ঠিক তখনই একটা অশ্বত্থগাছের গুঁড়ির আড়াল থেকে বেরিয়ে এল একটা ছায়া৷ কোকোর নাম ধরে ডাকল৷
‘অ্যাই, কোকো!’
রাহুল আর কোকো দুজনেই চমকে মুখ ফিরিয়ে তাকাল সেদিকে৷
জায়গাটা অন্ধকার৷ রাস্তার আলো ভালো করে পৌঁছয়নি সেখানে৷ গাছের কালো গুঁড়ির পাশে অস্পষ্ট একটা কালো ছায়া৷
‘কোকো—’ আবার ডাকল সেই ছায়া৷
কোকো এগিয়ে গেল অশ্বত্থগাছটার কাছে৷ পিছনে রাহুল৷
ছায়াকে চিনতে পারল কোকো : ‘সুলতানদা! তুমি!’
‘হ্যাঁ—আমি৷’ বলে সুলতান ওকে জড়িয়ে ধরল : ‘তুই কেমন আছিস?’ ওকে ছেড়ে দিয়ে ওর মুখটা ভালো করে দেখতে লাগল সুলতান৷
‘ভালো…আছি৷’ কোকো বলল৷
‘শোন—তোর খুব বিপদ৷ মাস্টারজি তোকে খুঁজছে৷’
সঙ্গে-সঙ্গে কোকোর গলার কন্ট্রোল ব্যান্ডের লাল আর সবুজ আলো জ্বলে উঠল৷ এবং কোকো যন্ত্রণায় ছটফট করে উঠল৷ ব্যান্ডটা দু-হাতে আঁকড়ে ধরে ও অদৃশ্য শত্রুর সঙ্গে লড়াই করতে লাগল৷ ছটফট করতে-করতে ওর শরীরটা মাটিতে পড়ে গেল৷ যন্ত্রণার টুকরো শব্দ বেরিয়ে আসতে লাগল ওর মুখ থেকে৷
৷৷সাত৷৷
সে-রাতটা রাহুলদের বলতে গেলে না ঘুমিয়েই কাটল৷ কারণ সুলতান যে-কাহিনি শোনাল তারপর রাহুল, ওর বাপি আর মামের দুশ্চিন্তা হওয়াটাই স্বাভাবিক৷
কোকোকে সামলে নিয়ে ধরে-ধরে বাড়ির দিকে হাঁটিয়ে নিয়ে চলল রাহুল—সঙ্গে সুলতান৷ যেতে-যেতে সুলতান রাহুলের সঙ্গে অল্প-অল্প কথা বলছিল৷
‘কোকো হারিয়ে যাওয়ার পর মাস্টারজি খেপে একেবারে পাগল হয়ে গিয়েছিল৷ তখন আমাদের পাঁচজনকে পাঁচদিকে খুঁজতে পাঠায়৷ সে তার রাগ কী! রেগে একেবারে আগুন৷ আমাকে বলে কি ‘‘জাহান্নম থেকে হলেও ওই মেড়াটাকে খুঁজে নিয়ে আয়৷’’ রাগে একদম গরগর করছিল৷’
‘এখন কী হবে?’ ভয় পেয়ে জিগ্যেস করল রাহুল৷
‘দেখি কী হয়৷’ চিন্তার সুরে বলল সুলতান৷ কোকোর কাঁধে আলতো চাপড় মেরে হাসল : ‘আসলে এই খোকাটাকে আমি বড্ড বেশি ভালোবাসি৷ ও খুব ভালো ছেলে৷ কিন্তু ওই কন্ট্রোল ব্যান্ড…৷’
‘কন্ট্রোল ব্যান্ড কী?’
‘ওই…মাস্টারজির কন্ট্রোল৷’
ওরা ততক্ষণে রাহুলদের বাড়িতে পৌঁছে গিয়েছিল৷
একটু পরে ওরা সবাই বসবার ঘরে গুছিয়ে বসল৷ কল্যাণবাবু বাড়ির দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করে খিল লাগিয়ে দিলেন৷ রাস্তার দিকের জানালাগুলোও ভেজিয়ে দিলেন৷ তারপর সুলতানের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করলেন৷ রাহুলের মাম স্বামীকে একপাশে ডেকে নিয়ে গিয়ে চাপা গলায় ফিসফিস করে বললেন, ‘আমার তো বুক কাঁপছে৷ রাহুল এই লোকটাকে কোথা থেকে জুটিয়ে নিয়ে এল? কী হবে এখন? তুমি বরং পুলিশে খবর দাও—৷’
কল্যাণবাবু স্ত্রীকে আশ্বস্ত করে বললেন, ‘এখন না৷ আগে এর সঙ্গে কথা বলে দেখি৷ লোকটা এমনিতে খারাপ না৷ কোকোকে খুব ভালোবাসে—’ স্ত্রীর কাঁধে হাত রেখে কল্যাণবাবু অনুরোধ করলেন, ‘আমাদের একটু চা-টা খাওয়াবে না?’
রাহুলের মাম ‘নিয়ে আসছি’ বলে রান্নাঘরের দিকে চলে গেলেন৷
কল্যাণবাবু সুলতানের মুখোমুখি বসলেন৷ ভাবলেন, লোকটাকে দেখে তো শয়তান বলে মনে হচ্ছে না৷ একটু কথা বলে দেখা যাক না৷ কোকোকে সহজে আমরা ছাড়ব না৷
সুলতানের বয়েস চল্লিশ-বিয়াল্লিশ৷ চেহারা মাঝারি৷ রং ময়লা৷ গাল বসা৷ থুতনিতে কাঁচাপাকা দাড়ি৷ কথা বলার সময় মাঝে-মাঝেই ভুরুজোড়া ওপরদিকে তোলে৷ গায়ে হালকা সবুজ হাফশার্ট আর ময়লা হয়ে যাওয়া জিনসের প্যান্ট৷
একটু পরেই মাম চা নিয়ে ঘরে ঢুকলেন৷ বাপিকে চা দিলেন৷ সুলতানকে দিলেন৷ নিজেও নিলেন৷ তারপর কোকোর পাশে গিয়ে বসলেন৷
চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে সুলতান মাস্টারজির কাহিনি বলতে শুরু করল৷
‘স্যার, কলকাতার কাছাকাছি খড়দায় মাস্টারজির একটা অনাথ আশ্রম আছে৷ ‘‘করুণাময়ী’’ নাম৷ সেখানে বাপ-মা মরা হ্যান্ডিক্যাপ ছেলেরা থাকে৷ মাস্টারজি ওদের দু-বেলা খেতে দেয়, থাকতে দেয়—আর কাজ শেখায়৷ কাজ তো সব নানারকমের : রাজমিস্ত্রির কাজ, ছুতোরমিস্ত্রির কাজ, লেদ কারখানার কাজ, গেঞ্জির কল চালানোর কাজ, আরও কতরকম৷
‘মাস্টারজির অনেক কলকারখানা আছে, ব্যবসা আছে, কলকাতার সল্টলেকে তিনতলা জমকালো একটা বাড়ি আছে৷ লোক বলে, মাস্টারজি বহুরকম দু-নম্বরি ব্যবসার সঙ্গে মিলেজুলে আছে৷ একবার জাল নোট মার্কেটে ছাড়তে গিয়ে গোয়েন্দা-পুলিশের হাতে ধরা পড়েছিল৷ তিনমাস জেলও খেটেছিল৷ তারপর জেল থেকে বেরিয়ে কীভাবে যেন পুলিশের সঙ্গে লাইন করে নিয়েছিল৷’
বাপি জিগ্যেস করলেন, ‘কোকো ওই ‘‘করুণাময়ী’’-তে গেল কীভাবে?’
‘কীভাবে আবার! ওর নসিব৷’ চায়ে চুমুক দিয়ে বলল সুলতান৷ একটু উসখুস করল৷ তারপর : ‘মাস্টারজির দলে অনেক আড়কাঠি আছে—দালাল৷ ওরা সব হ্যান্ডিক্যাপ ছেলের খবর আনে৷ তারপর ওই আশ্রমে ওদের ভরতি করে মাস্টারজি কমসেকম একটা বছর ঠিকঠাক চালায়৷ দ্যাখে যে, কেউ ওই ছেলেগুলোর খোঁজখবর করতে আসছে কি না৷ মানে, বাবা, মা, রিলেটিভ কেউ আসছে কি না৷ তারপর কেউ না এলে তখন মাস্টারজি নিশ্চিন্ত হয়৷ নিজের মতো করে ওদের ট্রেনিং চালু করে৷’
‘কীসের ট্রেনিং?’ রাহুল জিগ্যেস করল৷
উত্তরে মলিন হাসল সুলতান৷ বলল, ‘ওই হরেকরকম কাজ শেখানোর ট্রেনিং৷ কলকারখানার কাজের ট্রেনিং৷ এ ছাড়া আছে ফাইটিং-এর ট্রেনিং…৷’
‘ফাইটিং-এর ট্রেনিং!’ মাম অবাক হয়ে বললেন৷
