ছুরিটা দেখামাত্রই কোকো কেমন যেন হয়ে গেল৷ কাতর চোখে নেনের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তোমার…সঙ্গে…আমি মারপিট করব না…৷’
‘কেন রে, তোতলা কাত্তিক? লড়বি না কেন?’
এপাশ-ওপাশ মাথা নাড়ল কোকো : ‘আমি…আর কাউকে…মারব না৷ কাউকে…কষ্ট দেব না৷ আমি…আর মারপিট…করব না৷ কাউকে… কষ্ট…দেব না৷’
এ-কথায় মাকু আর নেনে হো-হো করে হেসে উঠল৷
রাহুল বিপন্ন মরিয়া চোখে চারপাশে তাকাচ্ছিল৷ যদি কারও কাছ থেকে সাহায্য পাওয়া যায়৷ কিন্তু এই দুপুরে পথে তেমন লোকজন নেই৷ আর যে-দু-একজন পথচারী চোখে পড়ছে তারা মাকুর মার্কামারা মোটরবাইক দেখেই সটকে পড়ছে৷ সেইসঙ্গে রাহুল এটাও লক্ষ করল যে, পানের দোকানের দোকানদার তার বসার জায়গা ছেড়ে মেঝেতে নেমে পড়েছে৷ ধীরে-ধীরে পা বাড়াচ্ছে দোকানের খিড়কি-দরজার দিকে৷ এই জায়গাটাকে সে আর নিরাপদ মনে করছে না৷
নেনে কোকোর দিকে আরও এক-পা এগিয়ে যেতেই কোকো দু-পা পিছিয়ে গিয়ে চিৎকার করে উঠল : ‘আমি আর কাউকে…মারব না৷ কাউকে কষ্ট দেব না৷ মাস্টারজিকে আমি বলেছি৷ মারপিট করতে আমার ভালো লাগে না৷ আমি…বাড়ি…যাব৷’
অন্য সবার কাছে কোকোর কথাগুলো পাগলের প্রলাপ মনে হচ্ছিল৷ কিন্তু রাহুল যেন কিছু-কিছু বুঝতে পারছিল৷
কোকো পিছোতে-পিছোতে একটা গাছে গিয়ে ধাক্কা খেল৷ তারপর চকিতে ঘুরে দাঁড়িয়ে গাছের গুঁড়ি বেয়ে উঠতে লাগল৷
মাকু আর নেনে এই পাগলামি দেখে আবার হেসে উঠল৷ আর রাহুলরা কোকোর কাণ্ড দেখে হতবাক হয়ে গেল৷
যে-ছেলেটার গায়ে এত শক্তি সে কি না এরকম ভয় পেয়ে গেছে!
রাহুল আন্দাজ করল, কোকোর ভয়টা আসলে নেনের হাতের ছুরিটার জন্য৷ এটা মোটেই অস্বাভাবিক নয়৷
কোকো তখন গাছের একটা ডালে বসে আপনমনে বলে চলেছে, ‘আমি আর লড়ব না৷ কাউকে মারব না৷ কষ্ট দেব…না৷ মারব…না৷’
নেনে হাতের ছুরিটা শূন্যে নাচিয়ে কোকোকে দু-চারবার নকল ভয় দেখাল৷ যেন এই ও কোকোর গায়ে ছুরি বসাল বলে৷ কোকো সেই ভয় দেখানোর তালে-তালে সিঁটিয়ে কুঁকড়ে যাচ্ছিল৷ সেটা দেখে নেনে আর ওর দাদা বেশ মজা পাচ্ছিল৷
রাহুল কোকোর হেনস্থা আর সহ্য করতে না পেরে বলে উঠল, ‘ওকে শুধু-শুধু ভয় দেখাচ্ছ কেন? ছেড়ে দাও—৷’
সঙ্গে-সঙ্গে নেনের হাসিটা বদলে গেল হিংস্র কুটিল মান-চিত্রে৷ ও চট করে চলে এল রাহুলের কাছে৷ ছুরির ডগাটা ছুঁইয়ে দিল ওর গলায়৷ নোংরা গালাগাল দিয়ে বলল, ‘একদম চুপ৷ নইলে…৷’
নইলে কী হবে সেটা আর নেনের বলা হল না৷
কারণ, চোখের পলকে গাছ থেকে লাফিয়ে মাটিতে নেমে পড়েছে কোকো৷ একটা ডিগবাজি খেয়ে শরীরটা গড়িয়ে নিয়ে এসেছে নেনের কাছে৷ দু-হাতে ওর দুটো পা ধরে প্রচণ্ড এক হ্যাঁচকা টান মেরেছে৷
নেনে উপুড় হয়ে উলটে পড়ল মাটিতে৷ কোকো একলাফে চড়ে বসল ওর শরীরের ওপরে৷ ছুরি-ধরা হাতটাকে মোচড় দিয়ে চেপে ধরল পিঠের দিকে৷ তারপর জোরে একটা ঝটকা দিল৷ ছুরি খসে পড়ল নেনের মুঠো থেকে৷ ও যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠল৷
কোকো চিৎকার করে বলল, ‘রাহুলকে…মারবে না৷ যে মারবে তাকে আমি…মেরে ফেলব৷’
কথা শেষ করেই নেনের চুলের মুঠি খামচে ধরল ও৷ মাথাটা টেনে শূন্যে তুলল৷ তারপর ভয়ংকর জোরে ঠুকে দিল মাটিতে৷
নেনে গোঁ-গোঁ করতে লাগল৷ মাকু বাইকে বসে হতবুদ্ধি হয়ে ভাইয়ের করুণ অবস্থা দেখতে লাগল৷
‘রাহুলকে মারবে না৷ রাহুলকে…’ নেনের দিকে আগুন-ঝরা চোখে তাকিয়ে ছিল কোকো৷ নেনের চুলের মুঠিটা ওর হাতে ধরা ছিল৷ সেই অবস্থাতেই বিড়বিড় করে কথাগুলো বলছিল৷
রাহুল ছুটে গিয়ে কোকোর হাত চেপে ধরল : ‘কোকো! কোকো! কী করছ! ছাড়ো—ও যে মরে যাবে!’
রাহুলের দেখাদেখি ঝন্টুদা, নিধু, গোপাল ওরাও কোকোর কাছে ছুটে এসেছিল৷ কোকোকে থামাতে চেষ্টা করছিল, ওকে হাত ধরে টেনে সরানোর চেষ্টা করছিল৷
অনেক কষ্টে কোকোকে শান্ত করা গেল৷ নেনেকে ছেড়ে উঠে দাঁড়াল ও৷ তারপর রাহুলের একটা হাত চেপে ধরল৷ ভাবটা এমন যেন এই হাতটা ও আর ছাড়বে না৷
রাহুল ওকে নিয়ে একপাশে সরে দাঁড়াল৷
কোকো হাঁপাচ্ছিল৷ নেনের দিকে তাকিয়ে ছিল৷ ঝন্টুদারা তখন নেনেকে ধরে তুলে দাঁড় করাচ্ছে৷
নেনে বড়-বড় শ্বাস নিচ্ছিল৷ ওর কপালে রক্ত৷ কোকোর দিকে ও এমনভাবে চেয়ে আছে যেন অন্য গ্রহের প্রাণী দেখছে৷
ঝন্টুদা পকেট থেকে রুমাল বের করে নেনের কপালের রক্ত মুছে দিল৷ বলল, ‘ফেরার পথে একটু ডাক্তার দেখিয়ে নিয়ো—৷’
নেনে কোনও জবাব দিল না৷
ঝন্টুদারা নেনের জামাকাপড় হাত দিয়ে ঝেড়েঝুড়ে ওকে মাকুর বাইকের দিকে হাঁটিয়ে নিয়ে গেল৷
মাকু বাইক থেকে নামেনি৷ আগের দিনের মতো ও আর তর্জন-গর্জন করছিল না৷ নেনেও একেবারে চুপ৷ ভালো করে কারও দিকে তাকাচ্ছে না পর্যন্ত৷
ঝন্টুদা মাকুকে বলল, ‘মাকু, যা হওয়ার তা হয়ে গেছে৷ কোকো তো অত বোঝে না৷ আসলে রাহুলকে ও প্রাণ দিয়ে ভালোবাসে৷ রাহুলকে কেউ কিছু করলে ও কেমন পাগলের মতো হয়ে যায়৷ যাকগে, তুমি ব্যাপারটা ভুলে যাও৷ আর একটা কথা : এটা নিয়ে থানা-পুলিশ কোরো না৷ আমরাও ব্যাপারটা আর মনে রাখব না৷’
মাকু ছোট্ট করে ঘাড় নাড়ল৷
ঝন্টুদা আর নিধু নেনেকে ধরে বাইকে বসাল৷ ঝন্টুদা মাকুর পিঠে হাত দিয়ে বলল, ‘তোমরা তো ক্লাব-ঘর করবে৷ আমি দেখছি—সুটেবল কোনও ঘর পাওয়া যায় কি না৷ আর শোনো…’ মাকু তাকাল ঝন্টুদার দিকে৷ ঝন্টুদা বলল, ‘আমরা তোমার শত্রু নই৷ প্লিজ, আজকের ব্যাপারটা ভুলে যেয়ো৷’
