রাহুল বলল, ‘মাকুর বাইক৷ বাইকে মাকু, ওর ভাই নেনে, আর বর্মনবাড়ির ছোটছেলেটা—কী নাম যেন—ওটা বসে আছে৷ মাকু তো এভাবেই বাইক চালায়—৷’
‘মাকু’ নামটা শোনামাত্রই দীপায়ন চুপ করে গেল৷ কোনও এলাকায় যে-নাম শোনামাত্র সবাই মুখে কুলুপ আঁটে ‘মাকু’ সেরকমই একটা নাম৷ ওর চ্যাংড়া ছোটলোক সাঙ্গোপাঙ্গদের সবাই এড়িয়ে চলে৷ বর্মনবাড়ির ছোটছেলেটা এ-দলে নতুন জুটেছে৷ ছেলেটা এখনও স্কুলে যায়, তবে চালচলন বড়লোকের বখাটে ছেলের মতন৷
রাহুল আর দীপায়ন নিজেদের মধ্যে চাপা গলায় মাকুর সমালোচনা করছিল৷ তার সঙ্গে বলছিল নেনের কীর্তিকথা৷ ওরা খেয়াল করেনি, কোকো হাঁ করে ওদের কথাগুলো গিলছিল৷
বিকেল ফুরিয়ে এলেও আলো ফুরোয়নি৷ খেলা শেষ করে ছোট-ছোট ছেলেমেয়েরা বাড়ির দিকে ফিরছে৷ নিজেদের মধ্যে ওরা যেরকম কথার ফুলঝুরি ছোটাচ্ছে তাতে মনে হচ্ছে সন্ধেবেলা বটগাছের আশ্রয়ে ফেরার পর পাখির ঝাঁক কিচিরমিচির করে ঝগড়া করছে৷
হঠাৎই মোটরবাইকটা আবার ফিরে এল৷ মনে হল, বাইকটা একই রাস্তা ধরে চক্কর কাটছে৷ সেই সাপের মতো আঁকাবাঁকা গতি৷ সঙ্গে হইহই চিৎকার৷
বাইকটার বিকট হর্ন বাজছিল৷
ওটা আচমকা এসে পড়ায় বাচ্চা-বাচ্চা ছেলেমেয়েগুলো দিশেহারা হয়ে যে যেদিকে পারল ছিটকে গেল৷ বাইকটার সর্পিল গতি ওদের ভয় পাইয়ে দিল৷ ওরা মিহি গলায় চিৎকার করতে লাগল৷
বাইকটা একটা বাচ্চা মেয়েকে প্রায় চাপা দিয়ে ফেলছিল৷ একেবারে শেষ মুহূর্তে মাকু ব্রেক কষে বাইকটাকে থামাল৷
বাচ্চা মেয়েটা ভয় পেয়ে টাল সামলাতে না পেরে রাস্তায় পড়ে গিয়েছিল৷ চিত হয়ে বাইকটার চাকার দিকে তাকিয়ে মেয়েটা ‘ভ্যাঁ’ করে কেঁদে ফেলল৷
বাচ্চাদের ভয় পেয়ে দৌড়োদৌড়ির কাণ্ড দেখে আর কান্না শুনে মাকুরা বোধহয় মজা পেল৷ ওরা তিনজনে বাইকে বসে-বসেই হাসতে শুরু করল৷ তারই মাঝে মাকু রাস্তায় পড়ে থাকা বাচ্চা মেয়েটাকে লক্ষ করে হাত নেড়ে বলে উঠল, ‘কাঁদে না, খুকু৷ তোমার কিচ্ছু হয়নি৷ তুমি মিছিমিছি কাঁদছ৷ এসো…হাত ধরো৷ উঠে পড়ো…৷’
বাচ্চা মেয়েটা ভ্যাবাচ্যাকা মুখে ধীরে-ধীরে উঠে দাঁড়াল৷ নিজের হাত-পা জামা ঝাড়তে লাগল৷
মাকুদের হাসি রাহুলের মাথায় আগুন ধরিয়ে দিল৷ ও তেমন করে কিছু না ভেবেই বাইকটার কাছে এগিয়ে গেল৷ মাকুকে লক্ষ করে জেহাদি প্রশ্ন ছুড়ে দিল৷
‘এসব কী হচ্ছে?’
‘তোর বাপের বিয়ে হচ্ছে৷’ বলেই বাইকে বসা অবস্থাতেই রাহুলের বুকে পা তুলে দিল মাকু৷ সজোরে এক ঠেলা মারল৷
লাথি খেয়ে রাহুল ছিটকে পড়ল রাস্তায়৷ মাথা ঠুকে গেল৷ যন্ত্রণার একটা চিৎকার বেরিয়ে এল মুখ থেকে৷
রাহুল উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছিল৷ দীপায়ন তাড়াতাড়ি ওর কাছে গিয়ে ওকে হাত ধরে টেনে তুলতে লাগল৷
মাকুরা বাইকে বসে মজা দেখছিল৷ ওদের বাইকের ইঞ্জিন ভটভট শব্দ করছিল৷ রাহুল উঠে দাঁড়াতেই মাকু আর নেনে ওকে নোংরা ভাষায় গালাগাল দিল৷ তারপর মাকু বলল, ‘এই আজব ভেড়াটাকে মেপে রাখ৷ পরে একে কড়া পালিশ দেব৷ সালার এত হিম্মত যে, আমার সঙ্গে মুখ লাগাতে আসে!’
রাহুল হাত-পায়ের ধুলো ঝাড়ছিল আর ঘেন্না-মেশানো প্রতিবাদের চোখে মাকুর দিকে দেখছিল৷
সেটা লক্ষ করে ভাইয়ের দিকে ঘাড় ঘোরাল মাকু : ‘অ্যাই নেনে, নাম তো বাইক থেকে৷ দ্যাখ, ব্যাটা ড্যাবড্যাব করে কেমন তাকাচ্ছে! মালটাকে একটু পাঁচালি পড়ে দে…৷’
নেনে হাসল৷ হাসতে-হাসতেই বাইক থেকে নামল৷ তারপর রাহুলের দিকে পা বাড়াল৷
কোকো এতক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল৷ খানিকটা বিভ্রান্তভাবে সকলের মুখের দিকে তাকাচ্ছিল৷ যেন কী করবে ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না৷
কিন্তু নেনে রাহুলের দিকে আক্রমণের ভঙ্গিতে এগোতেই কোকো নড়েচড়ে উঠল৷ একছুটে নেনের সামনে গিয়ে ওর পথ আগলে দাঁড়াল৷ কর্কশ গলায় টেনে-টেনে বলল, ‘রাহুলকে…মারবে না৷’
‘তাই?’ বলে নেনে ডানহাতে সপাটে এক ঘুসি বসিয়ে দিল কোকোর মুখে৷
কোকো ঘুসির অভিঘাতটা নিল, কিন্তু জায়গা থেকে নড়ল না—দাঁড়িয়ে রইল পাথরের মতো৷ ওর ঠোঁটের কোণ থেকে রক্ত বেরোচ্ছিল৷
ও আবার বলল, ‘রাহুলকে…মারবে না৷’
রাহুল ‘কোকো! কোকো, চলে এসো—’ বলে অস্থিরভাবে ওকে ডাকছিল৷ কিন্তু কোকো তাতে এতটুকু কান দিল বলে মনে হল না৷
‘রাহুলকে…মারবে না৷’ একঘেয়েভাবে আবার বলল কোকো৷
ওর অদ্ভুত কথা বলার ঢঙে নেনে হেসে উঠল : ‘কে রে আমার তোতলা কাত্তিক?’ তারপর ভেংচিয়ে বলল, ‘রাহুলকে মাবব না, ছোনা?’
কথা বলতে-বলতেই নেনে হাত তুলেছিল, কিন্তু ওই পর্যন্তই৷
রাহুলরা অবাক হয়ে কোকোর কাণ্ড দেখতে লাগল৷
এক ঝটকায় নেনের কোমর জাপটে ধরল কোকো৷ তারপর অবলীলায় ওকে শূন্যে তুলে ফেলল৷
নেনে দাপাদাপি করছিল৷ কোকোকে কিল-চড়-ঘুসি মারছিল৷ কিন্তু কোকো সেসব গ্রাহ্য করছিল না৷ ও অনায়াস ভঙ্গিতে হেঁটে গেল রাস্তার কিনারায়৷ তারপর নেনেকে স্রেফ ছুড়ে দিল নালার ওপারে৷ নেনে গিয়ে আছড়ে পড়ল একটা পরিত্যক্ত জমিতে৷
বাইকে বসে মাকু গর্জন করে উঠল৷ সেইসঙ্গে গালাগালের ফোয়ারা ছোটাল৷ কিন্তু ও বাইক থেকে নামেনি৷ বোধহয় শত্রুর এইরকম ভয়ংকর শক্তির সঙ্গে মোকাবিলা করাটা বুদ্ধিমানের কাজ হবে কি না সে-কথাই ভাবছিল৷ আর বাইকের পিছনে বসে থাকা বড়লোকের বখাটে ছেলেটা ভয়ের চোখে কোকোর দিকে তাকিয়ে ছিল৷
