সুলতান উঠে দাঁড়াল৷ চারপাশে তাকিয়ে হাত নেড়ে বলল, ‘এখানে দেখছি কোকো খুব ভালো আছে৷ আপনারা ওকে ঘরের একজন করে নিয়েছেন…৷’ কোকোর কাছে এগিয়ে গেল সুলতান৷ ওর গালে আঙুল ছুঁইয়ে বলল, ‘কোকো, তুই এখানে থেকে যা৷ এখান থেকে আর কোথাও যাস না৷ এটা জন্নত৷’
কোকো হেসে বলল, ‘রাহুলকে ছেড়ে আমি কোথাও যাব না৷’
মাম উঠে দাঁড়ালেন৷ কোকোর মাথাটা মাতৃস্নেহে কাছে টেনে নিলেন৷ বললেন, ‘তোকে আমরা কিছুতেই ছাড়তে পারব না৷ তুই এত ভালো৷ এ-গ্রামের সবাই তোকে ভালোবাসে…৷’
কথায়-কথায় রাত অনেক হয়ে গিয়েছিল৷ সুলতান হাতঘড়ি দেখে বলল, ‘স্যার, সব তো আপনাদের খুলে বললাম—এবারে বলুন আপনারা কী করবেন…৷ আমি কি চলে যাব—না আপনারা আমাকে পুলিশে দেবেন?’
মাম আর বাপি মুখচাওয়াচাওয়ি করতে লাগলেন৷
সুলতান আক্ষেপের গলায় বলল, ‘লাইফে অনেক পাপ করেছি৷ কিন্তু এই অনাথ ছেলেটার হেনস্থা আমার আর সহ্য হচ্ছে না৷ মাস্টারজি আমাকে পেলে হয়তো মার্ডারই করে ফেলবে৷ সে করুক৷ কিন্তু কোকোর…৷’
রাহুল আচমকা উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘না, সুলতানদা, তুমি আমাদের সঙ্গে থাকো৷ মাস্টারজি এলে আমরা মাস্টারজিকে বোঝাব…বলো না, বাপি—৷’ বলে বাপির দিকে তাকাল রাহুল৷
বাপি বললেন, ‘হ্যাঁ—রাহুল ঠিকই বলেছে৷ মাস্টারজিকে আমরা বোঝাব…বলব যে…’, স্ত্রীর দিকে ফিরে তাকালেন : ‘বলব যে, কোকো আমাদের সঙ্গে থাকুক৷ দরকার হয় মাস্টারজিকে আমি টাকা অফার করব…৷’
মাম মাথা নেড়ে বাপির কথায় সায় দিলেন৷ বললেন, ‘মাস্টারজি আসা অবধি সুলতানভাইয়ের থাকা দরকার৷’ সুলতানের দিকে তাকিয়ে মাম বললেন, ‘আপনি আজকের রাতটা আমাদের কাছে থেকে যান—৷’
সুলতান হেসে বলল, ‘থ্যাংকস—৷’
রাহুল কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই কোকো যন্ত্রণায় ছটফট করে চেয়ার ছেড়ে লাফিয়ে উঠল৷ ওর গলার ব্যান্ডের লাল আর সবুজ বাতি দপদপ করে জ্বলতে শুরু করেছে৷
বাপি আর মাম ওকে জাপটে ধরলেন৷ সামলাতে চেষ্টা করলেন৷ রাহুল অসহায়ভাবে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগল৷
সুলতান চাপা গলায় বলল, ‘মাস্টারজি মনে হয় আরও কাছে এসে গেছে৷’
সঙ্গে-সঙ্গে সুলতানের মোবাইল ফোন বাজতে শুরু করল৷
৷৷আট৷৷
গাড়ির ইঞ্জিনের গর্জন রাহুলকে জাগিয়ে দিল৷ তখন সবে রাতের আকাশ ফরসা হতে শুরু করেছে৷ আকাশে চাপ-চাপ মেঘ থাকায় জায়গায়-জায়গায় গাঢ় ছাই রং জমাট বেঁধে ছিল৷ তা ছাড়া বৃষ্টির শব্দ পাচ্ছিল রাহুল৷ পাশের বাড়ির টিনের চালে আর গাছের পাতায় একই বৃষ্টি দুরকমের আওয়াজ তুলছিল৷ ব্যাপারটা অনেকটা যুগল-বন্দির মতো শোনাচ্ছিল৷
কাল রাতে খাওয়া-দাওয়ার পাট সেরে রাহুলরা যখন বিছানায় শুয়েছে তখন রাত অনেক গড়িয়ে গেছে৷ তারপর অন্ধকার ঘরে টেনশানে জেগে ছিল তিনটি মানুষ : রাহুল, সুলতান, আর কোকো৷ কিছুতেই ওরা দু-চোখের পাতা এক করতে পারছিল না৷
পাশের ঘরে বাপি আর মামেরও একই অবস্থা৷ কোকোকে নিয়ে টানাপোড়েনের যন্ত্রণা ওঁদের দু-জনকেই কষ্ট দিচ্ছিল৷ কোকোকে হারানোর আতঙ্কে মাম ফুঁপিয়ে-ফুঁপিয়ে কাঁদছিলেন৷
রাহুল এখন শুধু ইঞ্জিনের আওয়াজ শোনেনি, হেডলাইটের আলোও দেখতে পেয়েছিল৷ কারণ, খোলা জানলার পরদা ভেদ করে আলোর ছটা ঢুকে পড়েছিল ঘরের ভেতরে৷ তারপর গাড়ির চলার সঙ্গে তাল মিলিয়ে আলোর জ্যামিতিটা দেওয়ালে ধীরে-ধীরে সরে গিয়ে রাহুলের বুককেসের ওপরে থেমেছে৷ এবং পরক্ষণেই নিভে গেছে৷
রাহুলের বুকের ভেতরটা ধড়াস-ধড়াস করে উঠল৷ আবছা আলোয় ও তাকাল মেঝেতে শুয়ে থাকা সুলতান আর কোকোর দিকে৷ অনেক রাত পর্যন্ত জেগে থেকে-থেকে ওরা এখন ঘুমোচ্ছে৷ বোধহয় ক্লান্তিতে আর জেগে থাকতে পারেনি৷ শেষরাতের দিকে ঘুমিয়ে পড়েছে৷
ইঞ্জিনের শব্দটা বাড়ির কাছ ঘেঁষে এসে থামল৷
রাহুল বিছানা ছেড়ে নেমে দাঁড়াল৷ বেশ টের পেল ওর হাত-পা কাঁপছে৷
ও সুলতানের কাছে গেল৷ ঝুঁকে পড়ে জোরে ঠেলা মরাল ওকে : ‘সুলতানদা! সুলতানদা! ওঠো—ওঠো!’
সুলতান ধড়মড়িয়ে জেগে উঠল৷ অন্ধকারে রাহুলকে ঠাহর করতে চেষ্টা করল৷
‘শ-শ-শ-শ’ শব্দ করে সুলতানকে চুপ করে থাকতে ইশারা করল রাহুল৷ তারপর ফিসফিস করে বলল, ‘জানলা দিয়ে দ্যাখো তো৷ একটা গাড়ির আওয়াজ পেলাম—৷’
ঘুম কেটে গেল সুলতানের৷ ও চট করে উঠে দাঁড়াল৷ খুব সাবধানে জানলার কাছে গেল৷ দু-চোখে হাত ঘষে পরদা সরিয়ে উঁকি মারল৷
রাহুলদের বাড়ির সদর দরজার সামনে দাঁড়িয়ে একটা কোয়ালিস গাড়ি৷ হালকা আলোয় গাড়ির রংটা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না৷ তবে সাদা, কি ছাই, অথবা রুপোলি রঙের হতে পারে৷
বুকটা ধক করে উঠল সুলতানের৷ মাস্টারজির রুপোলি রঙের একটা কোয়ালিস গাড়ি আছে!
রাহুল সুলতানের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল৷ দেখল, গাড়ির দরজা খুলে নেমে এল চারজন লোক৷ ঝিরঝিরে বৃষ্টির মধ্যেই ওরা ব্যস্ত-ভাবে রাহুলদের গ্রিলের গেট খুলে ভেতরে ঢুকে পড়ল৷ চার-জনের মধ্যে একজনের হাঁটার ভঙ্গিটা কেমন যেন চেনা মনে হল রাহুলের৷
আর দেরি করল না রাহুল৷ ছুটে চলে গেল ঘরের দরজার কাছে৷ এক্ষুনি বাপি আর মামের ঘরে গিয়ে ডাকা দরকার৷
দরজা খুলতেই বাপি আর মামকে দেখতে পেল ও৷ লোহার গেটের শব্দে ওঁরা জেগে উঠেছেন৷ জানলা দিয়ে লোকগুলোকে দেখেওছেন৷
