রাহুলের মনে কষ্ট হল৷ ও মাম আর বাপির দিকে তাকাল৷
মাম বললেন, ‘আহা রে, এভাবে কেউ মারে?’
বাপি বিড়বিড় করে বললেন, ‘ব্যাপারটা আমার তো খুব মিস্টিরিয়াস লাগছে৷ যাকে ও ‘‘মাস্টারজি’’ বলছে সে কোথাকার মাস্টার? স্কুল- কলেজের, না অন্য কিছুর?’
রাহুল এবার কোকোর গালের চাকা-চাকা দাগগুলোর দিকে দেখাল৷ আঙুল বাড়িয়ে একটা দাগ সামান্য ছুঁতেই কোকো ‘উঃ!’ করে উঠল৷
‘কোকো, এই দাগগুলো কী করে হয়েছে? এখানে ব্যথা নাকি?’
কোকো নিষ্পাপ সরল চোখে কয়েক মুহূর্ত রাহুলের দিকে তাকিয়ে রইল৷ তারপর কী বুঝল কে জানে! আলতো করে বলল, মাস্টারজি৷ সিগারেট খায়৷ সিগারেটের ডগায়…আগুন থাকে৷ সেই আগুন দিয়ে…ছ্যাঁকা দিয়েছে৷ ছ্যাঁকা৷ তিনবার৷ আরও দিত৷ আমি…আমি…৷’
‘‘‘আমি’’ কী?’ রাহুল ওকে কথা ধরিয়ে দিতে চাইল৷
‘আমি কেউ না৷ আমার…কেউ…নেই৷ মা…নেই৷ বাবা…নেই৷’
কোকো হঠাৎই কেমন উত্তেজিত হয়ে পড়ল৷ বড়-বড় শ্বাস ফেলতে লাগল৷
সেটা লক্ষ করে বাপি বললেন, ‘রাহুল, ওকে এবার রেস্ট নিতে দাও৷ আমার মনে হচ্ছে, ও বেশ ট্রাবলড৷ মেন্টালি আপসেট হয়ে আছে৷ তা ছাড়া ওর বুদ্ধির ব্যাপারটাও বোধহয় স্বাভাবিক নয়৷’
মাম বাপিকে বললেন, ‘ও ক’টা-দিন আমাদের কাছে থাকুক৷ একটু সেরে-টেরে উঠুক—তারপর পুলিশে খবর দিয়ে ওর বাড়ির খোঁজখবর করা যাবে৷ এখন ওকে থানা-পুলিশে দিলে ওকে পাগলদের হোমে পাঠিয়ে দেবে৷’
‘না, না, ওখানে কিছুতেই ওকে পাঠিয়ো না, বাপি!’ রাহুল প্রায় অনুনয়ের সুরে বলল৷
খবরের কাগজ আর টিভি দেখে রাহুল জানে ওই সব সরকারি হোমে আবাসিকদের কী দুরবস্থার মধ্যে রাখা হয়৷ কেউ চরম হেনস্থা সইতে না পেরে আত্মহত্যা করে, আর কেউ-বা ওই হোম থেকে পালিয়ে বাঁচতে চায়৷
বাপি রাহুলের পিঠে আশ্বাসের হাত রেখে বললেন, ‘তুই কি খেপেছিস? ওকে ওই নরকে পাঠাব! ওর বাড়ি আর রিলেটিভদের ঠিকঠাক খবর না পাওয়া পর্যন্ত কোকোকে আমরা ছাড়ছি না৷’
রাহুল বাপির হাতটা জড়িয়ে ধরল৷ ভাবল মনে-মনে, বাপি কী ভালো!
কোকো ধীরে-ধীরে শান্ত হয়ে আসছিল৷ রাহুল ওর দিকে লক্ষ রাখছিল৷ দেখল, ওর শ্বাস-প্রশ্বাস আবার স্বাভাবিক হয়ে আসছে৷ মুখটা যেন চার-পাঁচ বছরের কোনও শিশুর মুখ৷ সেই ফরসা টুকটুকে মুখে সিগারেটের ছ্যাঁকা! মাস্টারজির কাছে কী অন্যায় করেছিল কোকো যে ওকে এমন করে নৃশংসভাবে শাস্তি দিয়েছে? রাহুলের টিচাররা তো রাহুলকে কত ভালোবাসেন৷ ওঁদের সঙ্গে থাকতে রাহুলের কত ভালো লাগে!
কোকো হঠাৎ বলে উঠল, ‘আমি টিভি দেখব৷’
এ-কথায় বাপি আর মাম হেসে উঠলেন৷ বাপি বললেন, ‘হ্যাঁ, ওকে এবার ছেড়ে দাও৷ একটু টিভি-ঠিভি দেখুক—রিল্যাক্স করুক৷ রাহুল—’ রাহুলের কাঁধে হাত রাখলেন বাপি : ‘ওকে নিয়ে টিভি দ্যাখো৷ ওর সঙ্গে থাকো৷ তবে বেশি রাত কোরো না…৷’
কাল রাতে কোকোর সঙ্গে অনেকক্ষণ গল্প করেছে রাহুল৷ ওর সঙ্গে টিভি দেখেছে৷ তারপর কয়েকটা রঙিন কমিকস-এর বই ওকে দেখতে দিয়েছে৷ শেষে ক্লান্ত হয়ে কোকো যখন হাই তুলছিল তখন ওরা শুয়ে পড়েছে৷
রাহুলের ঘরেই মাম কোকোর জন্য বিছানা পেতে দিয়েছিল৷ সেখানে গা এলিয়ে দেওয়ামাত্রই কোকো নিঃসাড়ে ঘুমিয়ে পড়েছে৷ অথচ কোকোর কথা ভেবে-ভেবে রাহুলের ঘুম এসেছে অনেক দেরিতে৷
এখন সেই শিশু-যুবক একগাল খুশি নিয়ে হলদে-কালো প্রজাপতির পিছনে নেচে-নেচে ছুটে বেড়াচ্ছে৷
রাহুলকে কাছে আসতে দেখে কোকো আবার বলে উঠল, ‘রাহুল, এই দ্যাখো…প্রজাপতি৷ প্রজা…পতি৷’
রাহুল হেসে ঘাড় নাড়ল, বলল, ‘হ্যাঁ, প্রজাপতি৷ প্রজাপতি…সুন্দর৷’
‘প্রজাপতি…সুন্দর৷’ রাহুলের কথার প্রতিধ্বনি তুলল কোকো৷
৷৷তিন৷৷
বাজারের থলে নিয়ে বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় বাপি রাহুলকে ডাকলেন৷
রাহুল ওর ঘরে কোকোকে নিয়ে বসেছিল৷ ওর বইপত্র, ক্রিকেটের ব্যাট-বল, এটা-সেটা কোকোকে দেখাচ্ছিল৷ সেই সময় বাপি দরজায় এসে হাজির হলেন৷
‘কী রে, রাহুল—আমার সঙ্গে বাজারে যাবি তো!’
প্রত্যেক রবিবারে রাহুল বাপির সঙ্গে বাজারে যায়৷ এমনিতে বাপির সঙ্গে ঘুরে-ঘুরে বাজার করতে রাহুলের ভালো লাগে৷ তা ছাড়া রবিবারে বাপি একটু বেশি করে বাজার করেন—যাতে পরের তিনদিন বাজারে না গেলেও চলে৷ সেইজন্য রবিবারে বাপি তিনটে থলে নিয়ে বেরোন৷ ফেরার সময় থলেগুলো বেশ ভারীও হয়৷ রাহুল সঙ্গে থাকলে সবচেয়ে কম ওজনের থলেটা বয়ে বাপিকে সাহায্য করে৷
রাহুল কোকোকে ছেড়ে চটপট উঠে পড়ল৷ হাতে তালি দিয়ে হাত ঝেড়ে নিয়ে বলল, ‘চলো, বাপি—’ দরজার দিকে এগোতে-এগোতে কোকোকে লক্ষ করে বলল, ‘কোকো, তুমি এগুলো নিয়ে খেলা করো, আমি বাপির সঙ্গে বাজার করে এক্ষুনি ফিরে আসছি৷’
কোকো কিন্তু ততক্ষণে মেঝে থেকে উঠে পড়েছে৷ রাহুলের দিকে তাকিয়ে কাতর গলায় বলে উঠেছে, ‘আমিও তোমার সঙ্গে যাব৷’
কোকো ওদের সঙ্গে গেলে রাস্তায় পাঁচজন পাঁচকথা জিগ্যেস করবে৷ সে-কথা ভেবেই রাহুল সাততাড়াতাড়ি বলে উঠল, ‘না, কোকো—এরকম জেদ করতে নেই৷ তুমি না গুড বয়?’
‘আমি…গুড…বয়৷ কিন্তু তোমাদের সঙ্গে…বাজারে…যাব৷’ গোমড়া মুখ করে কোকো বলে উঠল৷
বাপি এবার বললেন, ‘না, কোকো৷ গুড বয়রা কথা শোনে৷ তুমি এখানে থাকো—খেলা করো—আমরা এক্ষুনি ফিরে আসব৷’
