‘আমি আর লড়তে চাইনি…তাই৷’ কথাটা বলে কোকো বড়-বড় শ্বাস ফেলতে লাগল৷
‘কার সঙ্গে লড়তে চাওনি?’ রাহুলের ভেতরে কৌতূহলের ঘূর্ণিপাক শুরু হয়ে গিয়েছিল৷
‘কারও সঙ্গে না৷ আমি বলেছি…আমি আর…লড়ব না৷ কাউকে…মারব না৷ কষ্ট…দেব না৷’
রাহুল আবার ওকে জিগ্যেস করল, ‘তুমি কার সঙ্গে লড়তে চাওনি?’
কোকো কোনও জবাব দিল না৷ শুধু রাহুলের হাতটা পিঠ থেকে নামিয়ে জোরে আঁকড়ে ধরল৷ ফিসফিস করে বলল, ‘আমার মা নেই৷ বাবা নেই৷ কেউ…নেই৷’
একই কথা বারবার বলতে লাগল কোকো৷ বলতে-বলতে ও ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল৷ রাহুলের দিকে আর্ত চোখে তাকিয়ে বলল, ‘তোমাকে ছেড়ে আমি কোথাও যাব না, রাহুল৷’
রাহুল ছোট বাচ্চাটাকে দু-হাতে জড়িয়ে ধরল৷
কোকোকে নিয়ে রথের মেলায় গিয়েছিল রাহুল৷ রেললাইন পেরিয়ে আরও বেশ খানিকটা গেলে একটা বিশাল মাঠ৷ মাঠটার নাম ‘শকুন্তলার মাঠ’৷ কেন যে এরকম নাম কেউ জানে না৷ সেই মাঠে প্রতি বছরেই রথের মেলা বসে৷
মেলার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ দৈত্যের মতো নাগরদোলা৷ এ ছাড়া রয়েছে অনেক মণিহারী দোকান, খাবারের স্টল, খেলনাপাতির দোকান, পাঁপড়ভাজা আর তেলেভাজার দোকান৷ এসবের সঙ্গে এই মেলা উপলক্ষ্যেই থাকে পাখির হাট৷ নানান ধরনের রঙিন পাখির পসরা সাজিয়ে বসে দোকানিরা৷ টিয়া, চন্দনা, বদ্রিকা থেকে শুরু করে আরও কতরকম পাখি!
চারপাশে লোকজনের হইচই, হারিয়ে যাওয়া বাচ্চার কান্না, মাইকের হিন্দি গান, সবমিলিয়ে এক অদ্ভুত শব্দব্রহ্ম তৈরি হয়েছিল৷ তারই মধ্যে কোকো আর রাহুল মনের আনন্দে ঘুরে বেড়াচ্ছিল৷
বাপি আর মামের কাছে বায়না করে রাহুল কোকোকে নিয়ে মেলায় এসেছে৷ বাপিকে ও বোঝানোর চেষ্টা করেছে কোকো যত স্বাভাবিক জীবনে মিশবে তত তাড়াতাড়ি ও স্বাভাবিক হয়ে উঠবে৷ মেলায় আসার সময় বাপি রাহুলের হাতে পঞ্চাশ টাকা দিয়েছেন৷
এখন সেই পঞ্চাশ টাকা ভাঙিয়েই ওরা মেলার আনন্দ কুড়োচ্ছিল৷ নাগরদোলায় চড়া, তেলেভাজা আর পাঁপড়ভাজা খাওয়া, তার সঙ্গে কোকোর প্রিয় পেপসি—একের পর এক চলছিল৷
একটা খেলার দোকানে বল ছুড়ে ন’টা কাঠের পুতুলকে কাত করে দেওয়ার কমপিটিশান হচ্ছিল৷ তিনবারের চেষ্টায় ন’টা পুতুলকে শুইয়ে দিতে পারলেই পাওয়া যাবে পুরস্কার—মাঝারি মাপের স্টেইনলেস স্টিলের একটা বাটি৷
রাহুল পাঁচ টাকা দিয়ে কমপিটিশানে নাম দিল৷ তিনবার বল ছুড়ে ও সাতটা পুতুলকে কাত করে দিল বটে কিন্তু পুরস্কার জিততে পারল না৷
রাহুল বল ছোড়ায় নাম দেওয়ার জন্য কোকোকে বলল৷ কিন্তু কোকো বারবার মাথা নেড়ে জানাল যে, ওর হাতে একদম টিপ নেই৷
এরপর ওরা এয়ারগান শুটিং-এর স্টলে গেল৷ দেওয়ালে লাগানো নানা রঙের বেলুন৷ তারই একপাশে বেলুন লাগানো চক্র ঘুরছে, সুতোয় বাঁধা প্লাস্টিকের বাঘ-সিংহ, এমনকি জ্বলন্ত মোমবাতি আর পেরেকও ঝুলছে৷
রাহুল পাঁচবার ফায়ার করে দুটো বেলুন ফাটাতে পারল৷ কিন্তু কোকো এবারেও রাজি হল না৷ মাথা নেড়ে বলল, ‘আমার…হাতে টিপ নেই৷’
মেলায় ঘুরতে-ঘুরতে কখন যেন সন্ধে নেমে এসেছে৷ চারপাশের খুঁটিতে লাগানো হ্যালোজেন আলো জ্বলে উঠেছে৷ স্টলে জ্বলে উঠেছে বালব আর টিউবলাইট৷ লোকের ভিড় আরও বাড়ছে৷ মাইকে মেলার কর্তৃপক্ষ কীসব যেন ঘোষণা করছে৷
একটা স্টলের সামনে বহু মানুষের ভিড় দেখে রাহুল দাঁড়িয়ে পড়ল৷ কোকোকেও হাত ধরে টেনে থামাল৷
ভিড় ঠেলে রাহুল আর কোকো কয়েকটা স্তর এগিয়ে গেল৷ দেখল, স্টলে একটা বিচিত্র কমপিটিশানের ব্যবস্থা করা হয়েছে৷
স্টলের ঠিক মধ্যিখানে একটা পুরোনো টিউবওয়েল পোঁতা আছে৷ টিউবওয়েলের কলের মুখে একটা নীল রঙের প্লাস্টিকের বালতি বসানো৷ আর টিউবওয়েলের গায়ে, হাতলে, ফুলের মালা জড়ানো৷ স্টলের কাপড়ের দেওয়ালে বেশ কয়েকটা পোস্টার আঁটা৷ পোস্টারে যা লেখা আছে তার সারমর্ম হল : এই টিউবওয়েলটা পাম্প করে সহজে জল তোলা যায় না; যদি কেউ দশবার পাম্প করে তার মধ্যে এই কল থেকে জল বের করতে পারে তা হলে পুরস্কার একশো টাকা৷
প্রতিযোগিতায় নাম দেওয়ার এন্ট্রি ফি দশ টাকা৷
স্টলের মালিক চিৎকার করে চ্যালেঞ্জারকে আহ্বান জানাচ্ছিল : ‘আসুন, দেখিয়ে দিন আপনার গায়ে কত জোর! এই বেয়াদব টিপকলটাকে শায়েস্তা করুন—!’
রাহুল দেখল, গাঁট্টাগোঁট্টা চেহারার অনেকেই বেশ আশা নিয়ে চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করতে নামছে, কিন্তু হার মেনে ফিরে আসছে৷ কলের মুখ দিয়ে এক ফোঁটাও জল বেরোচ্ছে না৷
ভিড়ের মধ্যে থেকে কে একজন বলল, ‘তোমার এই টিপকল থেকে জল আদৌ বেরোয় তো?’
অমনি স্টলের মালিক তার পাশে দাঁড়ানো লোকজনের মধ্যে কাকে যেন ইশারা করল৷ স্যান্ডো গেঞ্জি পরা স্বাস্থ্যবান একটি ছেলে কলের সামনে এগিয়ে গেল৷ মালিকের নির্দেশে জোরালো হ্যাঁচকা দিয়ে টিউবওয়েলটা পাম্প করতে লাগল৷ আর মালিক চিৎকার করে এক থেকে দশ গুনতে লাগল৷ তার সঙ্গে-সঙ্গে পাবলিকও হইহই করে গলা মেলাল৷
আটবারের বার কলের মুখ থেকে সরু সুতোর মতো জল বেরোল৷ তারপরের দুবারে জলের ধারাটা লাঠির মতো মোটা হল৷
তারপর ছেলেটা থামল৷ জনতা চিৎকারে ফেটে পড়ল৷
রাহুল কোকোকে ঠেলা মারল : ‘কোকো নাও—এবার নাম দাও…৷’
কোকো কিন্তু মাথা নাড়ল৷ বলল, ‘না, রাহুল—না৷’
