লোকজন ছুটে যাচ্ছিল বিপজ্জনক-ভাবে হেলে পড়া গাড়িটার দিকে৷ মনে হচ্ছিল, আর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই গোরুর গাড়িটা বস্তাসমেত নালায় গড়িয়ে পড়বে৷ গতকালের বৃষ্টির জল নালায় জমে আছে৷ এর মধ্যেই গড়িয়ে পড়া তিনটে বস্তা জলে ভিজে একসা৷ ভেজা বস্তা দেখে রাহুল বুঝল, বস্তায় আলু আছে৷
হাতের থলেটা রাস্তায় নামিয়ে রেখে কোকো কখন যেন ছুট লাগিয়েছিল৷
রাহুল পিছন থেকে ‘কোকো! কোকো!’ বলে চিৎকার করে ওকে ডাকতে লাগল৷ কিন্তু ছেলেটা শুনলে তো!
রাহুল দেখল, কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই কোকো হেলে পড়া গোরুর গাড়ির কাছে পৌঁছে গেল৷ ঝুঁকে পড়ে গাড়িটার লম্বা বাঁশের কাঠামোর নীচে কাঁধ লাগিয়ে প্রাণপণে সোজা হয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতে লাগল৷ ওর ফরসা মুখ লাল হয়ে গেল, চোখ-মুখ বিকৃত হয়ে গেল৷ মরিয়া হয়ে ও হেলে পড়া গাড়িটাকে চাগিয়ে তুলতে লাগল৷
রাস্তার একপাশে বাজারের থলে নামিয়ে রেখে বাপির দিকে একবার তাকিয়েই রাহুল ছুটতে শুরু করেছিল৷ ও যখন গোরুর গাড়িটার কাছে এসে পৌঁছল তখন গাড়ির হেলে পড়া দিকটা অনেকটা সোজা হয়ে গেছে৷ কোকোর হাতের শিরা ফুলে উঠেছে, গলার শিরা ফুলে উঠেছে৷ ও দম বন্ধ করে অবাক করা শক্তিতে গাড়িটাকে ঠেলে তুলে একটু-একটু করে সোজা করছে৷
ততক্ষণে রাস্তায় ভিড় জমে গেছে৷ লোকজন হইহই চিৎকার করে কোকোর এই অলৌকিক কাণ্ড দেখছে৷ বলদ দুটোর ঘাড়ের যন্ত্রণা কমে যাওয়ায় ওরা চিৎকার বন্ধ করেছে৷
ভিড়ের মধ্যে কে একজন চেঁচিয়ে বলল, ‘সবাই কাঁধ লাগাও, ভাই—এসো!’
সঙ্গে-সঙ্গে শোরগোল উঠল৷ পাঁচ-ছ’জন মানুষ ছুটে গিয়ে কোকোর পাশাপাশি কাঁধ লাগাল৷ আওয়াজ তুলল, ‘মারো জোয়ান হেঁইয়ো…৷’
গাড়ির বিশাল চাকাটা নালার ঢালে কাত হয়ে পড়েছিল৷ কয়েকজন সেটা তুলে এনে গাড়ির পাশ থেকে বেরিয়ে থাকা রডে লাগিয়ে দিল৷ গোরুর গাড়িটা সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল৷ ওটার চাকার হুড়কোটা ভেঙে গিয়েছিল৷ তাই নতুন একটা লোহার হুড়কো জোগাড় করতে দুজন সাইকেল চেপে রওনা হয়ে গেল৷
কোকো গাড়িটা ছেড়ে একপাশে সরে দাঁড়িয়েছিল৷ হাঁপাচ্ছিল আর গাড়িটার দিকে তাকিয়ে দু-হাত জামায় ঘষে-ঘষে মুছছিল৷
রাহুল চেঁচিয়ে ওকে ডাকল, ‘কোকো…এদিকে এসো…৷’
কোকো ফিরে তাকাল৷ রাহুলকে দেখতে পেল৷ হেসে হাত নাড়ল৷ তারপর রাহুলের দিকে এগিয়ে আসতে লাগল৷
কিন্তু ও আসবে কী! লোকজন ওকে ঘিরে ধরে সাবাশ দিতে লাগল৷
‘বাব্বাঃ, তোমার গায়ে তো হেভি জোর!’
‘তুমি কে হে? তোমার নাম কী? তোমাকে তো এ এলাকায় আগে দেখিনি! তবে হ্যাঁ, তোমার হিম্মত আছে বটে!’
‘সাবাশ, ভাই! একটা দারুণ জিনিস দেখালে৷’
‘ওকে একটা প্রাইজ দেওয়া উচিত৷’
‘তোমার গলায় ওটা কী বলো তো? এরকম পিকিউলিয়ার হার তো আগে দেখিনি…৷’
রাহুল তাড়াতাড়ি জটলার মধ্যে ঢুকে পড়ে কোকোর হাত ধরল৷ ওকে টেনে নিয়ে এল বাইরে৷ জনতার মধ্যে থেকে উৎসাহী কয়েকজন হাত বাড়িয়ে কোকোর পিঠ চাপড়ে দিল৷
বাপি তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে ওদের কাছাকাছি এসে পড়েছিলেন৷ রাহুলকে বললেন, ‘শিগগির বাজারের থলে দুটো তুলে নিয়ে চল৷ এক্ষুনি নানানজন এসে কোকোকে নিয়ে হাজারটা প্রশ্ন করবে…তখন মুশকিল হবে…৷’
রাহুল আর কোকো চটপট ওদের থলে দুটো তুলে নিয়ে এল৷ তারপর ওরা তিনজনে জলদি পায়ে হাঁটা লাগাল বাড়ির দিকে৷
কিন্তু নিরাপদে বাড়ি পৌঁছনো হল না৷
গোরুর গাড়ির ঘটনার জায়গা ছেড়ে বিশ-পঁচিশ পা যেতে না যেতেই রথপতি গুপ্তর সঙ্গে দেখা৷ ভদ্রলোক একসময়ে পঞ্চায়েতের সদস্য ছিলেন৷ এখন আর নেই৷ রেডিমেড জামা-কাপড়ের ব্যবসা করেন৷ কলকাতার কয়েকটা নামী দোকানে ছেলেমেয়েদের শৌখিন পোশাক সাপ্লাই করেন৷
রাহুলের বাপির সঙ্গে রথপতির বেশ ভালোই আলাপ৷ ভদ্রলোক সবসময় পাড়াপড়শির হাঁড়ির খবরের খোঁজ করে বেড়ান৷ সেটা বিরক্তিকর হলেও লোকজনের সুখ-দুঃখে পাশে দাঁড়ান৷ বিপদে আন্তরিকভাবে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন৷
রাহুলের বাপির মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়ে পড়লেন রথপতি৷ হেসে জিগ্যেস করলেন, ‘কেমন আছেন, কল্যাণবাবু?’
‘ভালো৷ আপনি কেমন আছেন?’
‘চলে যাচ্ছে আর কী!’ কোকোর দিকে তাকালেন রথপতি৷ আঙুল নেড়ে বললেন, ‘এই ছেলেটির জন্যে আজ গর্বে বুক ফুলে উঠছে৷ আমি ওই রিকশা স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে সব দেখেছি৷ ওর সাহস আর শক্তির প্রশংসা করতে হয়৷ পরের বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়া একটা বিশাল গুণ৷ কী নাম তোমার?’
কোকো কর্কশ গলায় বলল, ‘কোকো…৷’
‘সাবাশ, কোকো!’ কোকোর পিঠ চাপড়ে দিলেন রথপতি৷ তারপর চোখ সরু করে কল্যাণবাবুর দিকে তাকালেন : ‘কোকো আপনার কে হয়? ওকে তো আগে কখনও মণিমেলায়…মানে, আমাদের এ-গাঁয়ে দেখিনি—৷’
কল্যাণবাবু উত্তর দিতে একটুও দেরি করলেন না৷ গতকাল রাতে ভেবে-ভেবে তিনি গল্পটা তৈরি করে নিয়েছেন৷
‘ও আমার পিসতুতো দাদার ছেলে—শ্রীরামপুরে থাকে৷ ওর একটু সাইকিয়াট্রিক প্রবলেম আছে৷ ওখানে ডক্টরের ট্রিটমেন্টে আছে৷ তিনিই বলেছেন, কিছুদিন গ্রামের হাওয়া খেয়ে আসতে৷ মানে, গাছপালা মাঠঘাটের কাছাকাছি থাকলে ওর প্রবলেমটা তাড়াতাড়ি ঠিক হয়ে যাবে…৷’
‘কী প্রবলেম ওর?’
এতটা খোঁচানো কোশ্চেন রাহুলের বাপি আশা করেননি৷ তাই একটু থতমত খেয়ে বললেন, ‘এই…মানে…ওর মধ্যে একটা বাচ্চা-বাচ্চা ভাব আছে৷ যদিও ওর বয়েস প্রায় সাতাশ৷ তা ছাড়া গলাটা কেমন হোর্স… ধীরে-ধীরে কথা বলে…৷’
