ বোধহয় অজ্ঞান হয়ে গেল৷
রাহুলরা অবাক হয়ে যুদ্ধক্ষেত্রটা দেখছিল৷ মাস্টারজি, রানা আর শিকলি—তিনজন তিনদিকে পড়ে আছে৷ ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে কোকো লড়াকু সিংহের মতো ফোঁস-ফোঁস করে হাঁপাচ্ছে৷ ওর চোখমুখ লাল হয়ে গেছে৷ এক অদ্ভুত ভালোবাসার চোখে ও রাহুলের দিকে তাকিয়ে আছে৷
ওদিকে সুলতান এখনও মেঝেতে উবু হয়ে বসে আছে৷ মুখ দেখে মনে হচ্ছে, ও যে কী করবে সেটা ঠিক ভেবে উঠতে পারছে না৷
মাকু নীরব দর্শক হয়ে দাঁড়িয়ে৷ ভাবলেশহীন মুখ৷ চোয়াল নড়ছে৷ চুয়িংগাম বা কিছু একটা চিবোচ্ছে৷ রাহুল আর কোকোর সর্বনাশ দেখার জন্য ও যেন অনন্তকাল অপেক্ষা করতে পারে৷
কোকো রাহুলের দিকে এক পা এগিয়ে এল৷ হাঁপাতে-হাঁপাতে জিগ্যেস করল : ‘রাহুল, তোমার লাগেনি তো? তোমাকে ছেড়ে আমি যাব না৷’
কথা শেষ হতে না হতেই কোকো যন্ত্রণায় লাফিয়ে উঠল৷ পাগলের মতো ছটফট করতে লাগল৷ ওর গলার কন্ট্রোল ব্যান্ডে লাল আর সবুজ আলো দপদপ করে জ্বলতে লাগল৷
রাহুল দেখল, মাস্টারজি কখন যেন উঠে বসেছে৷ বাঁ-হাতে একটা চেয়ার ধরে সোজা হয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে৷ সোনালি ব্যান্ডের হাতঘড়িটা ছিটকে পড়ে আছে দূরে৷
কিন্তু রাহুলের নজর কাড়ল মাস্টারজির ডানহাতে ধরা জিনিসটা৷ একটা কালো রঙের রিমোট কন্ট্রোল ইউনিট৷ কোকোর দিকে তাক করে মাস্টারজি বোতাম টিপে ধরেছে৷ আর তাতেই কোকোর শরীরে বৈদ্যুতিক মরণযন্ত্রণা শুরু হয়ে গেছে৷
কোকো ছটফট করতে-করতে মেঝেতে পড়ে গেল৷ ওর শরীরটা এমনভাবে ঝটকা দিয়ে বেঁকেচুরে যাচ্ছিল যেন কেউ ওকে হাই ভোল্টেজ শক দিচ্ছে৷ একইসঙ্গে ও যন্ত্রণায় চিৎকার করছিল৷ মনে হচ্ছিল, ও বোধহয় এখনই মরে যাবে৷
বাপি আর রাহুল কোকোর নাম ধরে বারবার ডাকছিল৷ মাম কোকোর ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে ওর গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে ওকে শান্ত করতে চাইছিলেন৷ আর কোকোর শরীরটা ঘন-ঘন ঝটকা মেরে ধনুকের মতো বেঁকে যাচ্ছিল৷
মাস্টারজি তখন হিংস্রভাবে হাসছে৷ পায়ে-পায়ে এগিয়ে এসেছে কোকোর কাছে৷ রিমোটটা স্থির লক্ষ্যে কোকোর দিকে তাক করা৷
রিমোটটা বাঁ-হাতে নিল মাস্টারজি৷ তারপর ডানহাত শার্টের নীচে ঢুকিয়ে পিস্তলটা বের করে নিল৷ কোকোর মাথার দিকে পিস্তলের নলটা তাক করে চাপা গর্জন করে উঠল : ‘সালা, পাগলা কুত্তা! তোকে আর রেখে লাভ নেই৷ বড্ড বাড় বেড়েছিস৷ এবার খতম!’
মাস্টারজি হয়তো ট্রিগার টিপতে যাচ্ছিল, কিন্তু সেটা আর হয়ে উঠল না৷
বাইরে কোথাও বিকট শব্দে বাজ পড়ল৷ একইসঙ্গে মাম হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন৷ বাপি আর রাহুল ‘না! না!’ বলে চেঁচিয়ে উঠল৷ আর আহত সুলতান ছুটে এসে মাস্টারজির পা জড়িয়ে ধরল৷ কুকুরের মতো কাতর ‘কেঁউকেঁউ’ শব্দে কোকোর প্রাণভিক্ষা চাইতে লাগল৷
মাকু পায়ে-পায়ে ঘরের দরজার কাছে এগিয়ে এসেছিল৷ ও অবাক হয়ে দেখছিল, একটা সহজ-সরল প্রতিবন্ধী ছেলেকে বাঁচানোর জন্য চার-চারটে মানুষ কেমন আকুলি-বিকুলি করছে৷ তার মধ্যে একটা আবার মুসলমান!
