রথপতি গুপ্ত ভুরু কোঁচকালেন৷ আজব প্রাণী দেখার দৃষ্টিতে কোকোর দিকে তাকালেন : ‘ওর গলার ওই লোহার বালাটা কীসের?’
কল্যাণবাবু তাড়াতাড়ি বললেন, ‘ওটা একটা মেডিক্যাল ইলেকট্রনিক ব্যান্ড৷ ট্রিটমেন্টের জন্যে ওর ডক্টর দিয়েছেন৷’
‘বাব্বা! এসব তো বাপের জন্মে কখনও দেখিনি৷ এ আবার কী ধরনের রোগ?’
‘অ্যাকিউট মালটিপল সাইকো-প্যাথলজিক্যাল চাইল্ড সিনড্রোম৷ মানে, ওর সাইকিয়াট্রিস্ট তাই বলেছেন…৷’
এত লম্বা-চওড়া নামে রথপতি বেশ ঘাবড়ে গেলেন৷ আর কোনও প্রশ্ন করলেন না৷
কল্যাণ জানতেন যে, রথপতি বেশিদূর লেখাপড়া শেখেননি৷ তাই ওঁর অন্তর-খোঁচানো প্রশ্নমালা ঠেকানোর জন্য যা পেরেছেন বানিয়ে একটা খটমট রোগের নাম বলে দিয়েছেন৷ এ-নামে সত্যিই কোনও রোগ হয় কি না তিনি জানেন না৷
‘ও, আচ্ছা৷ তা ও তাড়াতাড়ি সেরে উঠুক৷’ আবার কোকোর পিঠ চাপড়ে দিলেন রথপতি : ‘তুমি বড় ভালো ছেলে, বাবা৷ তাড়াতাড়ি সেরে ওঠো৷’
সামান্য হেসে রথপতি গুপ্ত চলে গেলেন৷
রাহুল বলল, ‘তাড়াতাড়ি বাড়ি চলো, বাপি৷ নইলে কোকোকে নিয়ে আরও সবাই প্রশ্ন করবে৷’
বাপি ‘হ্যাঁ—চল৷’ বলে তাড়াতাড়ি পা চালালেন বটে, কিন্তু ওঁর মনে উদ্বেগ থেকেই গেল৷
বাজারে কয়েকজন কোকোর কথা জিগ্যেস করেছে৷ তখন মোটামুটি এরকম সাফাই দিয়েই ম্যানেজ করেছেন কল্যাণ৷ কিন্তু ভেতরে-ভেতরে তিনি বেশ বুঝতে পারছিলেন, এই উত্তরে বেশিদিন চলবে না, কারণ, কোকোকে যে ঘিয়া নদীর পাড়ে পাওয়া গেছে এ-কথা আজ নয় কাল জানাজানি হবেই৷ তখন কী হবে?
বাপি আর ভাবতে পারছিলেন না৷ আনমনা ভাবে পা ফেলতে লাগলেন৷
রাহুল আর কোকো পাশাপাশি হাঁটছিল৷ কোকো হঠাৎই রাহুলকে লক্ষ করে বলল, ‘রাহুল আমার অ্যাকিউট…চাইল্ড হয়েছে৷ আমার সাইকিয়া…বলেছে৷’
ওর দিকে তাকিয়ে রাহুল আর বাপি দুজনেই হেসে ফেললেন৷
কোকো বাঁ-হাতটা পেটে দিয়ে বলল, ‘আমার খিদে পেয়েছে…৷’
‘হ্যাঁ, তাড়াতাড়ি চলো, বাড়ি গিয়ে খাবে৷’ রাহুল বলল৷
কোকো খুশিতে এপাশ-ওপাশ মাথা নাড়ল : ‘কী মজা! আমি…বাড়ি…গিয়ে খাব…খাব৷’
৷৷চার৷৷
কোকোকে নিয়ে ভীষণ মুশকিলে পড়ে গেল রাহুল৷ ও কিছুতেই রাহুলকে কাছ-ছাড়া করতে চায় না৷ সোমবার রাহুল স্কুলে যাওয়া শুরু করতেই কোকোরও বায়না শুরু হয়ে গেল : ‘আমি রাহুলের সঙ্গে যাব৷ আমি…যাব৷’
শেষ পর্যন্ত ব্যাপার এমন দাঁড়াল যে, কোকো বাচ্চা ছেলের মতো কান্নাকাটি দাপাদাপি শুরু করে দিল৷
বাপি আগেই অফিসে বেরিয়ে গিয়েছিলেন৷ বেগতিক দেখে রাহুলের মা কল্যাণবাবুকে ফোন করলেন৷
সব শুনে বাপি বললেন, ‘ঠিক আছে, বায়না করছে যখন তুমি আর ও রাহুলের সঙ্গে যাও৷ রাহুলকে স্কুলে দিয়ে তোমরা আবার ফিরে এসো৷ কোকো তো আসলে বাচ্চা ছেলে৷ শুধু দেখতেই যা বড়সড়৷ ও কি অত বোঝে?’
অগত্যা তাই হল৷ মাম, কোকো আর রাহুল স্কুলের পথ ধরল৷
স্কুল বেশি দূরে নয়৷ হাঁটা পথে স্কুলে যেতে-যেতে রাহুল কোকোকে অনেক গল্প বলছিল৷ স্কুলের গল্প, ফুটবল খেলার গল্প, গাঁয়ের মেলার গল্প, দুর্গাপুজোর সময় যে বিশাল উৎসব হয় তার গল্প৷
কোকোর মুখ দেখে মনে হচ্ছিল ও অন্য কোনও গ্রহের প্রাণী৷ এসব ব্যাপার যেন ও প্রথম জানছে রাহুলের কাছে৷
রাহুলকে স্কুলে দিয়ে মাম কোকোকে নিয়ে বাড়ি ফিরে এলেন৷ কোকো বারবার জিগ্যেস করতে লাগল, রাহুল কখন ফিরবে৷ মাম ওকে কোনওরকমে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে শান্ত করলেন৷
কোকো কিন্তু বাড়িতে বসে-বসে সময় কাটাল না৷ রাহুলের মা-কে সাহায্য করার জন্য পাগল হয়ে উঠল৷ মামের কোনও বারণ শুনল না৷
টিউবওয়েল পাম্প করে-করে ও বালতি-বালতি জলের জোগান দিতে লাগল৷ কাচা জামাকাপড় দড়িতে ছড়াতে লাগল৷ ঘরোয়া ফাইফরমাশ খাটতে লাগল৷ এ ছাড়া বাকি সময়টা কোকো বাগানে ঘুরে কাটাল৷ কখনও ফুল দেখতে লাগল, আবার কখনও পাখির খোঁজে হাঁ করে গাছের ঘন পাতার দিকে চেয়ে রইল৷ বিকেলের দিকে ও বাগানের একপাশে দাঁড়িয়ে ব্যায়াম সেরে নিল৷
রাহুলের মা কোকোর ‘কীর্তি’ দেখছিলেন৷
দেখছিলেন কত সহজে আর কত তাড়াতাড়ি ও টিউবওয়েল পাম্প করে জল তুলছে৷ ওর সহজ ভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে যেন ও একটা খেলনা টিউবওয়েল পাম্প করছে৷ এ ছাড়া ঘরের ভেতর থেকে কোকোর ব্যায়ামও দেখছিলেন৷ জামা খুলে খালি গায়ে ও দাঁড়িয়ে ছিল৷ তারিফ করার মতো ঝকঝকে স্বাস্থ্য—সিনেমায় যেমন দেখা যায়৷ শুধু ফরসা বুকে কয়েকটা সিগারেটের ছ্যাঁকার দাগ৷ মাম বুঝলেন, মাস্টারজি মানুষটি এই ভোলাভালা শিশু-যুবকের ওপরে কম অত্যাচার করেননি!
কোকো প্রথমে খালি হাতে ব্যায়াম শুরু করল৷ ডন-বৈঠক ইত্যাদি শেষ করার পর ও বাগানের পাঁচিলের পাশ থেকে শ্যাওলা পড়া দুটো থান ইট তুলে নিল৷ সেগুলোকে ডাম্বেলের মতো ব্যবহার করে ও আবার শরীরচর্চা শুরু করল৷ ওর সারা গা ঘেমে উঠল, শরীরটা চকচক করতে লাগল৷
রাহুল স্কুল থেকে ফেরার পর কোকো আবার ওর ল্যাংবোট হয়ে ঘুরতে শুরু করল৷ ওর সঙ্গে খেলার মাঠে গেল৷ তারপর ওর সঙ্গে পড়তে বসে গেল৷ রাহুল একটা খাতা দিয়ে ওকে ‘অ-আ-ক-খ’ লিখতে বলল৷ কোকো অনভ্যস্ত হাতে আঁকাবাঁকা রেখায় বর্ণগুলো লিখে চলল৷
কয়েকদিনের মধ্যেই কোকো রাহুলের স্কুল ভালোমতন চিনে নিল৷ এখন আর মামকে ওর সঙ্গে যেতে হয় না৷ কোকো যদি সুস্থ স্বাভাবিক হত তা হলে বলা যেত ও-ই রাহুলকে স্কুলে দিয়ে আসে, আবার ছুটির সময় নিয়ে আসে৷ রাহুলের সঙ্গে মাঠে ফুটবল খেলতে যায়, তারপর সন্ধেবেলা পড়তে বসে৷ ‘অ-আ-ক-খ’, ‘এ-বি-সি-ডি’ কিংবা ‘১ থেকে ১০০’ লিখতে শেখে৷ ওর লেখাপড়ার ধরন দেখে বোঝা যায়, কোকো কয়েক বছর স্কুলে গিয়েছিল৷ তারপর কোনও কারণে ওর পড়াশোনা থেমে যায়৷
