রাহুল ছুটে গিয়ে ওর হাত চেপে ধরে বলল, ‘কোকো, তুমি খুব ভালো৷ গুড বয়৷’
কোকো হাসল : ‘আমি…গুড…বয়৷ আমি…গুড…বয়৷’
মাম কোকোর দিকে চেয়ে বিভ্রান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন৷ কী করবেন ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলেন না৷
রাহুল মামের কাছে এল আবার৷ মামের হাত ধরে আবদারের গলায় বলল, ‘মাম, ওকে শিগগির শুকনো জামাকাপড় দাও৷ ওর যে ঠান্ডা লেগে যাবে!’
মাম চমকে উঠে ঘোর কাটিয়ে জেগে উঠলেন৷
বাপিও বললেন, ‘রাহুল ঠিক বলেছে৷ ওকে আগে শুকনো জামা-প্যান্ট দাও৷ রাহুলেরটা ওর গায়ে হবে না—আমার একটা পাজামা আর শার্ট দাও৷ তারপর ওর কাটা জায়গাগুলোয় লাল ওষুধ আর ব্যান্ড-এইড লাগিয়ে দিচ্ছি৷’
রাহুল কৃতজ্ঞতার চোখে বাপির দিকে তাকাল৷
বাপি বললেন, ‘শোন, ওকে আগে ড্রেস-ট্রেস দিয়ে ট্রিটমেন্ট করে কিছু খাওয়াই৷ বোধহয় বেচারা অনেকক্ষণ না খেয়ে আছে৷ তারপর…৷’
রাহুল অবাক চোখে বাপির দিকে তাকিয়ে জিগ্যেস করল, ‘তারপর কী?’
‘তারপর ওকে একটু জিজ্ঞাসাবাদ করতে হবে৷ ওর হিস্ট্রিটা জানার চেষ্টা করতে হবে, বুঝলি?’
রাহুল কী বুঝল কে জানে! কিন্তু ও আলতো করে ঘাড় নাড়ল৷
কোকো রাহুলের দিকে তাকিয়ে মাথা নেড়ে বলল, ‘আমি…গুড… গুড…বয়…৷ ভেরি…গুড…বয়৷’
রাহুল হেসে বলল, ‘ভেরি গুড বয়৷’
সেই ‘ভেরি গুড বয়’ এখন বাপির একটা নীল হাফশার্ট আর পাজামা পরে বাগানে প্রজাপতির পিছনে ছুটছে৷
বাপি কাল রাতেই কোকোর ‘হিস্ট্রি’ জানার চেষ্টা করেছেন৷ যেটা নিয়ে বাপির বিশেষ কৌতূহল ছিল সেটা নিয়েও ওকে প্রশ্ন করেছেন৷ সেই জিনিসটা নিয়ে মাম আর রাহুলেরও ভীষণ কৌতূহল ছিল৷ তাই রাতের খাওয়াদাওয়া শেষ হলে ওরা তিনজনে কোকোকে নিয়ে বসেছে৷
কোকো বসবার ঘরের একটা চেয়ারে হাঁটু মুড়ে বাবু হয়ে বসেছিল৷ ও আরামের শব্দ করে কয়েকবার ঢেঁকুর তুলল৷ রাহুল, বাপি আর মামের মুখের দিকে একবার করে তাকাল৷
রাহুলরা তিনজন কোকোকে প্রায় ঘিরে বসেছিল৷ ওকে কিছুক্ষণ লক্ষ করার পর বাপি জিগ্যেস করলেন, ‘কোকো, তোমার গলায় ওটা কীসের ব্যান্ড?’
কোকো কোনও জবাব দিল না৷ ওর ডানহাতটা গলার কাছে চলে গেল৷ স্টিলের ব্যান্ডটার ওপরে ও আঙুল বোলাতে লাগল৷
বাপি আবার জিগ্যেস করলেন, ‘ওটা কীসের বেল্ট, কোকো? বলো—কোনও ভয় নেই৷ তুমি তো গুড বয়৷’
অল্প হাসল কোকো৷ অস্পষ্টভাবে বলল, ‘আমি তো…গুড বয়৷’
এবার রাহুল ওকে জিগ্যেস করল, তোমার গলার এই ব্যান্ডটা কীসের, কোকো?’
কোকো তেরছা চোখে সিলিং-এর দিকে তাকাল৷ একমনে কী যেন ভাবার চেষ্টা করল কিছুক্ষণ৷ তারপর হঠাৎ খুশির সুরে বলে উঠল, ‘মনে…পড়েছে৷ এটা কন্ট্রোল…ব্যান্ড৷ আমি..গুড…বয়৷’
কন্ট্রোল ব্যান্ড! কীসের কন্ট্রোল ব্যান্ড? রাহুল অবাক চোখে কোকোর গলার ব্যান্ডটার দিকে তাকিয়ে রইল৷
জিনিসটা চেহারায় অনেকটা ঘড়ির ব্যান্ডের মতো৷ তবে মসৃণ গোল নয়৷ চার জায়গায় কবজার জোড় রয়েছে৷ আর ব্যান্ডটার ডানদিকে—মানে, কোকোর বাঁ-কানের ঠিক নীচে—একটা চ্যাপটা চৌকোনা মেটাল বক্স লাগানো রয়েছে৷ বক্সটার মাপ অনেকটা দেশলাইয়ের বাক্সের মতো৷ তবে মাত্র পাঁচ কি ছ’মিলিমিটার পুরু৷ সেই বাক্সের ওপরে চারটে খুদে এল. ই. ডি. ল্যাম্প৷ এখন নিভে আছে৷
‘এই কন্ট্রোল ব্যান্ডটা তুমি কী জন্যে গলায় পরে আছ?’ রাহুল জিগ্যেস করল, ‘কে তোমার গলায় এটা পরিয়ে দিয়েছে?’
আবার চিন্তায় পড়ে গেল কোকো৷ কিছুক্ষণ চিন্তা করার পর বলল, ‘মনে পড়েছে৷ এটা মাস্টারজি…পরিয়ে…দিয়েছে৷ মাস্টারজি…দিয়েছে৷’
‘কে মাস্টারজি?’ মাম জিগ্যেস করলেন৷
কোকো একগাল হেসে বলল, ‘মাস্টারজি৷ মাস্টারজি৷’
বাপি আর রাহুলও বারকয়েক একই প্রশ্ন করল কিন্তু কোকোর সেই একই উত্তর৷
তখন বাপি জিগ্যেস করলেন, ‘এটা তুমি গলায় পরেছ কেন?’
কোকো দু-পাশে মাথা নাড়ল৷ ও জানে না৷
‘এটার নাম কন্ট্রোল ব্যান্ড কে বলল?’
‘মাস্টারজি—’
‘মাস্টারজির নাম কী?’
‘মাস্টারজি৷’
‘মাস্টারজি কোথায় থাকেন?’
‘অনেক…দূরে৷ অনেক…দূরে৷’
বাপি কী মনে করে কোকোর গলার ব্যান্ডটার দিকে হাত বাড়ালেন : ‘তোমার ব্যান্ডটা একটু দেখি তো…৷’
সঙ্গে-সঙ্গে সাপের ছোবল খাওয়া মানুষের মতো পিছনে ছিটকে গেল কোকো৷ ভয় পাওয়া চোখে বাপির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘না…না৷ এটায়…কেউ…হাত দেবে না৷ মাস্টারজির বারণ৷’
‘মাস্টারজির বারণ’ শব্দ দুটো বারবার আওড়াতে লাগল কোকো৷ ঠিক যেন পুজোর মন্ত্র পড়ছে৷
বাপি, মাম, আর রাহুল চোখ চাওয়াচাওয়ি করল৷ মাম চাপা গলায় বাপিকে বললেন, ‘ছেড়ে দাও৷ মনে হয় ব্যান্ডটা নিয়ে ওর কোনও মেন্টাল প্রবলেম আছে৷ পরে কখনও সুযোগ পেলে ওটা দেখো…৷’
বাপি একটা লম্বা শ্বাস ফেলে সায় দিয়ে মাথা নাড়লেন৷
রাহুল কোকোর হাত-পায়ে লাগানো ব্যান্ড-এইডগুলোর দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল, ‘তোমার হাতে-পায়ে কেটে গেল কী করে?’
রাহুলের কথায় আবার সোজা হয়ে বসল কোকো৷ পায়ের ভাঁজ খুলে মেঝের দিকে পা ঝুলিয়ে দিল৷ তারপর অবাক হয়ে নিজের হাতে আর পায়ে লাগানো ব্যান্ড-এইডগুলোর দিকে দেখল, সেগুলোর ওপরে আঙুল বোলাল৷ কিন্তু কোনও উত্তর দিল না৷
কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর রাহুল আবার একই প্রশ্ন করল৷
রাহুলের দিকে সরল চোখে তাকাল কোকো৷ ধীরে-ধীরে বলল, ‘মাস্টারজি মেরেছে৷ খুব…মেরেছে৷’
