সুলতানের কথাটা সবার মনে ধরল৷ মামের মুখে হাসি ফুটে উঠল৷ রাহুলও ওর খুশির ভাবটা চেপে রাখতে পারছিল না৷
বাপি চেয়ারে বসে পড়লেন আবার৷ সুলতানকে বললেন, ‘আচ্ছা, ওই মাস্টারজি তো আমাদের বাড়িটা খুঁজে নাও পেতে পারে…৷’
মাথা নেড়ে হাসল সুলতান : ‘উঁহু—সেটা হওয়ার জো নেই৷ ওই যে, ওর গলার ওই কন্ট্রোল ব্যান্ড৷ মাস্টারজির কাছে একটা রিমোট আছে৷ ওটার রেঞ্জ প্রায় পঞ্চাশ কিলোমিটার৷ ওই রিমোট দিয়ে কন্ট্রোল ব্যান্ডটাকে কন্ট্রোল করা যায়৷ ওই ব্যান্ডটা যদি কারও গলায় পরানো থাকে তা হলে ওই রিমোটের বোতাম টিপে বোঝা যায় লোকটা কত দূরে আছে৷ আর যার গলায় ওটা পরানো থাকে তাকে ওই রিমোটের বোতাম টিপে শায়েস্তা করা যায়…৷’
‘শায়েস্তা মানে?’ বাপি জিগ্যেস করলেন৷
‘মানে, রিমোটের বোতাম টিপলে কোকোর বডির ভেতর দিয়ে কীসব ওয়েভ যাবে৷ তাতে কোকোর যন্ত্রণা হবে, ও কাটা পাঁঠার মতো ছটফট করবে৷ আর-একটা লাল রঙের বোতাম আছে—সেটা টিপলে মাথা ধরবে, মাথার যন্ত্রণা হবে, মাথা ঘুরবে৷ মাস্টারজি ফরেন থেকে এরকম মেশিন বেশি কয়েকটা আনিয়েছে৷ ‘‘ফাইটার বয়’’-দের মধ্যে যারা একটু বেয়াড়া, এই মেশিনগুলো তাদের জন্যে৷ গলার ওই ব্যান্ডগুলো এমন যে, রিমোটের ঠিকঠাক বোতাম না টিপে ওগুলো গলা থেকে খুলতে গেলে অসহ্য পেইন হবে৷ যন্ত্রণায় পাগল হয়ে যাবে…৷’
রাহুলের মনে পড়ল, কোকো ওর গলার ওই ব্যান্ডটায় কাউকে কখনও হাত দিতে দেয় না৷ মরিয়া হয়ে বাধা দেয়৷
‘কোকোকে নিয়ে মাস্টারজির কি প্রবলেম হচ্ছিল যে, ওর গলায় কন্ট্রোল ব্যান্ড পরিয়ে দিয়েছে?’ মাম সুলতানকে জিগ্যেস করলেন৷
সায় দিয়ে মাথা নাড়ল সুলতান : ‘হ্যাঁ—প্রবলেম হচ্ছিল৷’ কোকোর দিকে এক অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকাল ও৷ নরম গলায় বলল, ‘কোকো ‘‘ফাইট ক্লাব’’-এ আর লড়তে চাইছিল না৷ ও আমাকে আড়ালে বলত ওর মনের কথা৷ বলত, ‘‘আমি আর লড়ব না৷ কাউকে আর মারব না৷ কষ্ট দেব না৷’’ এইসব কথা বলত সবসময়…৷
‘একদিন ও বেঁকে বসল৷ বলল, কিছুতেই ও আর লড়বে না৷ মারপিট করতে ওর আর ভালো লাগে না৷ মাস্টারজির সামনে রুখে দাঁড়াল৷ সেদিন থেকেই মাস্টারজি ছেলেটার ওপরে টরচার শুরু করল৷ মারধোর…সিগারেটের ছ্যাঁকা…কী না সয়েছে এই ভোলাভালা ছেলেটা…৷’ কথা বলতে-বলতে উঠে দাঁড়াল সুলতান৷ কোকোর কাছে এগিয়ে গেল৷ ওর মাথায় হাত রাখল : ‘মাস্টারজির চামচেগিরি করে আমিও ওকে কম টরচার করেছি! কিন্তু আশ্রমে একদিন দেখি ছেলেটা আমার ঘরে ঢুকে আমার মায়ের ফটো বুকে জড়িয়ে কাঁদছে৷ আমার আম্মি বহুদিন আগেই মারা গেছে৷ কোকো সেটা জানত৷
তো আমি তাজ্জব হয়ে ওকে জিগ্যেস করলাম, ‘‘কী রে, কী ব্যাপার? আমার মায়ের ফটো নিয়ে কাঁদছিস কেন?’’
‘ছেলেটা…এই হ্যান্ডিক্যাপ পাগলটা…আমাকে কী বলল জানেন, স্যার? বলল, ‘‘সুলতানদা, আমার মা নেই৷ মায়ের কোনও ফটোও নেই৷ তাই তোমার মায়ের ফটোটা নিয়েছি…৷’’
‘সেইদিন থেকে…সেইদিন থেকে, স্যার…আমি ওকে আমার ‘‘ভাই’’ ডেকেছি৷’ সুলতান চোখে কিছু একটা পড়েছে এমন ভান করে চোখ মুছল৷ একটু বসা গলায় বলল, ‘জানেন স্যার, অনেকবার ভেবেছি মাস্টারজির দল ছেড়ে দেব৷ কোকোকে নিয়ে কোথাও চলে যাব—কিন্তু পারিনি৷ পাপী পেট কা সওয়াল৷ ক’টা টাকার লোভে মাস্টারজির দলে পড়ে থেকেছি৷ মাস্টারজির আর-পাঁচটা পোষা গুন্ডার মধ্যে আমিও একটা হয়ে গেছি৷ কোকোকে সেভ করার চেষ্টা করেছি, কিন্তু পারিনি৷ ওর ব্যাপারে মাস্টারজি আমাকে সন্দেহ করত৷ তাই কোকো নদীতে ঝাঁপ দিয়ে পালানোর পর মাস্টারজি আমার সঙ্গে-সঙ্গে আরও চারজনকে কোকোর খোঁজে লড়িয়ে দিয়েছে৷’
মাম জিগ্যেস করলেন, ‘কোকো নদীতে ঝাঁপ দিল কেমন করে?’
সুলতান ফিরে এসে ওর চেয়ারে বসল৷ একটা বড় শ্বাস ফেলে বলল, ‘কয়েকজনের টিম নিয়ে মাস্টারজি বর্ধমানের একটা ফাইট কমপিটিশানে যাচ্ছিল৷ যারা গান-টান গায় তারা যেমন ফাংশান-টাংশান করতে যায় সেরকম মাস্টারজিও ‘‘ফাইট বয়’’-দের নিয়ে মাঝে-মাঝে গ্রামে-গঞ্জে যেত৷ বড়-বড় টাকার বাজি হত সেখানে৷ কোকো যেতে চায়নি, কিন্তু ওকে জোর করে গাড়িতে তুলেছিল মাস্টারজি৷ গাড়িতে আমিও ছিলাম৷ শিবাইচণ্ডীর কাছে—একটা নদীর ব্রিজ সবে পেরিয়েছি—আমাদের গাড়ির টায়ার পাংচার হল৷ তো আমরা কয়েকজন গাড়ি থেকে নেমে নদীর ধারে পায়চারি করছিলাম৷ আগের দিন রাতে মাস্টারজি আর ওর পোষা গুন্ডাগুলো কোকোকে কয়েকঘণ্টা ধরে টরচার করেছিল৷ কারণ সেই একই—ও আর লড়তে চাইছিল না৷ এমনি-এমনি কাউকে ও আর মারতে চাইছিল না৷
‘তো আমরা কয়েকজন নিজেদের মধ্যে কথা বলছিলাম৷ মাস্টারজি গাড়ির কাছে দাঁড়িয়ে টায়ার পালটানো দেখছিল৷ তখন কোকো হঠাৎ নদীতে ঝাঁপ দেয়৷ সেটা খেয়াল করতেই আমরা চেঁচিয়ে উঠি৷ মাস্টারজি ছুটে আসে নদীর পাড়ে৷ তারপর দৌড়ে গিয়ে গাড়ি থেকে রিমোটটা নিয়ে আসে৷ পাগলের মতো এ-বোতাম সে-বোতাম টিপতে থাকে৷ কিন্তু কোনও লাভ হয়নি৷ কোকো ততক্ষণে নজরের বাইরে চলে গেছে৷
‘ওকে হারিয়ে আমি দুঃখ পেয়েছিলাম ঠিকই৷ দুশ্চিন্তাও হয়েছিল৷ কোথায় না কোথায় গিয়ে পড়বে হ্যান্ডিক্যাপ ছেলেটা! দু-বেলা কীভাবে ওর খাবার জুটবে! আবার খুশিও হয়েছিলাম, স্যার৷ যে মাস্টারজির হাত থেকে খোকাটা আজাদ হতে পেরেছে…৷’
