রাহুল ওকে ছাড়ল না৷ বলল, ‘কেন, ‘‘না’’ কেন? এবারে তো আর টিপের ব্যাপার না—গায়ের জোরের ব্যাপার৷ তুমি যে বল তোমার গায়ে অনেক জোর! তা হলে ‘‘না’’ বলছ কেন?’
‘না, সেজন্যে না—৷’ আলতো করে বলল কোকো৷
‘তা হলে কী জন্যে?’
‘দোকানদারের একশো টাকা…মার যাবে৷ তাই—৷’
রাহুল হেসে ফেলল৷ কোকোকে বোঝাল যে, দোকানদার ইতিমধ্যেই অনেক টাকা লাভ করেছে৷ এখন একশো টাকা গেলে তার কোনও ক্ষতি হবে না৷
রাহুল কোকোর হয়ে এন্ট্রি ফি জমা দিল৷ তারপর কোকোকে ঠেলে টিউবওয়েলটার দিকে এগিয়ে দিল৷
কোকো টিউবওয়েলের হাতলের কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই পাবলিক হইহই করে উঠল৷ কোকো হাতলটা ধরে সামান্য ঝুঁকে পজিশন নিল৷
দোকানদার চিৎকার করে প্রতিযোগিতার ব্যাপারে নানান ঘোষণা করছিল৷ কোকো হাতলটা ধরে দাঁড়াতেই সে বলল, ‘আপনি রেডি? এ—ক৷’
কোকো টিউবওয়েল পাম্প করা শুরু করল, আর দোকানদারও গোনা শুরু করল৷
কোকো যেটা করছিল সেটা হাই স্পিড সিনেমার মতো৷ ওর তিন নম্বর পাম্পের সঙ্গে-সঙ্গে জল বেরোতে শুরু করল৷ কিন্তু কোকো না থেমে পাম্প করে চলল৷ ছ’নম্বর পাম্পে জলের ধারাটা ময়াল সাপের মতো মোটা হয়ে গেল৷
রাহুল চিৎকার করছিল, ‘কোকো৷ থামো! থামো!’ কিন্তু পাবলিকের হল্লায় ওর কথা চাপা পড়ে গেল৷
দোকানদার ব্যস্তভাবে কোকোর কাছে গিয়ে ওকে থামাল৷ ওকে শাবাশ দিয়ে একশো টাকা পুরস্কার তুলে দিল ওর হাতে৷ তারপর চেঁচিয়ে বলতে লাগল কোকোর কৃতিত্বের কথা : ‘এইমাত্র একজন পালোয়ান জিতে নিয়েছেন এ-ক-শো টাকা৷ ভাইসব, আমার এই কমপিটিশানে কোনও কারচুপি নেই, কোনও চিটিংবাজি নেই৷ আপনারা এগিয়ে আসুন…৷’
কোকো আর রাহুল ভিড় ঠেলে বাইরে এল৷ রাহুল কোকোর পিঠ চাপড়ে বলল, ‘কনগ্র্যাচুলেশান, কোকো—শাবাশ!’
কোকো একশো টাকার নোটটা রাহুলের দিকে এগিয়ে দিল : ‘এটা রেখে দাও৷’
রাহুল টাকাটা পকেটে রেখে বলল, ‘এই টাকাটা মাম আর বাপিকে দেব৷ বলব, কী সহজে তুমি প্রাইজ জিতেছ—৷’
ওরা দুজনে গল্প করতে-করতে ‘শকুন্তলার মাঠ’ ছেড়ে বেরিয়ে এল৷
ফেরার পথে রেললাইনটা পেরোতেই ওরা মাকুদের দেখতে পেল৷ আগাছার ঝোপের পাশে একটা টালির ছাউনি দেওয়া ঘর৷ তার ভেতরে বসে মাকুরা তাস খেলছে৷ ঘরের ভেতর থেকে টিভির আওয়াজ শোনা যাচ্ছে৷
‘তাড়াতাড়ি পা চালাও’ বলে রাহুল কোকোর হাত ধরে টানল৷ মাকুদের বিশ্বাস নেই৷ যখন-তখন ঝামেলা বাধাতে পারে৷
ওরা যখন বাড়ির কাছাকাছি এসে পড়েছে তখন কোকো হঠাৎই এক অদ্ভুত কাণ্ড করল৷
রাস্তার ওপরেই সদানন্দদার চায়ের দোকান৷ বেড়া আর খুঁটির মাথায় টিনের চাল৷ দোকানের সামনে দুপাশে দুটো বেঞ্চি৷ তাতে জনা-চারেক খদ্দের—খবরের কাগজ পড়ছে, চা খাচ্ছে৷
সদানন্দদার দোকানের পাশেই নীলুকাকুর লন্ড্রি৷ নীলুকাকুর চোখে হাই পাওয়ারের চশমা৷ রোগা দুর্বল চেহারা৷ গায়ে ফুলশার্ট আর পাজামা৷ ওর দোকানটার চেহারা ওর মতোই পুরোনো৷ শোকেসের কাঠ কালচে হয়ে গেছে৷ কাচের ওপরে বাদামি ছোপ পড়েছে৷ দোকানের শাটার রং চটা, জং ধরা৷
দোকান বন্ধ করার জন্য সেই শাটারটাই টেনে নামাতে চেষ্টা করছিল নীলুকাকু৷ কিন্তু পারছিল না৷ সেইজন্য চেঁচিয়ে সদানন্দদাকে ডাকছিল—যদি সে একটু হাত লাগিয়ে দেয়৷ কিন্তু সদানন্দদা চা তৈরিতে ব্যস্ত—নীলুকাকুর ডাকে সাড়া দিয়ে সে বারবার বলছিল, ‘একটু সবুর করো, কাকা—যাচ্ছি৷’
পথ চলতে-চলতে কোকো এসব দেখছিল, শুনছিল৷ হঠাৎই ও রাহুলের পাশ থেকে ছুট লাগল নীলুকাকুর লন্ড্রির দিকে৷ কর্কশ গলায় বলল, ‘সরে দাঁড়াও, কাকা৷ আমি…আমি শাটার নামিয়ে…দিচ্ছি৷’
কথাগুলো বলতে যতক্ষণ লাগল তার অনেক কম সময়ে শাটারের কাছে পৌঁছে গেল কোকো৷ বাঁ-হাতে শাটার ধরে অনায়াসে টান মারল৷ প্রতিবাদের ধাতব জিগির তুলে জং ধরা শাটার অটোমেটিক এলিভেটরের মতো নেমে এল৷ শাটারের ঘর্ঘর শব্দে চায়ের দোকানের খদ্দেররা মুখ ফিরিয়ে তাকাল৷
নীলুকাকু তখন কোকোর থুতনিতে আঙুল দিয়ে ওকে আহ্লাদ করছে৷ বলছে, ‘ও, তুই! তোকে আগে দেখতে পাইনি রে৷ পেলে তোকেই বলতাম৷ লক্ষ্মী ছেলে! তোর ভালো হোক৷’
কোকো হেসে ‘আসি’ বলল৷ তারপর ছুট্টে চলে এল রাহুলের কাছে৷
রাহুল বলল, ‘কোকো, তোমাকে নিয়ে আর পারি না! বলা নেই কওয়া নেই হঠাৎ ছুট লাগালে?’
‘নীলুকাকুর শাটারটা…খুব শক্ত৷ আগেও দু-দিন আমি…ওটা টেনে নামিয়ে দিয়েছি…৷’
রাহুল অবাক হয়ে কোকোর মুখের দিকে তাকাল৷
বেশ কিছুদিন ধরেই কোকো একা-একা রাস্তায় বেরোয়, মামের কাছ থেকে টাকা নিয়ে মুদিখানার জিনিস কিনতে যায়৷ বলতে গেলে মণিমেলার সব রাস্তাই ও এখন চিনে গেছে৷ তা ছাড়া ওকে এলাকার সবাই ভালো করে চেনে, ভালোও বাসে৷
আবার রাহুলের পাশে-পাশে হাঁটতে লাগল কোকো৷ ওদের পাশ দিয়ে প্যাঁক-প্যাঁক হর্ন বাজিয়ে একটা সাইকেল রিকশা চলে গেল৷ একটা সাইকেল ভ্যান নানারকম শাকসবজি নিয়ে রাস্তার ধারের লাইটপোস্টের নীচে দাঁড়িয়ে আছে৷ তার পাশেই একটা টাইমকল৷ তার সামনে ভিড়৷ জল নেওয়ার জন্য চার-পাঁচজন লোক কলসি, বালতি, জলের বোতল নিয়ে লাইন দিয়ে আছে৷ আকাশে মেঘের পাতলা ঝালর৷ তার আড়ালে অসম্পূর্ণ চাঁদ৷
আজ বিকেল থেকে গুমোট ভাব ছিল৷ এখন হঠাৎ যেন হাওয়ার সুড়সুড়ি টের পেল রাহুল৷ ওর মনটা খুশি-খুশি হয়ে উঠল৷ ও ভাবছিল, বাড়িতে ঢুকে বাপি আর মামকে ঠিক কীভাবে কোকোর টিউবওয়েল কমপিটিশান জেতার খবরটা জানাবে৷
