শুরুতে মাস্টারজির পিস্তলটা দেখামাত্রই বাপি আর মাম ভীষণ ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন৷ ওঁদের ভয় হচ্ছিল, এই বুঝি মাস্টারজি রাহুল কিংবা কোকোকে লক্ষ্য করে গুলি করে বসবে৷
কিন্তু এতক্ষণে বোধহয় বাপি একটু সাহস জুগিয়ে উঠেছিলেন৷ কোনও-রকমে আমতা-আমতা করে বললেন, ‘মাস্টারজি, আসুন—ঘরে এসে বসুন…৷’
‘হ্যাঁ, যাব…যাব৷’ সিগারেটে টান দিল৷ তারপর কোকোর দিকে তাকিয়ে : ‘কী, কোকো, কেমন আছিস?’
‘ভালো৷’ রাহুলের হাতটা পেঁচিয়ে ধরে থাকা অবস্থাতেই কর্কশ গলায় বলল কোকো৷ অনুভবে রাহুলের মনে হল, কোকোর কাঁপুনিটা এখনও রয়েছে৷
কোকোর দিকে এগোতে শুরু করল মাস্টারজি৷ সুলতান তখনও মেঝেতে বসে গোঙাচ্ছিল৷ মাকু, শিকলি, আর নাম-না-জানা একজন শাগরেদ বন্ধ দরজার কাছেই দাঁড়িয়ে রইল৷
কোকোর গালে দুবার আদরের আলতো চাপড় মেরে মাস্টারজি বলল, ‘কোকো, মাই ডার্লিং৷ অ্যাদ্দিন পালিয়ে থেকে তোর কত লস হয়ে গেল বল তো! আমারও তো বহুত টাকা লোকসান হয়ে গেল৷ এখন চল, ওই লস পুষিয়ে দিবি…৷’
বাপি মাস্টারজির কাছে এসে অনুনয় করে বললেন, ‘আপনি প্লিজ ঘরে এসে বসুন৷ কোকোর ব্যাপারটা আপনাকে খুলে বলছি…৷’
কৌতুকের চোখে বাপির দিকে তাকাল : ‘কোকোর ব্যাপার খুলে বলবেন? আমাকে?’ শব্দ করে হাসিতে ফেটে পড়ল মাস্টারজি৷ সিগারেটে ঘন-ঘন টান মারল৷ সিগারেটের আগুনটা সেই টানের সঙ্গে তাল মিলিয়ে উজ্জ্বল হয়ে উঠতে লাগল৷
‘না, না, আমাকে কিছু খুলে বলতে হবে না৷ আমি শুধু কোকোকে নিয়ে যেতে এসেছি৷ ও আমার৷’
মাস্টারজির কথার শেষে ‘ও আমার’ শব্দ দুটো মাম আর বাপিকে ভীষণ ধাক্কা দিল৷ রাহুলকেও৷ একইসঙ্গে ওর হাতের ওপরে কোকোর হাতের চাপ যে বেড়ে উঠল সেটাও রাহুল টের পেল৷
মাম প্রায় কান্না-কান্না গলায় মাস্টারজিকে বললেন, ‘ঘরে একটু বসুন৷ কয়েকটা কথা আপনাকে বলতে চাই৷ কোকোর…৷’
হাতের ইশারায় মামকে থামিয়ে দিল মাস্টারজি৷ পিস্তলটা কোমরে গুঁজে নিয়ে বলল, ‘বুঝেছি কী বলবেন৷ চলুন, ঘরে বসছি৷ কিন্তু আমার তাড়া আছে৷ বেশিক্ষণ টাইম দিতে পারব না৷’
বসবার ঘরে এসে বসল মাস্টারজি৷ বাপি সিলিং পাখাটা অন করে মাস্টারজির মুখোমুখি একটা চেয়ারে বসলেন৷ মাম বাপির পাশে দাঁড়িয়ে রইলেন৷ রাহুল আর কোকো হাত-ধরাধরি করে ঘরে ঢুকল৷ দরজার কাছটিতে দাঁড়িয়ে রইল৷
খোলা দরজার দিকে একবার তাকাল মাস্টারজি৷ শিকলি, মাকু, সুলতান—ওদের দেখা যাচ্ছে৷ সুলতান এখনও বসে আছে, তবে গালে একটা রুমাল চেপে ধরেছে৷
জ্বলন্ত সিগারেটের টুকরোটা ঘরের এককোণে ছুড়ে দিল মাস্টারজি৷ কপালে ভাঁজ ফেলে বলল, ‘জলদি বলুন—কী বলবেন৷’
‘কোকো আমাদের কাছে এই তিনমাস হল…’ বাপি শুরু করলেন, ‘ওকে আমরা…মানে…৷’
‘থাক, আর বলতে হবে না৷ বুঝেছি৷’ জামার পকেটে হাত ঢুকিয়ে দিল মাস্টারজি৷ একগোছা পাঁচশো টাকার নোট মুঠো করে বের করে নিয়ে এল৷
টাকাগুলো দেখেই বাপির মুখ লাল হয়ে উঠল৷ মাম ঘেন্নায় বলে উঠলেন, ‘ছিঃ! ছিঃ!’ তারপর আর সামলাতে পারলেন না—কেঁদে ফেললেন৷
বাপি এবার চোয়াল শক্ত করলেন৷ সুলতানের কাছ থেকে শোনা কথাগুলো এবার বোধহয় মাস্টারজিকে বলা দরকার৷ মাস্টারজির কাছে যতই পিস্তল থাকে, ‘করুণাময়ী’র ওই নরকে কোকো কিছুতেই ফিরে যাবে না৷
‘আপনি কোকোকে নিয়ে গিয়ে কী করবেন আমরা জানি…’ এইটুকু বলার পরই সুলতানের দিকে চোখ পড়ল বাপির৷ সুলতান তখন বাপিকে কিছু না বলার জন্য কাতরভাবে ইশারা করছে৷
মাস্টারজি মামের দিকে দেখছিল, তাই সুলতানের সূক্ষ্ম ইশারা খেয়াল করেনি৷ বিরক্তভাবে উঠে পড়ল চেয়ার ছেড়ে : ‘এখন এসব সেন্টিমেন্টাল নাটক দেখার টাইম নেই৷’ হাতঘড়ির দিকে তাকাল৷ তারপর কোকোর দিকে : ‘অ্যাই! চল৷ ফালতু দেরি হচ্ছে—৷’
‘না, কোকো যাবে না৷’ রাহুলের মুখ দিয়ে কথাগুলো ফস করে বেরিয়ে এল৷
মাস্টারজি অবাক হয়ে রাহুলের দিকে তাকাল৷ সাপের মতো ঠান্ডা চোখে ওকে কিছুক্ষণ দেখল৷ তারপর ব্যঙ্গের সুরে বলল, ‘কোকো তোমার কে হয়, খোকা? বন্ধু? ওর সঙ্গে ভালোবাসা হয়েছে? লাভ স্টোরি?’ বলেই হো হো করে হেসে উঠল মাস্টারজি৷
সেই হাসি মিলিয়ে যাওয়ার আগেই কোকো কর্কশ গলায় বলে উঠেছে, ‘আমি যাব না৷ রাহুলকে ছেড়ে আমি কোথাও যাব না—৷’
কোকোর কথায় মাস্টারজি হতবাক হয়ে গেল৷ চোখ গোল-গোল করে কোকোর দিকে তাকিয়ে রইল—যেন ভূত দেখছে৷
‘জানোয়ারটা দেখি কথা বলতে শিখে গেছে!’ চিবিয়ে-চিবিয়ে কথাগুলো বলল মাস্টারজি৷ নোটের গোছা আবার পকেটে ঢুকিয়ে রাখল৷ তারপর পায়ে-পায়ে কোকো আর রাহুলের দিকে এগোল৷
খোলা জানলা দিয়ে সকালের আলো দেখা যাচ্ছে৷ বৃষ্টি আগের চেয়ে অনেক জোরে পড়ছে৷ সেইসঙ্গে শুরু হয়েছে হাওয়ার ঝাপটা৷ কোথাও একটা খোলা জানলার পাল্লা দেওয়ালে মাথা কুটছিল৷ বৃষ্টির জলের রেণু বাতাসের তোড়ে ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়ছিল৷
রাহুলের কাছে এসে ওর মুখের খুব কাছে মুখ নিয়ে এল৷ রাহুল সিগারেটের কড়া গন্ধ পেল৷ সেইসঙ্গে মদের হালকা অপবাস৷
ও মুখ সরিয়ে নিতে গেল৷ তখন মাস্টারজি হিংস্র চাপা গলায় বলল, ‘কোকো আমার৷ ও আমার সঙ্গে যাবে৷ তুই ‘‘না’’ বলার কে রে?’
রাহুল একটুও দমল না৷ জেদি বাচ্চার মতো আবার বলল, ‘না, কোকো যাবে না!’
