মাকু আর নেনে চলে গেল৷ ওদের ছুটন্ত বাইকের পিছনে ধুলোর মেঘ তৈরি হল৷
ঝন্টুদা, নিধু, গোপাল নিজেদের মধ্যে ব্যাপারটা নিয়ে আলোচনা করতে লাগল৷ আর রাহুল কোকোর হাত ধরা অবস্থায় ভাবছিল ওর অদ্ভুত আচরণের কথা৷ এই বলছে, ‘আমি আর লড়ব না৷ কাউকে মারব না৷ কষ্ট দেব…না৷ মারব…না৷’ আবার পরক্ষণেই রাহুলকে ‘রক্ষা’ করতে সে পেশাদার যোদ্ধার তৎপরতায় শত্রুকে ঘায়েল করছে!
কোকোর লড়াই দেখে রাহুলের মনে হচ্ছিল শুধু সিনেমায় এরকম লড়াই দেখা যায়৷ তা ছাড়া বহুদিন প্র্যাকটিস না করলে কারও পক্ষে এরকম দক্ষতায় পৌঁছনো সম্ভব নয়৷
বাড়ি ফেরার পথে রাহুল কোকোকে জিগ্যেস করল, ‘কোকো, এরকম ফাইটিং তুমি কোথায় শিখলে?’
‘শিখেছি ভগবতীপ্রসাদের কাছে৷’
‘কে ভগবতীপ্রসাদ?’
‘আমার ট্রেনার৷ আট বছর…আমি ট্রেনিং নিয়েছি৷ তারপর…৷’ হঠাৎ চুপ করে গেল কোকো৷ ওকে দেখে রাহুলের মনে হল, ও কী যেন ভাবছে৷ বোধহয় কোনও কিছু মনে করার চেষ্টা করছে৷
‘আট বছর ট্রেনিং নেওয়ার পর কী করেছ? তারপর কী?’
কোকো রাহুলের দিকে তাকাল৷ কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থাকার পর বলল, ‘তারপর অনেক ফাইট করেছি৷ অনেক লড়াই…করেছি৷ অনেক জিতেছি৷ অনেক ফাইট করেছি…৷’
রাহুল অবাক হয়ে কোকোর দিকে তাকিয়ে রইল৷
৷৷ছয়৷৷
কয়েকদিন পর এক অদ্ভুত ঘটনায় মাঝরাতে রাহুলের ঘুম ভেঙে গেল৷
ও অদ্ভুত সব শব্দ শুনতে পাচ্ছিল৷ যন্ত্রণার শব্দ—তার সঙ্গে কথা৷
‘ওঃ! ওঃ! মাস্টারজি! ছেড়ে দাও! আমি…আর…করব না৷ আমাকে…ছেড়ে দাও৷ ওঃ…৷’
দু-হাতে চোখ ডলে অন্ধকার মেঝের দিকে তাকাল রাহুল৷ চাপা কর্কশ গলায় টুকরো কথাগুলো কে বলছে ও ভালোই বুঝতে পারল৷ কিন্তু ও অন্ধকারে কোকোর শরীরটা ভালো করে ঠাহর করতে পারছিল না৷
লাল আর সবুজ রঙের আলোর ঝিলিক চোখে পড়ল রাহুলের৷ ছোট-ছোট রঙিন আলোর বিন্দু জোনাকির মতো জ্বলছে-নিভছে৷
রাহুলের ঘুম ছুটে গেল৷ ভালো করে চোখ রগড়ে বিছানায় উঠে বসল ও৷ চাপা গলায় ডাকল, ‘কোকো! কোকো! কী হয়েছে?’
কোকোর কাছ থেকে কোনও উত্তর এল না৷ ওর যন্ত্রণার আর্তনাদ আর টুকরো কথা চলতেই লাগল৷
রাহুল এবার বিছানা থেকে নেমে পড়ল৷ বহুদিনের অভ্যাসে ওর ডানহাত সহজেই পৌঁছে গেল আলোর সুইচের কাছে৷ আলো জ্বালতেই কোকোকে দেখতে পেল ও৷
কোকোর দু-চোখ বোজা৷ শরীরটা মেঝের বিছানা থেকে গড়িয়ে চলে এসেছে বাইরে৷ গলার কন্ট্রোল ব্যান্ডটা দু-হাতে আঁকড়ে ধরে ও ছটফট করছে, গড়াগড়ি খাচ্ছে৷ কন্ট্রোল ব্যান্ডের গায়ে লাল আর সবুজ আলো দপদপ করে জ্বলছে৷ ইলেকট্রনিক খেলনায় যেমন ছোট-ছোট রঙিন বাতি থাকে সেইরকম৷
রাহুল ছুটে গেল কোকোর কাছে৷ ঝুঁকে পড়ে ওকে জোরে ধাক্কা দিল : ‘কোকো! কোকো!’
কয়েকবার ধাক্কা দিতেই কোকো চোখ খুলল৷ ওর ছটফটানি থেমে গেল৷ রাহুল দেখল, ও কুলকুল করে ঘামছে৷
কোকো উঠে বসল৷ বড়-বড় শ্বাস ফেলছে৷ চোখে-মুখে ভয়৷ কন্ট্রোল ব্যান্ডটা এখনও দু-হাতে আঁকড়ে ধরে আছে৷ ওটার লাল-সবুজ বাতি এখন নিভে গেছে৷
রাহুল বসে পড়ল ওর পাশে৷
‘কী হয়েছে, কোকো? কী হয়েছে?’ ওর ঘামে ভেজা গালে হাত বোলাতে-বোলাতে রাহুল বলল, ‘কোনও বাজে স্বপ্ন দেখেছ?’
কোকো ভয়ার্ত চোখে রাহুলের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘মাস্টারজি… আসছে৷ কাছে…এসে গেছে৷’
‘তোমার গলার ওই ব্যান্ডটাতে আলো জ্বলছিল৷ লাল…সবুজ…৷’
কোকো ব্যান্ডটা ছেড়ে দিল৷ হাত দিয়ে মুখ মুছল৷ চাপা গলায় বলল, ‘মাস্টারজি…কাছে এসে গেলে ওরকম…আলো জ্বলে৷ আর…মাথায় খুব যন্ত্রণা হয়…৷’
কোকোর অসহায় মুখের দিকে তাকিয়ে রইল রাহুল৷ এই শিশু-যুবকের আতঙ্ক আর কষ্ট দেখে ওর মায়া হচ্ছিল৷ ‘মাস্টারজি…আসছে৷ কাছে…এসে গেছে৷’ এর মানে কী? মাস্টারজি কাছে এসে গেলে ওই লাল-সবুজ আলোগুলো জ্বলে, কোকোর মাথায় যন্ত্রণা হয়?
ভেবে-ভেবে কোনও থই পাচ্ছিল না রাহুল৷ ও উঠে গিয়ে জলের বোতল নিয়ে এল৷ ছিপি খুলে বোতলটা এগিয়ে দিল কোকোর হাতে : ‘নাও—জল খাও৷’
ঢকঢক করে অনেকটা জল খেল কোকো৷ তখনও ও অল্প-অল্প হাঁপাচ্ছে৷ বোধহয় মাস্টারজির আতঙ্কের রেশ এখনও কাটেনি৷
বেশ কিছুক্ষণ পর কোকো শান্ত-স্বাভাবিক হল৷ তখন রাহুল আলো নিভিয়ে আবার শুয়ে পড়ল৷
কোকো আপনমনে ছবি আঁকছিল৷ রাহুল ওর পাশে বসে ছবি আঁকা দেখছিল৷
যে-ছবিটা কোকো আঁকতে চেষ্টা করছিল সেটা রাহুলদের স্কুল৷ যদিও ছবিটা দেখে সেটা বোঝা খুব শক্ত৷ তবে রাহুল যে স্কুলটাকে একটু-একটু চিনতে পারছিল তার কারণ, ওদের স্কুল বিল্ডিং-এর পাশে চারটে বড়-বড় গাছ আছে৷ আর তার পাশ ঘেঁষেই একটা বিজ্ঞাপনের হোর্ডিং৷ কোকোর ছবিতে—বিমূর্ত এবং বিকৃত চেহারায় হলেও—সেগুলো আঁকা আছে৷ যদি তারপরেও কারও বুঝতে অসুবিধে হয় সেইজন্য ছবির মাথায় আঁকাবাঁকা হরফে লেখা আছে : ‘রাহুলের ইশকুল৷’
রাহুলের আজ স্কুল ছুটি৷ স্কুলের ফাউন্ডেশান ডে৷ তাই দুপুরের খাওয়া-দাওয়ার পর ও কোকোর সঙ্গে গল্প করতে বসেছে৷ ওর ইচ্ছে, কোকোর মাস্টারজি সম্পর্কে আরও কিছু খবর জেনে নেয়৷
কিছুক্ষণ এটা-সেটা নিয়ে কথা বলার পর কোকো ছবি আঁকার বায়না ধরল৷ তখন রাহুল ওকে জল রং আর কাগজ দিয়ে ছবি আঁকতে বসিয়েছে৷ আর ছবি আঁকা নিয়ে টুকটাক কথা বলার ফাঁকে মাস্টারজি সম্পর্কে দু-চারটে প্রশ্ন করেছে৷ কোকো ওর খেয়াল মতো কখনও প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে, কখনও দিচ্ছে না৷ ও মেঝেতে ‘বাবু’ হয়ে বসে ঘাড় গুঁজে একমনে কাগজের ওপরে রং বুলিয়ে চলেছে৷
