রাহুলের কোল্ড ড্রিঙ্ক খাওয়া শেষ হলে কোকো বলল, ‘রাহুল… পেপসি…খেতে খুব ভালো৷ মিষ্টি৷ ভালো৷’
ঝন্টুদা ওকে জিগ্যেস করল, ‘তুমি আর-একটা খাবে?’
কোকো মাথা হেলিয়ে বলল, ‘হ্যাঁ…খাব৷’
আর-একটা পেপসির বোতল নিয়ে কোকোর হাতে দিল রাহুল৷ কোকো পরম উৎসাহে স্ট্র মুখে চেপে ধরে পেপসি খাওয়ায় মন দিল৷ আর রাহুলরা লাইব্রেরির নানান পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করতে লাগল৷
এমন সময় মাকুর বাইক দেখা গেল৷ ভটভট আওয়াজ তুলে ধুলো উড়িয়ে আসছে৷
রাহুলদের কাছে এসে বাইকটা থামাল মাকু৷ ওর পিছনে বসে আছে নেনে৷ মাকুর গায়ে টি-শার্ট আর জিনসের প্যান্ট৷ আর নেনে একটা হলুদ শার্ট আর কালচে প্যান্ট পরে আছে৷
মাকু বাইকের স্টার্ট বন্ধ করেনি৷ বরং মাঝে-মাঝে হাতল ঘুরিয়ে ইঞ্জিন রেস করছে৷
নেনের আঙুলে সিগারেট ধরা ছিল৷ ঝন্টুদাকে দেখে ও উদ্ধত রুক্ষ ভঙ্গিতে সিগারেটে টান দিতে লাগল৷ ঝন্টুদা অস্বস্তিতে মুখটা ঘুরিয়ে নিল৷
নেনে বাইক থেকে নেমে পড়ল৷ চোখ সরু করে সিগারেটে টান মারতে-মারতে এগিয়ে এল রাহুলদের দিকে—অথবা পানের দোকানের দিকে৷
রাহুল চট করে তাকাল কোকোর দিকে৷ ওর বুক কেঁপে উঠল৷ যদি আগের দিনের মতো কিছু একটা হয়! রাহুলের ভয় হচ্ছিল, এই বুঝি নেনে ওর বুকের ভেতরে হওয়া ধড়াস-ধড়াস শব্দ শুনতে পাবে৷
ঝন্টুদা, নিধু, গোপাল পানের দোকানের সামনে থেকে পায়ে-পায়ে সরে যেতে লাগল৷ রাহুলও সেই চেষ্টাই করল৷ নেনের নজর এড়িয়ে কোকোর জামা ধরে চোরা টান মারল৷ কিন্তু কোকো সেটা টের পেলে তো! ও তখন পেপসি খেতে মশগুল৷ স্ট্র-এর টানে বোতলের তরলে চড়বড়-চড়বড় শব্দ হচ্ছে৷
নেনে ঝন্টুদার সামনে এসে দাঁড়াল৷ ওর বাঁ-হাতে সিগারেট, ডানহাতটা পকেটে গোঁজা৷
ঝন্টুদার মুখে পরপর দুবার ধোঁয়া ছুড়ে দিল নেনে৷ ঝন্টুদা মুখে কিছু বলল না—শুধু নাক টিপে এক ঝটকায় মুখটা পাশে ফেরাল৷
‘কী, সেক্রেটারিবাবু! শুনলাম, ডাক্তার হালদারের একতলার ঘরটা তোমরা লপকে নিয়েছ—লাইব্রেরি না কীসব করবে৷’
মুখটা ঘুরিয়ে রেখেই চাপা গলায় ঝন্টুদা জবাব দিল, ‘আমাদের গ্রামে একটা লাইব্রেরি হওয়া খুব দরকার৷ অনেকদিন ধরে সবাই বলছে…তাই ডক্টর হালদারের কাছে আমরা রিকোয়েস্ট করেছিলাম৷ লাইব্রেরিটার নাম হবে ‘‘মণিমেলা সাধারণ পাঠাগার’’৷ ডক্টর হালদার বলেছেন…৷’
‘ওসব ঢপের কেত্তন ছাড়ো!’ নেনে খিঁচিয়ে উঠল, ‘পাঠাগার হবে না কাঁচকলা হবে৷ ও-ঘরটা আমরা টার্গেট করেছিলাম…ক্লাবঘর করব৷ তো বুড়োটাকে তোমরা টুপি দিয়ে ঘরটা হড়কে নিলে?’
নিধু ভয় পেলেও মিনমিন করে পাশ থেকে বলল, ‘সত্যি বলছি—লাইব্রেরি হবে৷ এই তো—’ গাছতলায় রাখা বইভরতি থলে দুটো দেখাল : ‘আমরা সবার কাছ থেকে চেয়ে-চেয়ে গল্পের বই জোগাড় করছি…৷’
নেনে সিগারেট ফেলে দিয়ে বাঁ-হাতে খপ করে নিধুর কলার চেপে ধরল : ‘তুই কি সালা ঝন্টুর উকিল না কি?’
মাকু বাইকে গরগর আওয়াজ তুলে এগিয়ে এল নেনের কাছে৷ বাইক থামাল৷
নেনের কথায় রাহুলের গা জ্বালা করছিল৷ কিন্তু মাকুদের সঙ্গে ওদের লড়ার ক্ষমতা কতটুকু! তা ছাড়া মাম আর বাপি বলেছেন, এসব ঝামেলা এড়িয়ে থাকতে৷
রাহুল মারপিটকে ভয় পায়৷ তাই ভয়ে সিঁটিয়ে গেল৷ নেনেরা বোধহয় এক্ষুনি গায়ে পড়ে একটা গন্ডগোল তৈরি করবে৷
ও কোকোর দিকে তাকাল৷ নির্বিকারভাবে পেপসি খেয়ে চলেছে৷
নিধুকে কলার ধরে ঝাঁকুনি দিচ্ছিল নেনে৷ আর মাকু দাঁত বের করে হাসছিল৷
রাহুল ভয় পেলেও প্রতিবাদ না করে থাকতে পারল না৷
‘নিধুকে ছেড়ে দাও!’ ও চেঁচিয়ে বলল৷
সঙ্গে-সঙ্গে নিধুকে ছেড়ে দিল নেনে৷ এবং রাহুলের দিকে ঘুরল৷ কিন্তু রাহুলের দিকে এক পা এগিয়েই থেমে গেল ও৷ ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল কোকোর দিকে৷ ও তখন পেপসি খাওয়া শেষ করে খালি বোতলটা দোকানির হাতে ফিরিয়ে দিচ্ছে৷
‘এই তোতলা কাত্তিক!’ বাজেভাবে হাত নেড়ে কোকোকে কাছে ডাকল নেনে৷ তারপর রাহুলকে লক্ষ করে বলল, ‘তোর গায়ে হাত তুললেই তো আবার ওই ক্যালানে কাত্তিক রুখতে আসবে৷ এলে আজ ওকে মজা দেখাব৷ সেদিন কিছু বলিনি…৷’
কোকো নেনের কাছে এগিয়ে আসছিল৷ তাই দেখে রাহুল আর থাকতে পারল না৷ ও নেনের হাত চেপে ধরে অনুনয় করে বলল, ‘ওকে কিছু বোলো না৷ ওর অসুখ আছে…৷’
‘সব অসুখ আজ ঝেড়ে সারিয়ে দেব৷’ ঠোঁট বেঁকিয়ে কথাটা বলে এক ঝটকায় রাহুলের হাত ছাড়িয়ে নিল৷ শব্দ করে হেসে উঠল : ‘সেদিন মওকা পেয়ে আমাকে হেভি বেইজ্জত করেছিস…৷’
মাকু বাইকে বসা অবস্থাতেই চেঁচিয়ে বলল, ‘মালকে একটু বাইক দিয়ে চেটে দেব নাকি?’
ঝন্টুদা নেনের কাছে এগিয়ে এল : ‘এসব কী হচ্ছে? কেন পায়ে পা লাগিয়ে ঝগড়া করছ, ভাই? তোমাদের ক্লাবঘরের জন্যে অন্য আর-একটা ঘর…৷’
ঝন্টুদার মুখে থুতু ছুড়ে দিল নেনে৷ দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে ধমকে উঠল, ‘ফোট সালা! কাঁঠালের আঠা মারতে এসেছে! এখুনি বডি নামিয়ে দেব৷ ফোট!’
ঝন্টুদার মুখ-চোখ লাল হয়ে গিয়েছিল৷ পকেট থেকে রুমাল বের করে মুখ মুছল৷ ঘৃণার চোখে নেনেকে দেখল৷ তারপর এক-পা পিছিয়ে এল৷
কোকোকে আদুরে গলায় কাছে ডাকল নেনে৷ ডানহাতটা পকেট থেকে বের করে নিল৷
সঙ্গে-সঙ্গে রাহুল ভয়ে কাঠ হয়ে গেল৷
নেনের হাতে প্রায় ছ’ইঞ্চি ফলার একটা চকচকে ছুরি৷ বাতাসে ফলাটা ধরে সাপের ফণার মতো নাচাচ্ছে৷
