‘হ্যাঁ৷ অনাথ আশ্রমে মাস্টারজির একটা ইল্লিগাল ক্লাব আছে৷ নাম ‘‘ফাইট ক্লাব’’৷ এই ক্লাবের কথা অনেকে জানে৷ পুলিশও জানে৷ তবে ওই টাকাপয়সা দিয়ে সেখানে মাস্টারজি লাইন করে রেখেছে আর কী! তো ওই ক্লাবে সপ্তাহে দু-দিন কি তিনদিন ফাইট কমপিটিশান হয়৷ দুজন ফাইটার বাজি ধরে লড়াই করে৷ সে-লড়াই নিয়ে দর্শকরাও বাজি ধরে৷ লড়াইয়ের পর ফাইটারদের টাকা দেওয়া হয়৷ যে জেতে সে পায় বেশি৷ যে হারে সে পায় কম৷ তবে কম পেলেও সে-টাকা অনেক৷ এর লোভে অনেকেই লড়াইয়ে নাম দেয়৷
‘আশ্রমের ছেলেদের বাচ্চা বয়েস থেকেই মাস্টারজি ট্রেনিং করায়৷ রেগুলার ব্যায়াম শেখায়, মারপিটের হরেক টেকনিক শেখায়৷ একজন ট্রেনার তাই-কোন্ডো শেখায়৷ নাম ভগবতীপ্রসাদ৷ ব্ল্যাক বেল্ট৷ একবার শুনেছি এশিয়ার চ্যাম্পিয়ান হয়েছিল৷ কোকো ওর খুব ফেবারিট ছাত্র৷ আট বছর ধরে কোকোকে লড়াই শেখাচ্ছে৷’
সুলতান একবার কোকোর দিকে তাকাল৷ কোকো শূন্য দৃষ্টি নিয়ে সরল মুখে বসে আছে৷ ওর চোখ সুলতানের দিকে৷
সুলতান আপনমনে মাথা ঝাঁকাল৷ সকলের মুখের ওপরে চোখ বুলিয়ে নিল৷ একটা বড় শ্বাস ফেলে আবার বলতে শুরু করল৷
‘ট্রেনিং দেওয়া ছেলেগুলোর মধ্যে থেকে মাস্টারজি ‘‘ফাইটার বয়’’-দের বেছে নেয়৷ তারপর ওদের খালি হাতে লড়াইয়ের স্পেশাল ট্রেনিং করায়৷ তারপর…তারপর ওরা ওই ‘‘ফাইট ক্লাব’’-এর জুয়ায় নাম দেয়৷ সেখান থেকে মেলা টাকা ইনকাম করে৷ ওদের সামান্য হাতখরচা দিয়ে বাকি টাকা মাস্টারজি চোট করে দেয়৷ তাই ‘‘ফাইটার বয়’’-দের মাস্টারজি সহজে হাতছাড়া করে না৷
‘আর কোকো?’ কোকোর দিকে ইশারা করে আক্ষেপের হাসি হাসল সুলতান : ‘ও এ পর্যন্ত একটাও লড়াই হারেনি৷ ও হচ্ছে ‘‘ফাইটার বয়’’-দের মধ্যে গোল্ডেন বয়৷ জুয়েল৷ সুপার হিরো৷ ওকে লড়াইয়ে নামিয়ে মাস্টারজি লক্ষ-লক্ষ টাকা ইনকাম করেছে৷ তাই কোনও অবস্থাতেই ওকে হারাতে চায় না মাস্টারজি৷ ওর খোঁজে মাস্টারজি আমাদের পাঁচজনকে লড়িয়ে দিয়েছে৷ আমিই সবার আগে কোকোকে খুঁজে পেলাম…কিন্তু মাস্টারজিকে সে-কথা কেমন করে জানাব! এই ছেলেটাকে আমি যে বড় ভালোবাসি…৷’ কথা বলতে-বলতে কোকোর দিকে তাকাল সুলতান৷ ওর চোখে স্নেহ আর আদর ঝরে পড়ছিল৷
হঠাৎই মোবাইল ফোন বেজে উঠল৷ আচমকা এই সুরেলা আওয়াজে সবাই চমকে উঠল৷
সুলতান তড়িঘড়ি পকেটে হাত ঢোকাল, ফোন বের করল৷ ইনকামিং কলের নম্বরটা দেখার পর ও এমনভাবে ফোনটার দিকে তাকিয়ে রইল যেন হাতের মুঠোয় একটা ঝুমঝুমি সাপ ধরে আছে৷
ওর হাবভাব দেখে কারও আর বুঝতে বাকি রইল না যে, ফোনটা কে করেছে৷
বাপির মুখের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে রইল সুলতান৷ চোখে জিজ্ঞাসা : এখন কী করবে?
বাপি ইশারায় ওকে ফোনটা ধরতে বললেন৷
‘হ্যালো—৷’ ফোনটা ধরেই সুলতান লাউডস্পিকার অন করে দিল—যাতে সবাই ও-প্রান্তের কথা শুনতে পায়৷
‘কে, সুলতান? মেড়াটাকে খুঁজে পেলি?’ মাস্টারজির ক্ষিপ্ত গলা৷
‘না, মানে…এখনও পাইনি৷ খুঁজছি৷’ ইতস্তত করে বলল সুলতান৷
‘তুই এখন কোথায়?’
‘মণিমেলায়…৷’
ও-প্রান্ত কিছুক্ষণ চুপ৷ তারপর : ‘আমরা মণিমেলা থেকে বিশ-পঁচিশ কিলোমিটার মতো দূরে আছি৷ আমার গাড়িতে একজন লোকাল লোককে তুলে নিয়েছি—লোকটা ঘিয়া নদীর আশপাশের গ্রামগুলো সব চেনে৷ তুই ভালো করে বিচ্ছুটাকে খোঁজ৷ ওটাকে পেলে আর লড়াব না৷ ‘‘করুণাময়ী’’-তে এনে জ্যান্ত জ্বালিয়ে দেব—যাতে আর কোনও ‘‘ফাইটার বয়’’ এরকম বেয়াদপি না করে৷’
মাস্টারজির শাস্তির কথাটা শুনে মামের মুখ থেকে ভয়ে একটা হেঁচকির শব্দ বেরিয়ে এল৷ সঙ্গে-সঙ্গে মাম মুখে হাত চাপা দিলেন—পাছে আবার কোনও শব্দ হয় এবং সেটা ফোনে শোনা যায়৷
সুলতানের মোবাইল সেটটা নিশ্চয়ই বেশ দামি, কারণ মাস্টারজি যে মামের চাপা আর্তনাদটা ফোনে শুনতে পেয়েছে সেটা পরের কথাতেই বোঝা গেল৷
‘সুলতান, তুই এখন কোথায়? কার বাড়িতে, উঁ?’ প্রশ্নগুলোর মধ্যে একটু ব্যঙ্গের খোঁচা৷
‘না, না—কারও বাড়িতে নয়৷ একটা…চায়ের দোকানে…৷’
‘হুঁ—বুঝেছি৷’
ফোন ছেড়ে দিল মাস্টারজি৷
সুলতান ভয় পেয়ে গেল : ‘এখন কী হবে? মাস্টারজি যদি এখানে চলে আসে?’
মাম বললেন, ‘শিগগির পুলিশে খবর দাও৷’
‘দাঁড়াও৷’ হাতের ইশারা করলেন বাপি : ‘আমাকে একটু ভাবতে দাও—৷’
কোকো এবার কথা বলল : ‘না, আমি এ-বাড়ি ছেড়ে…কোথাও যাব না…৷’
বাপি ওর দিকে একবার তাকালেন শুধু—কোনও কথা বললেন না৷ চেয়ার ছেড়ে উঠে পায়চারি শুরু করলেন৷
মাম বললেন, ‘মণিমেলায় মাস্টারজি যদি আসেও আমাদের বাড়ি কেমন করে খুঁজে পাবে? কোকো এখানেই থাক৷ যদি কোনও বিপদ-আপদ হয় তখন বরং থানায় খবর দেওয়া যাবে৷’
সুলতান মাথা চুলকোচ্ছিল৷ কী যেন ভাবছিল৷
রাহুল এতক্ষণ চুপ করে ছিল৷ কোকোকে দেখছিল৷ ও বাপিকে লক্ষ করে বলে উঠল, ‘কোকোকে আমরা ছাড়ব না, বাপি৷ ও আমাদের কাছে থাকবে৷’
বাপি পায়চারি করতে-করতে থুতনিতে কয়েকবার আঙুল বোলালেন৷ থানা-পুলিশ করলে ছেলেটাকে নিয়ে গিয়ে ওরা কী করবে কে জানে! হয়তো জেলখানাতে রেখে দেবে৷ নয়তো ফাইল চালাচালি করে কোনও পাগলা-গারদেই পাঠিয়ে দেবে৷
বাপি আর ভাবতে পারছিলেন না৷
সুলতান বলল, ‘স্যার, আমি পাপী-তাপী মানুষ৷ মাস্টারজির পয়সা খেয়ে বেঁচে আছি৷ কিন্তু এই ছেলেটা বড় ভালো৷ মানে, ওকে আমার খুব ভালো লাগে৷ ছোট মুখে একটা বড় কথা বলি৷ আপনারা ওকে কাছছাড়া করবেন না৷ মাস্টারজি এখানে আসে আসুক৷ তখন দেখা যাবে৷ যা হয় হবে…৷’
