কখনও-কখনও কোকো রাহুলের বাপি কিংবা মামের কাছেও পড়তে বসে৷ আবার বাপি যখন জল রং সাজিয়ে নিয়ে ছবি আঁকতে বসেন তখন কোকো বাপির পাশে গিয়ে চুপচাপ বসে থাকে৷ মুগ্ধ হয়ে ছবি আঁকা দ্যাখে৷
একদিন ছবি আঁকতে-আঁকতে বাপি ওকে জিগ্যেস করলেন, ‘তুমি ছোটবেলায় ছবি আঁকতে?’
‘না…আমি…আঁকতাম না৷’
তুলি হাতে নিয়ে হ্যান্ডমেড পেপারে হালকা নীলের ওয়াশ টেনে বাপি বললেন, ‘তুমি ছবি ভালোবাসো?’
‘হ্যাঁ৷’ ঘাড় কাত করে কোকো বলল৷
‘তুমি ছবি আঁকা শিখবে?’
আবার ঘাড় কাত করল কোকো৷ হ্যাঁ, ও ছবি আঁকা শিখবে৷
‘গুড বয়৷ কাল থেকে তোমাকে আমি আঁকা শেখাব৷’
‘আমার…মা…আমাকে ছবি আঁকা…শেখাত৷ মা খুব সুন্দর ছবি…আঁকত৷ মা…আর…নেই৷’
বাপি অবাক হয়ে দেখলেন কোকোর চোখে জল৷
ওকে কাছে টেনে নিলেন কল্যাণবাবু৷ গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, ‘তোমার মা-কে মনে আছে?’
কোকো বিহ্বলভাবে মাথা নাড়ল৷ বলল, ‘না…মনে নেই৷ শুধু ছবি আঁকা…মনে আছে৷’
তারপরই কোকো চুপ করে গেল৷ গুম হয়ে বসে রইল৷ অনেক প্রশ্ন করেও কল্যাণবাবু ওর কাছ থেকে আর কোনও কথা বের করতে পারলেন না৷
এর আগেও কোকোকে ওর বাড়ির কথা, বাবা-মায়ের কথা অনেকবার জিগ্যেস করেছেন, কিন্তু কোনও স্পষ্ট উত্তর পাননি৷ রাহুল আর ওর মা-ও বহুবার সরাসরি অথবা ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে কোকোকে ওর বাড়ির কথা জিগ্যেস করেছেন, বাবা-মায়ের কথা জিগ্যেস করেছেন, কিন্তু কোনও জবাব পাননি৷
আজ প্রথম বাপি জানতে পারলেন, কোকোর মা ছবি আঁকতেন৷
হয় সবকিছু কোকোর ধীরে-ধীরে মনে পড়ছে, অথবা, ও ধীরে-ধীরে নিজেকে মেলে ধরছে৷ ঠিক যেভাবে একটা গোলাপ কুঁড়ি থেকে ধীরে-ধীরে পাপড়ি মেলে ধরে৷
রাহুলের বাপি আর মাম কোকোকে ওঁদের স্বাভাবিক জীবনে মিশিয়ে নিলেন৷ কেন জানি না, ওঁদের মনে হয়েছিল, এতে কোকো তাড়াতাড়ি স্বাভাবিক হয়ে উঠবে৷ যদি কোনও পুরোনো স্মৃতি ওর হারিয়েও গিয়ে থাকে, তা হলে সেটা ফিরে আসবে৷
কোকো ওঁদের কথা শুনে চলত বটে তবে দুটি ব্যাপার ছাড়া৷ প্রথমটা হল, রাহুলের পাশে-পাশে ছায়ার মতো ঘোরা৷ আর দ্বিতীয়টা ঘরের নানান কাজে মাম এবং বাপিকে সাহায্য করা৷
একদিন রাহুলের সঙ্গে মাঠে খেলতে গিয়ে এক কাণ্ড হল৷
এমনিতে রোজ যে কোকো যায় ও কিন্তু খেলতে নামে না৷ মাঠের ধারে চুপচাপ বসে রাহুলদের ফুটবল খেলা দ্যাখে৷ আর গোল-টোল হলে হাততালি দেয়৷ হাত ছুড়ে চেঁচামেচি করে৷
কিন্তু সেদিন ওর কী খেয়াল চাপল, ও রাহুলের কাছে বায়না করে বসল৷
‘রাহুল, আমি…তোমার মতো…বল খেলব৷’
ওর বায়নার ধরন রাহুল জানে৷ একটা কিছু মাথায় ঢুকলে ও সেটাই ঘ্যানঘ্যান করে যাবে৷ তাই ও বন্ধুদের সঙ্গে পরামর্শ করে কোকোকে নিজের দলে নিল৷ ও ভেবেছিল, মিনিট পাঁচ-দশ খেলানোর পর কোকোকে ঠান্ডা করে বসিয়ে দেবে৷ কিন্তু কাজে সেটা করা গেল না৷ কারণ, কোকোর খেলা রাহুলকে অবাক করে দিল৷
না, কোকো ফুটবল খেলতে জানে না৷ তবে কচ্চিৎ কখনও পায়ে বল পেয়ে গেলে ও যে-অসম্ভব জোরে শট মারছে তা দেখে সকলের চোখ ছানাবড়া৷
কোকোর একটা জোরালো শট কোমরে লেগে নিধু ছিটকে পড়ে গেল৷ পড়ে ছটফট করতে লাগল৷
রাহুলরা সবাই ছুটে গেল ওর তদারকি করতে৷
গোপাল, রাহুল বেশ অবাক হয়ে গেল৷ নিধু ফুটবল খেলে ভালো৷ চেহারাও গাঁট্টাগোঁট্টা, পেটানো, সহজে ওকে কেউ কাবু হতে দেখেনি৷ কিন্তু আজ ওর অবস্থা ভেজা তুলোর মতো৷
নিধুকে মাঠের বাইরে নিয়ে যাওয়া হল৷ কোকো একাই ওকে চাগিয়ে কাঁধে তুলে নিল৷ মাঠের ধারে ওকে শুইয়ে দিয়ে সবাই মিলে পরিচর্যা করতে লাগল৷
একটু পরে খেলা আবার শুরু হল৷
কোকো হঠাৎ পায়ে বল পেয়ে তিরবেগে ছুটতে শুরু করল৷ সেরকম অভ্যাস স্বাভাবিকভাবেই না থাকায় বল ওর পা থেকে ছিটকে বেরিয়ে গিয়েছিল৷ কিন্তু ও একছুটে বলের কাছে পৌঁছে গেল৷ এবং শট মারল৷
বলটা গোলে ঢুকল৷ শুধু ঢুকল নয়, একেবারে জাল ছিঁড়ে বেরিয়ে গেল৷
গোলপোস্টের দশ-বারো হাত পিছনেই ছিল স্বদেশ মণ্ডলদের বাঁখারির বেড়া৷ জাল ছিঁড়ে বেরোনো বলের ধাক্কায় সেই বেড়াটাও কাত হয়ে গেল৷
গোলের আনন্দে রাহুলদের দলের সবাই হইহই করে উঠেছিল৷ কিন্তু দেখা গেল গোল খাওয়া দলের বন্ধুরাও স্তম্ভিত ভাবটা কাটিয়ে কোকোকে ঘিরে উৎসব শুরু করে দিল৷ কারণ, এরকম ভয়ংকর তীব্র শট মণিমেলায় আগে কেউ কখনও দেখেনি৷ মণিমেলায় শট মারার একটা প্লেয়ার পাওয়া গেল বটে! কোকো ফুটবল খেলতে না জানুক, শট তো মারতে পারে! ওকে রাহুলরা প্র্যাকটিস করিয়ে-করিয়ে খেলাটা একটু-আধটু রপ্ত করিয়ে দেবে৷ তারপর ও দু-চারটে শট মেরে বাজিমাত করবে৷ মণিমেলার ফুটবল টিমে ওকে খেলাতে হবেই৷
খেলার শেষে রাহুল, দীপায়ন আর কোকো বাড়ির দিকে ফিরছিল৷
মাঠ ছেড়ে ওরা পিচের রাস্তা ধরে যাচ্ছিল৷ হঠাৎই একটা বিশাল মোটর-বাইক গাঁক-গাঁক শব্দ তুলে ওদের পাশ দিয়ে ছুটে গেল৷ বাইকে তিনটে ছেলে ঘেঁষাঘেঁষি করে বসেছিল৷ তিনজনেরই গায়ে স্লিভলেস ভেস্ট, আর বারমুডা৷ কী এক উল্লাসে চিৎকার করছে৷
বাইকটা যেভাবে কাত করে-করে সাপের মতো এঁকেবেঁকে ওরা চালিয়ে গেল তাতে রাহুল ভয় পেয়ে গিয়েছিল৷ ওর মানে হল, এক্ষুনি বুঝি বাইকটা উলটে যাবে৷
দীপায়ন বলে উঠল, ‘কী রাফ চালাচ্ছে! আর-একটু হলেই অ্যাকসিডেন্ট করত৷’
