যে-বাচ্চা মেয়েটা মাকুর বাইকের তলায় আর-একটু হলেই চাপা পড়ছিল, তার বাবা-মা ঘটনার পরদিন সন্ধেবেলা রাহুলদের বাড়িতে এলেন—সঙ্গে মেয়েটি৷ ওঁদের খুব সাধ জেগেছে রাহুল আর কোকোকে স্বচক্ষে একবার দেখেন৷ ঘোর কলিযুগে এখনও এমন লোক আছে যারা অচেনা-অজানা কাউকে বাঁচানোর তাগিদে প্রতিবাদ করে, ঝুঁকি নেয়!
ওঁদের সঙ্গে গল্প করে কোকো দারুণ খুশি৷ ওর কথাবার্তা শুনে রাহুল অবাক হল৷ ওর মনে হল, কোকো যেন প্রথমদিককার তুলনায় কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে৷
প্রতিদিন বিকেলে ফুটবল খেলতে-খেলতে কোকো রাহুলদের ক্লাবে নিয়মিত ফুটবল প্লেয়ার হয়ে উঠল৷ শুধু রাহুলরা ওকে অনেক করে অনুরোধ করেছে ও যেন জোরে শট না মারে৷ কারণ, রোজ-রোজ ফুটবল ফেটে গেলে ফুটবল কেনার পয়সা জোগাবে কে!
মাকুদের সঙ্গে এনকাউন্টারের ব্যাপারটা রাহুল ইচ্ছে করেই মাম কিংবা বাপিকে প্রথমে বলেনি৷ ভুল একটা যখন হয়ে গেছে তখন শুধু-শুধু ওঁদের টেনশান বাড়িয়ে লাভ কী! কিন্তু বাপি পরদিন সকালে খবরটা পেয়ে গিয়েছিলেন৷ ফলে সেদিন রাতে রাহুলকে মাম আর বাপির জেরার মুখে পড়তে হল৷
রাহুল লুকোচুরি না করে সব কথা খুলে বলল৷
শুনে বাপি ওকে বললেন, খুব সাবধানে চলাফেরা করতে৷ সবসময় কেউ না কেউ যেন সঙ্গে থাকে—একা-একা রাহুল যেন কোথাও না যায়—বিশেষ করে রেললাইনের দিকে৷
কোকো একবার বলে উঠল, ‘আমি তো রাহুলের সঙ্গে সবসময় থাকি…৷’
বাপি আর মাম স্নেহভরা চোখে ওর দিকে তাকিয়ে হাসলেন৷ মাম বললেন, ‘তোমারও তো বিপদের ভয়, কোকো৷ রাহুল স্কুলে যাওয়ার সময় আর ফেরার সময় আমিও তোমাদের সঙ্গে থাকব৷ আর খেলার মাঠ থেকে ফেরার সময়—’ রাহুলের দিকে তাকালেন মাম : ‘দু-চারজন বন্ধু-বান্ধবকে সঙ্গে নিবি৷ বলবি একটু বাড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দিতে৷’
কোকো কী একটা বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু রাহুল হাত নেড়ে ওকে থামিয়ে দিল৷
এই নিয়মেই কয়েকদিন চলল৷ মাকু বা ওর দলের ছেলেদের সঙ্গে রাহুলদের দেখা হয়, কিন্তু ওরা কিছু বলে না৷ সাইকেল, বাইক নিয়ে রাহুলদের পাশ কাটিয়ে চলে যায়৷ তবে আড়চোখে ওদের দিকে তাকিয়ে দ্যাখে৷
রাহুলের মনে হয়, কোকোর সুখ্যাতির জন্যই মাকুর দলবল ‘বদলা’ নেওয়ার ব্যাপারে পিছিয়ে পড়ছে৷
কোকোর কথা এখন মণিমেলার প্রায় সবাই জানে৷ তা ছাড়া মাকুদের কাজকর্ম কেউই পছন্দ করে না৷ ওদের ওপর সবাই বিরক্ত৷ সুতরাং এরকম পরিস্থিতিতে যদি কোকো বা রাহুলের গায়ে হাত পড়ে তা হলে মাকুদের বিপদ হতে পারে৷
এসব কথা ভেবেই মাকু অপেক্ষা করছিল৷ আর একইসঙ্গে সুযোগ খুঁজছিল৷
রাহুল কোকোর জন্য দুশ্চিন্তা করলেও কোকো একেবারে চিন্তাভাবনাহীন৷ ও ওর মতোই দিন কাটাতে লাগল৷ টিউবওয়েল পাম্প করে জল তোলা, বাগানে পাখি কিংবা প্রজাপতির পিছনে ছুটোছুটি, ব্যায়াম করা, রাহুলের স্কুলে যাওয়া-আসা, কখনও-কখনও বাপির সঙ্গে বাজারে যাওয়া, বিকেলে মাঠে গিয়ে খেলা, আর বাপির সময় হলেই বাপির কাছে বসে ছবি আঁকা শেখা৷
কোকোর দিকে তাকিয়ে মাম আর বাপি অবাক হয়ে ভাবেন৷ ছেলেটা কেমন শিশুর মতো নিশ্চিন্ত আরামে রয়েছে! ওকে দেখে মাঝে-মাঝে মনে হয়, ও যেন প্রকৃতিরই একটা অংশ৷
রাহুলরা বহুদিন ধরেই ভাবছিল ওদের ক্লাব থেকে একটা লাইব্রেরি তৈরি করবে৷ এবার ওরা একটা ঘরের সন্ধান পেয়েছে৷ মণিমেলার সবচেয়ে পুরোনো ডাক্তার ডক্টর পরমেশ হালদার ওঁর দোতলা বাড়ির একতলার একটা ঘর রাহুলদের ছেড়ে দিয়েছেন৷ সেখানে ওদের লাইব্রেরি হবে—‘মণিমেলা সাধারণ পাঠাগার’৷
ঘর হাতে পাওয়ার পর রাহুলরা চাঁদা তুলতে শুরু করেছে৷ তারপর সেই টাকায় ঘর সারানোর কাজেও হাত দিয়েছে৷ একইসঙ্গে রাহুলরা রবিবার বা ছুটির দিনে বাড়ি-বাড়ি গিয়ে গল্পের বইয়ের খোঁজ করছে৷ বলছে, ‘আমাদের লাইব্রেরিতে গল্পের বই ডোনেট করুন৷’
ওদের উদ্যোগে বহু মানুষ সাড়া দিয়েছে৷ চাঁদার পাশাপাশি বইও পাওয়া যাচ্ছে অনেক৷
এসব কাজে রাহুলদের সঙ্গে কোকোও টো-টো করে ঘুরে বেড়াচ্ছে৷ ডোনেশানে পাওয়া বইয়ে থলে ভরতি করে দু-হাতে দুটো থলে ঝুলিয়ে ও রাহুলদের সঙ্গে এ-বাড়ি থেকে ও-বাড়ি অক্লান্তভাবে হেঁটে চলেছে৷
এরকমই এক রবিবার৷ বেলা প্রায় একটা বাজে৷ মাথার ওপরে গনগনে সূর্য৷ চারপাশে গরম বাতাস বইছে৷ রাহুলরা দল বেঁধে বাড়ি-বাড়ি ঘুরছে৷ ওদের দলে রাহুল, নিধু, গোপাল আর কোকো ছাড়া ছিল ওদের ক্লাবের সেক্রেটারি ঝন্টুদা৷ ঝন্টুদা ওদের মধ্যে সবচেয়ে বড়৷ চাকরি করে৷
একসময় ক্লান্ত হয়ে ওরা ক্ষান্ত হল৷ একটা বটগাছের ছায়ায় বিশ্রাম নিতে দাঁড়াল৷ কোকো হাতের ভারী থলে দুটো নামিয়ে রাখল মাটিতে৷ বটগাছের লাগোয়া একটা বড়-সড় পানের দোকান৷ দোকানের বাইরে থরে-থরে সাজানো কোল্ড ড্রিঙ্কের পেটি৷
ঝন্টুদা রুমাল বের করে কপালের ঘাম মুছে বলল, ‘অ্যাই, তোরা সবাই একটা করে পেপসি খা৷ আমি খাওয়াচ্ছি৷’
রাহুলরা সবাই মিলে ‘ঝন্টুদা, জিন্দাবাদ’ বলে চেঁচিয়ে উঠল৷ তারপর দোকানদারের কাছ থেকে পাঁচটা ঠান্ডা পেপসি নিল৷ একটা বোতলে স্ট্র ঢুকিয়ে কোকোর হাতে দিল রাহুল : ‘নাও, পেপসি খাও—৷’
কোকো বোতলটা নিয়ে অনভ্যস্ত ঢঙে সিপ করতে শুরু করল৷
সবার আগে কোকোর পেপসি খাওয়া শেষ হল৷ পরপর দুটো ঢেঁকুর তুলল ও৷
