কোকো অদ্ভুত ক্ষিপ্রতায় মাকুর বাইকের সামনে এসে দাঁড়াল৷
মাকু গিয়ার বদল করে বাইক ছুটিয়ে দিল৷ ওর বোধহয় কোকোকে চাপা দেওয়ার ইচ্ছে ছিল৷ কিন্তু সেটা হল না৷
কারণ, কোকো শক্ত দু-হাতে বাইকের হাতল চেপে ধরেছে৷ মাকুর হাতের পাশেই কোকোর নীল শিরা ওঠা দুটো হাত৷
বাইকটা গোঁ-গোঁ গর্জন করছিল, কিন্তু নড়তে পারছিল না৷ কোকো সামনে ঝুঁকে পড়ে চোয়ালে চোয়াল চেপে বাইকের অশ্বশক্তির টক্কর নিচ্ছিল৷ রাহুল আর দীপায়ন স্তম্ভিত হয়ে কোকোর কাণ্ড দেখছিল৷
রাস্তায় ভিড় জমছিল৷ বাচ্চা-বাচ্চা ছেলেমেয়েগুলো তো ছিলই, তার সঙ্গে জুটে গেল পথচারীরা৷ কেউ হেঁটে যাচ্ছিল, কেউ-বা সাইকেলে৷
বাইকটাকে ক্ষমতার শেষ সীমায় নিয়ে গেল মাকু৷ আকাশফাটানো গোঁ-গোঁ গর্জন৷ ধোঁয়া৷ পেট্রলের গন্ধ৷
কিন্তু কোকো অবিচল৷ সবার চোখের সামনে ও যেন এক রূপকথার সার্কাস দেখাচ্ছে৷
ও দাঁতে দাঁত চেপে বলল, ‘বাইকের…স্টার্ট বন্ধ…করো৷ নইলে বাইক…উলটে…দেব…৷’
ওর কথায় বোধহয় ম্যাজিক ছিল, কারণ, মাকু কী একটা সুইচ ঘোরাতেই একটা ঝাঁকুনি দিয়ে বাইকের ইঞ্জিন থেমে গেল৷ কোকো বাইকের হ্যান্ডেল ধরে হাঁপাতে লাগল৷
নেনে কোনওরকমে উঠে দাঁড়িয়েছিল, কিন্তু নালা পেরিয়ে কোকোর আক্রমণের আওতায় আসতে ভয় পাচ্ছিল৷ আর বর্মনবাড়ির ছেলেটাকে দেখে মনে হচ্ছিল এখুনি বোধহয় অজ্ঞান হয়ে যাবে৷
রাহুলই প্রথম সংবিৎ ফিরে পেল৷ ও ‘কোকো! কোকো!’ বলে চিৎকার করে ছুটে এল ওর ‘অলৌকিক’ বন্ধুর কাছে৷ ওকে পিছন থেকে একেবারে জাপটে ধরল৷
‘কোকো! কোকো!’ আবেগে রাহুলের চোখে জল এসে গেল৷
কোকো বাইক ছেড়ে দিয়ে রাহুলের দিকে ঘুরে দাঁড়াল৷ ওকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘তোমাকে যে মারবে…তাকে ছাড়ব না৷ ছাড়ব না৷’
কোকোকে অন্যমনস্ক দেখে নেনে সামান্য খুঁড়িয়ে-খুঁড়িয়ে নালা পেরোল৷ তারপর চট করে বাইকে উঠে বসল৷ সুযোগ বুঝে মাকুও বাইকে স্টার্ট দিয়ে গাড়ি ছুটিয়ে দিল৷ তবে যাওয়ার আগে কোকো আর রাহুলকে লক্ষ করে গালাগাল দিয়ে গেল৷ চিৎকার করে বলে গেল, ‘ওয়েট কর—তোদের হিসেব হবে৷’
রাহুল আর কোকো মাকুদের চলে যাওয়া দেখল৷
রাস্তার লোকজন এতক্ষণ যেন রুদ্ধশ্বাসে কোনও সিনেমা দেখছিল৷ বাইকটা চলে যেতেই সবাই কোকোর কাছে ছুটে এল৷ আলোচনা করতে লাগল, হইচই করতে লাগল, কোকোর সাহস আর শক্তির তারিফ করতে লাগল৷
কোকোকে নিয়ে প্রশ্নও করতে লাগল কেউ-কেউ৷
‘একে তো এ-গাঁয়ে আগে দেখিনি!’
‘ছেলেটার গলায় ওটা কী?’
‘ও কাদের বাড়িতে এসেছে?’
‘ওর নাম কী?’
কোকো কোনও কথায় কর্ণপাত করছিল না৷ ও এমনভাবে রাহুলের একটা হাত জড়িয়ে ধরে ছিল যেন হাতটা ছেড়ে দিলেই ও হারিয়ে যাবে৷ দীপায়নও রাহুলের কাছাকাছি দাঁড়িয়ে ছিল৷ ও রাহুলকে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফেরার জন্য তাড়া লাগাচ্ছিল৷
রাহুল কোকোর দিকে একদৃষ্টে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর বলল, ‘তুমি একেবারে ছেলেমানুষ, কোকো৷ ওই বাজে ছেলেগুলোর সঙ্গে ঝামেলায় জড়ালে কেন? জানো, ওরা গুন্ডা-মাস্তান?’
‘গুন্ডা কাকে বলে? মাস্তান…কী?’ সরল মুখে রাহুলের দিকে তাকিয়ে জানতে চাইল কোকো৷
রাহুল ওকে হাত ধরে টানল৷ হাঁটতে শুরু করল৷ পিছনে দীপায়ন৷
হাঁটতে-হাঁটতেই রাহুল বলল, ‘গুন্ডা৷ মাস্তান৷ ওদের সঙ্গে ছোরা থাকে, রিভলভার থাকে৷ ওরা খারাপ৷’
কোকো রাহুলের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘মাস্টারজির কাছে…রিভলভার আছে৷ মাস্টারজি…খারাপ৷’
রাহুল অবাক হলেও কোনও কথা বলল না৷ ওকে সঙ্গে নিয়ে হাঁটতে লাগল৷
দীপায়ন রাহুলকে জিগ্যেস করল, ‘মাস্টারজি আবার কে?’
ব্যাপারটা চাপা দেওয়ার জন্য রাহুল ঠোঁট উলটে বলল, ‘কী জানি! ও মাঝে-মাঝে ওরকম উলটোপালটা কথা বলে৷’
দীপায়ন বলল, ‘আমার তো চিন্তা হচ্ছে রে৷ মাকুরা সহজে ছাড়বে না৷’
চিন্তা রাহুলেরও হচ্ছিল৷ মাকু, নেনে ওরা মোটেই সুবিধের নয়৷ ওরা দোকানদারদের কাছ থেকে ভয় দেখিয়ে তোলা আদায় করে৷ সুযোগ পেলে ছিনতাই করে, ওয়াগন ভাঙে৷ রেল-লাইনের ধারে ওদের আসল ঠেক৷ সেখানে রাতে ওরা নেশা-ভাং-এ চুর হয়ে হইহুল্লোড় করে৷
রাহুল আপনমনেই বলল, ‘আমিই ভুল করলাম৷ কেন যে প্রোটেস্ট করতে গেলাম!’
দীপায়ন বলল, ‘তুই লাথিটা খাওয়ার পর চেপে গেলেও হত৷’
‘আমি তো চেপেই গেছিলাম৷ এই যে কোকোটা!’ কোকোর দিকে আঙুল দেখিয়ে রাহুল কপট রাগের গলায় বলল, ‘কোকোটাই তো নেনের সঙ্গে ঝামেলা করল!’
কোকো নির্বিকার সুরে বলল, ‘ছেলেটা তোমাকে…মারতে যাচ্ছিল…৷’
দীপায়ন বলল, ‘হ্যাঁ—তা যাচ্ছিল৷ কিন্তু…৷’
দীপায়নের কথা শেষ হওয়ার আগেই কোকো বলে উঠল, ‘রাহুলকে যে…মারবে তাকে আমি…ছাড়ব না৷ কিছুতেই ছাড়ব না৷’
বিকেলের শেষ আলো এসে পড়েছিল কোকোর মুখে৷ ও এক অদ্ভুত মমতা মাখা সরল চোখে রাহুলের দিকে তাকিয়ে ছিল৷ একটা আন্তরিক টান টের পেল রাহুল৷ এই বোকা-হাবা ভোলাভালা ছেলেটা মাত্র দু-সপ্তাহে বিচিত্র এক আত্মীয়তার অদৃশ্য সুতোয় রাহুলদের কখন যেন আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ফেলেছে৷
রাহুলের মনে হচ্ছিল, ঢলে পড়া সূর্যের আলো পড়ে নয়—কোকোর মুখটা এমনিই উজ্জ্বল দেখাচ্ছে৷
৷৷পাঁচ৷৷
দু-সপ্তাহে কোকোর কথা গ্রামের যে-ক’জন জেনেছিল, মাকুদের সঙ্গে মোকাবিলার পর সেই সংখ্যাটা প্রায় পঞ্চাশ গুণ হয়ে গেল৷
