কোকো পাঁচ বছরের বাচ্চার মতো অভিমানী মুখ করে গোঁজ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল৷ বিড়বিড় করে বলতে লাগল, ‘আমি…বাজারে…যাব৷ আমি…বাজারে…যাব…৷’
রাহুলের মাথায় হঠাৎই একটা বুদ্ধি খেলে গেল৷ শেষ অস্ত্র হিসেবে সেটা প্রয়োগ করল ও৷
‘তোমার তো চটি-জুতো কিচ্ছু নেই—আমাদের সঙ্গে তুমি যাবে কেমন করে! বাজারে ভীষণ জল-কাদা…৷’
এ-কথা শোনামাত্রই কোকোর মুখে হাসি ফুটে উঠল৷ ও রাহুল আর রাহুলের বাপিকে অবাক করে দিয়ে ‘চটি…আছে! চটি…আছে!’ বলে গ্রিল দেওয়া বারান্দার দিকে ছুট লাগাল৷
রাহুল আর বাপিও ওর পিছন-পিছন এগোল৷
গ্রিল ঘেরা বারান্দার একপাশে রাহুলদের সবার চটি-জুতো থাকে৷ সেটা গতকালই বোধহয় কোকোর নজরে পড়েছে৷ রাহুলরা যখন বারান্দায় এসে পৌঁছল ততক্ষণে রাহুলের মায়ের একজোড়া চটি পায়ে দিয়ে কোকো একেবারে বাউন্ডারির গেটে পৌঁছে গেছে৷ সেখান থেকে কোকো দু-হাতে হাতছানি দিয়ে রাহুলকে ডাকছে : ‘এই তো চটি পরেছি! রাহুল, তাড়াতাড়ি এসো…তাড়াতাড়ি…৷ আমি… বাজারে…যাব৷ বাজারে…৷’
ওর কাণ্ড দেখে রাহুল হেসে ফেলল৷ বাপিও আর হাসি চেপে রাখতে পারলেন না৷ রাহুলের মা কখন যেন রান্নাঘর ছেড়ে বেরিয়ে এসেছিলেন৷ কোকোর কাণ্ড দেখে হেসে বললেন, ‘ওইটুকু বাচ্চা! ও কখনও বোঝে কোন চটিটা ছেলেদের আর কোনটা মেয়েদের!’
‘ওইটুকু বাচ্চা!’ বাপি অবাক হয়ে মামের দিকে তাকালেন : ‘কী বলছ তুমি? ওর বয়েস কম করেও পঁচিশ কি ছাবিবশ হবে৷’
মাম কেমন একটা অদ্ভুত গলায় বললেন, ‘সে হোক গে৷ ক্যালেন্ডার দিয়ে কি সবসময় বয়েস মাপা যায় নাকি! ও আসলে একটা বাচ্চা ছেলে…৷’
তো সেই পঁচিশ-ছাবিবশ বছরের ‘বাচ্চা’ ছেলেটা রাহুল আর বাপির সঙ্গে বাজারের পথ ধরল৷ রাহুল লক্ষ করল, চলার পথে কোকো অবাক হয়ে সব কিছু দেখছে৷ যেন ও সদ্য পৃথিবীতে এসে একের পর এক নতুন আবিষ্কার করে চলেছে৷ চকচকে উদগ্রীব চোখে ও দেখছে আকাশ, সূর্য, গাছপালা, ফুল, পাখি, সাইকেল রিকশা, গোরুর গাড়ি, সাইকেল, মোটরবাইক, ভ্যান-রিকশা, টালির দোচালা-চারচালা ঘর, জল-কাদা, ঘাস, মানুষজন—আরও কত কী!
কোকোর চোখের দিকে তাকিয়ে রাহুলের মনে অনেক প্রশ্ন জাগছিল৷ মাস্টারজি, সিগারেটের ছ্যাঁকার দাগ, হাত-পায়ের ক্ষতচিহ্ন, কন্ট্রোল ব্যান্ড, ঘিয়া নদীর জলে ভেসে আসা একটা মানুষ…আরও কত বিষয় ঘিরে প্রশ্নের পর প্রশ্ন৷ আবার একইসঙ্গে মনে পড়ছিল গতকালের সেই হাহাকার : ‘আমার…কেউ…নেই৷ মা…নেই৷ বাবা…নেই৷’ শিশু-যুবকটির তখনকার সর্বহারা অসহায় মুখের কথা মনে করে রাহুলের বুকের ভেতরটা মুচড়ে উঠল৷ ও তাকাল কোকোর দিকে৷ ওর মুখে এখন নতুন পৃথিবীর নতুন-নতুন জিনিস আবিষ্কারের আনন্দ৷
বাজারে পৌঁছে অন্যান্য রবিবারের মতো বাপি প্রথমে আনাজপাতি কিনতে শুরু করলেন৷ সরু-সরু বাঁশের ডগায় পলিথিনের ছাউনি খাটিয়ে দোকানিরা বসেছে৷ কেউ রাস্তার ধারে, কেউ-বা রাস্তার লাগোয়া মাঠে৷ চারদিকের নানারকম শব্দ বলে দিচ্ছিল এটা একটা ব্যস্ত জায়গা৷ লোকজনের কথাবার্তা, সাইকেলের ঘণ্টি, ভ্যান-রিকশার প্যাঁক-প্যাঁক, মোটরবাইকের আওয়াজ—কতরকমের শব্দ! তিন-চাররকম সবজি কেনা হতেই কোকো জেদ করে, বায়না করে, সেই থলেটা বাপির হাত থেকে নিয়ে নিল৷ বলল, বাজারের একটা থলে ও বইবে, কারণ, ওর গায়ে জোর আছে৷
এ-কথায় রাহুল যখন হেসে বলেছে, ‘তোমার গায়ে জোর আছে মানে?’
তখন কোকো জবাব দিয়েছে, ‘মাস্টারজি বলে৷ আমার…গায়ে খুব…জোর৷’
রাহুল তখন অবাক হয়ে কোকোর দিকে তাকিয়েছে শুধু—কোনও কথা বলেনি৷
ঘুরে-ঘুরে বাজার করার কাজ শেষ হল একসময়৷ বাপি, রাহুল আর কোকো বাড়ির পথ ধরল৷ অন্যান্য রবিবার রাহুল আর বাপি সাইকেল-রিকশায় ফেরেন৷ কিন্তু আজ কোকো সঙ্গে আছে—রিকশায় তিনজন আঁটবে না৷ তার ওপর তিন-তিনটে থলে৷
ফেরার পথে রাহুল আর কোকো গল্প করছিল৷ রাহুল বলছিল, কোকো অবাক হয়ে শুনছিল৷ আর মাঝে-মাঝে চারপাশটা দেখছিল৷
হঠাৎই দূরে একটা গোরুর গাড়ি দেখতে পেল রাহুল৷ অনেকগুলো বস্তা বোঝাই করে ধীরে-ধীরে এগিয়ে আসছে৷ রাস্তার খানাখন্দে পড়ে চাকাগুলো একবার ডানদিকে একবার বাঁ-দিকে হেলে যাচ্ছে৷
রাহুল আঙুল তুলে গোরুর গাড়িটা কোকোকে দেখাল, বলল, ‘ওই দ্যাখো, গোরুর গাড়ি…৷’
‘আমি…আগে…গোরুর গাড়ি…দেখেছি৷’ স্মৃতি খুঁজে পাওয়ার আনন্দে কোকোর চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল৷
বাপি আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিলেন৷ নীল আকাশে ছোট-ছোট মেঘ ভেসে আসছে সূর্যের কাছাকাছি৷ কয়েকটা লম্বা-লম্বা গাছ মাথা তুলে রয়েছে আকাশের দিকে৷ বাতাসে অল্প-অল্প নড়ছে৷
বাপি মুগ্ধ চোখে আকাশটাকে দেখছিলেন৷ রাহুল বুঝতে পারছিল বাপির এখনই রং-তুলি নিয়ে বসে পড়তে ইচ্ছে করছে৷ ছবি আঁকা বাপির একমাত্র শখ৷ সময় পেলেই জল রং আর তুলি নিয়ে বসে পড়েন৷ মাঠ, ঘাট, নদী, গাছপালা আঁকেন৷ বাপির কাছে রাহুল শুনেছে, এ ধরনের ছবিকে ল্যান্ডস্কেপ বলে৷
রাহুল একটু আনমনা হয়ে পড়েছিল৷ হঠাৎই লোকজনের হইচই চিৎকারে ও চমকে উঠল৷ আকাশের দিক থেকে চোখ সরিয়ে তাকাল সামনের দিকে৷
গোরুর গাড়িটার একটা চাকা আচমকা ভেঙে কাত হয়ে গেছে৷ ফলে বস্তা-বোঝাই গাড়িটা হেলে পড়েছে রাস্তার ধারের নালার দিকে৷ কয়েকটা বস্তা ধীরে-ধীরে গড়িয়ে পড়ছে নালার গর্তে৷ মাথায় গামছা জড়ানো গাড়োয়ান হাতের ছিপটি ছুড়ে ফেলে লাফ দিয়েছে রাস্তায়৷ বলদ দুটো ঘাড় কাত করে দাঁড়িয়ে চিৎকার করছে৷
