রাহুল ওর আঁকা ছবিটা দেখছিল৷ কোকোর আঁকা দেখে বোঝা অসম্ভব যে, ওর মা ভালো ছবি আঁকত৷
রাহুল বলল, ‘কোকো, লাল রংটায় আর-একটু জল মেশাও—হালকা করে নাও৷ মাস্টারজি কোথায় থাকে?’
‘অনেক দূরে৷ এখন…কাছে…এসে গেছে৷ এইখানটায় সবুজ রং দিই?’
রাহুল ঘাড় নেড়ে ‘হ্যাঁ’ বলল৷ ওর মনে পড়ল, শুরু থেকে কোকো সবসময় বলে এসেছে মাস্টারজি দূরে থাকে৷ কিন্তু ইদানীং ও বলছে, মাস্টারজি কাছে এসে গেছে৷ সেই কাছে এসে যাওয়াটা কি কোকোর গলার কন্ট্রোল ব্যান্ডে ধরা পড়েছে?
‘না, না—নীল রং দিয়ো না৷ তুমি তো জানো গাছের পাতা সবুজ হয়৷’
কোকো ছবি থেকে মুখ তুলে তাকাল রাহুলের দিকে৷ হেসে বলল, ‘তুমি ঠিক বলেছ৷ গাছের…পাতা…সবুজ হয়৷ সবুজ…৷’
‘মাস্টারজির কাছে আর কে-কে আছে, কোকো?’
‘আকাশ তো নীল৷ তাই…না, রাহুল?’
‘হ্যাঁ, নীল৷ আর কে-কে আছে মাস্টারজির কাছে?’ রাহুল আবার জানতে চাইল৷
‘আকাশ নীল৷ আকাশ…নীল৷ রাহুল বলেছে৷’ আপনমনেই খুশি হয়ে মাথা নাড়ল৷ তারপর বিড়বিড় করে বলল, ‘সুলতানদা আছে৷ রামুদা…আছে৷ ময়না…আছে৷’
অবাক হল রাহুল৷ সুলতানদা, রামুদা, ময়না—এরা কারা?
বারবার প্রশ্ন করেও কোকোর কাছ থেকে আর কোনও সূত্র পাওয়া গেল না৷
‘এটা তো গাছের গুঁড়ি৷ এটা ব্রাউন রং দাও৷ বাদামি৷’
কোকো গাছের গুঁড়িতে সবুজ রং দিতে যাচ্ছিল৷ রাহুলের কথায় ও নতুন উৎসাহে বাদামি রং গুলতে শুরু করল৷
‘এই গাছের গুঁড়িটাও বাদামি রং হবে৷’ ছবির দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল রাহুল, ‘আচ্ছা কোকো, মাস্টারজি তো বলছ কাছে এসে গেছে৷ যদি তোমার একেবারে সামনে এসে পড়ে তা হলে কী হবে?’
ছবি আঁকা থামিয়ে দিল কোকো৷ চোখ বড়-বড় করে তাকাল রাহুলের দিকে : ‘আমার…তখন…খুব ভয় করবে৷’ বাঁ-হাতটা সামনে বাড়িয়ে দিল ও৷ রাহুলের দুটো আঙুল চেপে ধরে আস্তে-আস্তে বলল, ‘কিন্তু…রাহুলকে ছেড়ে…আমি যাব না৷ মাস্টারজি ভয় দেখালেও… না৷ যাব না৷’
রাহুল কোকোর মুঠোর মধ্যে অদ্ভুত এক উষ্ণতা খুঁজে পেল৷ ও আঙুল দুটো ছাড়িয়ে নিল না৷ কোকোর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল৷
কিছুক্ষণ পর রাহুলের হাত ছেড়ে দিল ও৷ আবার ছবি আঁকায় মন দিল৷
গত একসপ্তাহে চারবার কোকোর কন্ট্রোল ব্যান্ডের লাল-সবুজ এল. ই. ডি. বাতি জ্বলে উঠেছে৷ আর একইসঙ্গে কোন এক রহস্যময় যন্ত্রণায় কোকো ছটফটিয়ে উঠেছে৷ রাহুল ব্যাপারটা ঠিক বুঝে উঠতে পারছিল না৷ কেনই বা আলো জ্বলছে, আর কেনই বা কোকো ছটফট করে উঠছে? মাস্টারজির সঙ্গে এই ঘটনার সম্পর্কই বা কী?
কোকো যে ধীরে-ধীরে অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে সেটা রাহুল বেশ বুঝতে পারছিল৷ ঘিয়া নদীর পাড়ে কোকোকে প্রথম যখন রাহুল দেখেছিল তখন ওকে দিগভ্রান্ত, জড়বুদ্ধি, মানসিক রোগী বলে মনে হয়েছিল৷ এখন ও কত পালটে গেছে! সবসময় হাসিখুশি৷ হাসিমুখে কত না পরিশ্রমের কাজ করে ও! ওর গায়ের জোর গ্রামে একরকম কিংবদন্তী হয়ে দাঁড়িয়েছে৷ গ্রামের সবাই কোকোকে ভালোবাসে৷ ঝন্টুদা দেখা হলেই কোকোকে আইসক্রিম কিংবা পেপসি খাওয়ায়৷ ঝন্টুদা লাইব্রেরির কোনও কাজের কথা বললেই কোকো একপায়ে খাড়া৷ তবে ওকে বুদ্ধির কাজ কেউ দেয় না—দেয় শক্তির কাজ৷
কোকো সবসময় রাহুলের পিছন-পিছন ঘোরে৷ রাহুলকে চোখের আড়াল হতে দেয় না৷ রাহুল কখনও বারণ করলেও ও শোনে না৷ রাহুলকে মাকু আর নেনের কথা বলে৷ বলে, ‘আমি সঙ্গে থাকলে… তোমাকে কেউ কিছু করবে না৷ আমার গায়ে…জোর আছে৷’
ওর কথায় রাহুল হাসে৷
এর মধ্যে বেশ কয়েকদিন নেনে আর মাকুর সঙ্গে ওদের দেখা হয়েছে৷ কিন্তু মাকুরা গায়ে পড়ে কোনও কথা বলেনি৷ চুপচাপ এড়িয়ে গেছে৷
কোকোকে সঙ্গে নিয়ে ঘুরতে-ঘুরতে রাহুল একদিন চলে এসেছিল ঘিয়া নদীর পাড়ে৷
বর্ষা কবেই এসে গেছে৷ সেই বর্ষার জলে নদী ফুলে উঠেছে৷ দুপাশের গাছপালার দল সবুজে-সবুজে মাতোয়ারা৷
রাহুল কোকোকে নিয়ে নদীর পাড় ধরে হাঁটতে শুরু করল৷ নদীর ঘোলাটে জল ওদের পাশে-পাশে ছুটছে৷
রাহুল বলল, ‘কোকো, মনে পড়ে, এই নদীতে তুমি ভেসে এসেছিলে? ওই গাছটার নীচে—’ আঙুল তুলে গাছটা দেখাল রাহুল : ‘—তুমি পড়ে ছিলে৷’
কোকো নদী বরাবর তাকাল৷ অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল৷ তারপর আস্তে-আস্তে বলল, ‘মনে…আছে৷ আমি…সাঁতার…জানি…৷’
‘আমিও সাঁতার জানি৷’ বলল রাহুল, ‘তুমি কি মাস্টারজির কাছ থেকে পালিয়ে এসেছিলে?’
রাহুলের দিকে তাকাল কোকো৷ মাথা নেড়ে বলল, হ্যাঁ৷
‘কেন, পালিয়ে এসেছ কেন?’
কোকো চুপ করে রইল৷ ওর শূন্য চোখ নদীর জলের দিকে তাকিয়ে রইল৷ কিন্তু রাহুল বুঝতে পারল ও নদীর জল দেখছে না—অন্য কিছু ভাবছে৷
আকাশ মেঘলা৷ বৃষ্টি নেই৷ কিন্তু শেষ বৃষ্টির জল এখনও মাটি ভিজিয়ে রেখেছে৷ গাছের পাতার আড়ালে লুকিয়ে কোথায় যেন বুলবুলি আর দোয়েল ডাকছে৷ নদীর সঙ্গে বয়ে আসা এক অদ্ভুত হাওয়া রাহুলের মনখারাপ করে দিচ্ছিল৷
কোকো হঠাৎ নদীর পাড়ে বসে পড়ল৷ নদীর জলের দিকে তাকিয়ে চুপ করে রইল৷
রাহুলও বসে পড়ল ওর পাশে৷ ওর পিঠে হাত রাখল : ‘কোকো, তুমি পালিয়ে এসেছিলে কেন?’
কোকো আলতো ফিসফিসে গলায় বলল, ‘মাস্টারজি…আমাকে…মারত৷ সিগারেটের…ছ্যাঁকা দিত৷ তাই নদীতে…ঝাঁপ দিয়ে…পালিয়ে এসেছি৷’
‘তোমাকে মারত কেন মাস্টারজি?’
