চাপা গলায় দ্রুত পরামর্শ করল সবাই৷ মাম বাপিকে বললেন, ‘কী হবে এখন? থানায় ফোন করবে?’
বাপি কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন৷ কিন্তু তার আগেই কলিংবেল বেজে উঠল৷
দু-তিন সেকেন্ড চুপ করে থেকে বাপি চোয়াল শক্ত করে বললেন, ‘আর কিছু করার নেই৷ মোকাবিলা করতে হবে৷’
কথাগুলো বলেই বাপি সুইচবোর্ডের কাছে গেলেন৷ আলোর সব ক’টা সুইচ জ্বেলে দিলেন৷ রাহুলকে বললেন, ‘বাড়ির সব আলো এক্ষুনি জ্বেলে দে৷ আর কোকো কোথায়?’
‘ঘুমোচ্ছে৷’
‘ওকে শিগগির ডেকে তোল—৷’
রাহুল ব্যস্তভাবে ছুট লাগাল৷ ওর সঙ্গে-সঙ্গে সুলতানও ছুটল৷
এর মধ্যেই কলিংবেল আরও তিনবার বেজে উঠেছে৷ বেল বাজানোর ঢঙেই বোঝা গেল যারা এসেছে তারা বেশ অধৈর্য হয়ে উঠেছে৷
এবার বন্ধ দরজায় ধাক্কা পড়ল—পরপর তিনবার৷
তার একটু পরেই রাহুলের নাম ধরে কে ডেকে উঠল : ‘রাহুল! রাহুল!’
রাহুল চমকে উঠল৷ চেনা গলা৷ কিন্তু কে যেন?
এর মধ্যেই ও কোকোকে ধাক্কা দিয়ে ডেকে ঘুম থেকে তুলেছে৷
সব আলো জ্বালিয়ে দেওয়ার জন্য বাড়িটা আলোয় আলোময়৷ বন্ধ দরজা থেকে চার-পাঁচ হাত দূরে দাঁড়িয়ে ছিল সবাই৷ যেন কোনও একটা মাহেন্দ্রক্ষণের জন্য অপেক্ষা করছিল৷
আবার ধাক্কা৷ আবার ‘রাহুল৷ রাহুল৷’
কোকো ভয় পেয়ে রাহুলের হাত জড়িয়ে ধরল৷
বাপি কেমন যেন মরিয়া হয়ে উঠলেন৷ বললেন, ‘খুলে দিই৷ নইলে ওরা দরজা ভেঙে ফেলবে৷’
দরজা খুলতেই ওপিঠ থেকে জোরালো ধাক্কা মারল কেউ৷ একটা পাল্লা দেওয়ালে বাড়ি খেল৷ আর বাপি ছিটকে গেল একপাশে৷ একঝলক জোলো বাতাস ছুটে এল ভেতরে৷
বাপিকে তাচ্ছিল্যের ধাক্কায় সরিয়ে বাড়িতে ঢুকে পড়ল চারজন৷
চারজনের শরীরই জলে ভেজা৷ তার মধ্যে শুধু প্রথমজনকে চিনতে পারল রাহুল৷ মাকু৷ ভিজে চুল কপালে নেমে এসেছে৷ মুখে-চোখে বৃষ্টির জল পড়লেও ঘুমের ছাপ এখনও মুছে যায়নি৷ ওর চোয়াল নড়ছে৷ কী যেন চিবোচ্ছে৷
দ্বিতীয় লোকটা টাকমাথা৷ বেঁটে৷ দাড়ি-গোঁফ কামানো৷ ময়লা রোগাটে চেহারা৷ কুতকুতে চোখ৷ কালো প্যান্টের ওপরে একটা ঢোলা খয়েরি শার্ট৷ শার্টটা জলে ভিজে গাঢ় রঙের দেখাচ্ছে৷ হাতে সোনালি ব্যান্ডের একটা ঘড়ি৷
লোকটার সামনের ওপরের পাটির দাঁতগুলো উঁচু৷ ফলে একটা খরগোশ-খরগোশ ভাব এসেছে৷ হঠাৎ করে দেখলে মজার কমেডিয়ান বলে মনে হয়৷
কিন্তু আসলে যে তা নয় সেটা ওর হাতের গাঢ় নীল পিস্তলটা দেখেই বোঝা যাচ্ছে৷
মাকু দ্বিতীয় লোকটার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘মাস্টারজি—ওই যে রাহুল৷’ একইসঙ্গে রাহুলের দিকে চোখের ইশারা করল ও৷
মাস্টারজি কাশল দুবার৷ বাঁ-হাত দিয়ে বৃষ্টি-ভেজা মুখ মুছল৷ তারপর রাহুলদের দিকে চোখ রেখেই খেঁকিয়ে উঠে হুকুম দিল, ‘শিকলি, দরজাটা ভালো করে এঁটে দে৷ যেন পাবলিক ডিসটারবেন্স না হয়…৷’
হুকুমটা শোনামাত্রই সবচেয়ে পিছনে যে ছিল—শিকলি—সে দরজাটা বন্ধ করে খিল আর ছিটকিনি ভালো করে এঁটে দিল৷
মাস্টারজি ভেতরে ঢুকে এল৷ সুলতানের কাছে এসে দাঁতে দাঁত চেপে নীচু গলায় একটা গালাগাল দিল৷ তারপর ওর থুতনি ধরে নেড়ে দিয়ে চওড়া হেসে বলল, ‘সালা, এটা তোর চায়ের দোকান?’ পরক্ষণেই গলা মিহি করে সুলতানকে নাটুকে ঢঙে ভেংচাল : ‘কোকোকে এখনও পাইনি, মাস্টারজি—খুঁজছি৷’
একটু থেমে শাসানির গলায় মাস্টারজি বলল, ‘‘করুণাময়ী’’-তে চল—তোর হিসেব নিচ্ছি৷’
সুলতান কাঁচুমাচু মুখে হাতজোড় করে বলল, ‘মাস্টারজি, মাপ করে দিন৷ গলতি হয়ে গেছে৷ প্লিজ, মাস্টারজি…৷’
মাস্টারজি দাঁত বের করে হাসল, বলল, ‘মাপ করে দেব—অ্যাঁ? এতবড় গুস্তাকি মাপ করে দেব?’
চোখের পলকে হাতের পিস্তলটা সাঁ করে ঘুরিয়ে সুলতানের গালে বসিয়ে দিল মাস্টারজি৷
কালীপটকা ফাটার মতো শব্দ হল৷ সুলতানের গালে রক্তের রেখা দেখা দিল৷ সুলতান ‘ইয়া আল্লা’ বলে দু-হাতে মুখ চেপে মেঝেতে বসে পড়ল৷
মাম আতঙ্কে চিৎকার করে উঠলেন৷ মাকুর চোখে-মুখে ভয়ের ছায়া৷ আর বাপি তো পাথর!
রাহুল স্পষ্ট টের পেল কোকোর হাতটা থরথর করে কাঁপছে৷ ও মনে-মনে চাইছিল, মামের চিৎকারটা যেন প্রতিবেশীদের কেউ শুনতে পায়, যেন তারা সাহায্যের জন্য ছুটে আসে৷
কিন্তু কাকভোরে এই বৃষ্টির মধ্যে কে আসবে!
মাস্টারজি পিস্তলটা কোমরে গুঁজে নিল৷ অস্ত্রটা ঢোলা শার্টের আড়ালে ঢাকা পড়ে গেল৷
পকেট থেকে সিগারেট আর দেশলাই বের করল হিংস্র লোকটা৷ ঘাড় কাত করে সিগারেট ধরাল৷ ‘উঁ-উঁ’ করে শব্দ করল মুখে৷ তারপর ধোঁয়া ছাড়ল৷ সিগারেটের প্যাকেট আর দেশলাইয়ের বাক্স পকেটে ভরে কয়েকবার হেঁচকি তুলে হাসল৷
হঠাৎই যেন মাকুর কথা মনে পড়ে গেছে এমন ভাব করে পিছনে তাকাল মাস্টারজি৷ তারপর ওর কাছে এগিয়ে গেল৷ যেতে-যেতে পিস্তলটা আবার বের করে নিল৷
সিগারেট ঠোঁটে ঝুলিয়ে মাকুর পিঠ চাপড়ে দিল মাস্টারজি : ‘ভাগ্যিস রেললাইনের ধারে এই ছোঁড়াটার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল৷ ওরা বসে-বসে তাস পিটছিল…’ পকেট থেকে একটা পাঁচশো টাকার নোট বের করল মাস্টারজি৷ ওটা মাকুর হাতে দিয়ে বলল, ‘এই নাও, ভাই—তোমার প্রাইজ মানি৷ তাস খেলায় তুমি জিতছিলে—আমার সঙ্গে এসে তোমার তো লস হয়ে গেছে৷ তো এই নোটটা দিয়ে পুষিয়ে নিয়ো—কেমন?’
মাকু টাকাটা পকেটে ভরে কাঠ-কাঠভাবে হেসে ঘাড় কাত করল : ‘থ্যাংকস—৷’
