ইট-পাতা পথ ধরে এগোতে-এগোতেই রাহুল চেঁচিয়ে মা-কে ডাকল, ‘মাম, শিগগির দরজা খোল৷ একেবারে ভিজে গেছি৷’
বাড়ির দরজায় পৌঁছে মা-কে আরও একবার ডাকল রাহুল৷ একইসঙ্গে কলিংবেল টিপল৷
দরজা খুলে গেল৷ মা দরজায় দাঁড়িয়ে৷ ওকে দেখেই চেঁচিয়ে বলে উঠলেন, ‘ঠিক জানতাম আজ তুই বৃষ্টিতে ভিজবি৷ তোর বাপিকে বলছিলাম…’ মায়ের কথা মাঝপথেই থেমে গেল, কারণ কোকোকে তিনি এইমাত্র খেয়াল করেছেন৷
রাহুলের মা গলা নামিয়ে ছেলেকে জিগ্যেস করলেন, ‘এ কাকে সঙ্গে এনেছিস?’
রাহুল বলল, ‘মাম, ওর নাম কোকো৷ ওর খুব বিপদ৷ ঘিয়ার পাড়ে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিল…৷’
৷৷দুই৷৷
পরদিনটা ছিল রবিবার৷ রবিবারটা সবসময়েই রাহুলের কাছে কেমন যেন অন্যরকম দিন বলে মনে হয়৷ সেদিন সকালে যে-সূর্যটা ওঠে সেটা অন্যরকম৷ সকালে যে-পাখিগুলো ডাকে তাদের ডাকগুলো আলাদা৷ ওদের বাগানে যে-ফুলগুলো ফোটে রবিবার তাদের একটু বেশি হাসিখুশি বলে মনে হয়৷
আজ সকালে ঘুম থেকে উঠে রাহুল সেই ‘অন্যরকম’ সকালটাকে অনুভব করল৷ তারপরই ওর মনে পড়ে গেল কোকোর কথা৷
জানলা দিয়ে আকাশ দেখল রাহুল৷ ছেঁড়া-ছেঁড়া ছাই-রঙা মেঘ৷ তার ফাঁক দিয়ে সূর্যের আলো ভোরের খবর পাঠাচ্ছে পৃথিবীতে৷ গাছের চকচকে সবুজ পাতায় সেই আলো ঠিকরে যাচ্ছে৷ কাল সন্ধের বৃষ্টিতে পাতাগুলো স্নান-টান সেরে আজ একেবারে ঝক-ঝকে হয়ে সেজে উঠেছে৷ তারই ফাঁকে-ফাঁকে ভেসে বেড়াচ্ছে পাখির ডাক৷
আজ সকালটাকে দেখে মনেই হয় না কাল সন্ধেয় ওরকম ঝড়-বৃষ্টি হয়েছিল৷
বিছানা ছেড়ে বাইরের বারান্দায় এসে দাঁড়াল রাহুল৷ আর তখনই কোকোকে দেখতে পেল৷
বারান্দার ডানদিকে ফুলের বাগান৷ সেখানে অনেকগুলো সূর্যমুখী ফুলের গাছ৷ এখন দু-চারটে ফুল ফুটেছে—বাকি সব কুঁড়ি৷ তার পাশেই কয়েকটা বেলফুল আর গোলাপের গাছ৷ তাতে সাদা আর গোলাপি ফুল৷ নাকে না হলেও মনে-মনে ফুলের গন্ধ পেল রাহুল৷ নাক টেনে চোখ বুজল ও৷
চোখ খুলতেই কোকোকে দেখতে পেল৷ একটা জামগাছের আড়াল থেকে ছুটে বেরিয়ে এল৷ তারপর অদ্ভুত ভঙ্গিতে নেচে-নেচে ছুটে বেড়াতে লাগল আর একই সঙ্গে হাততালি দিতে লাগল৷
ভালো করে খেয়াল করতেই রাহুল একটা হলদে-কালো প্রজাপতিকে দেখতে পেল৷ প্রজাপতিটা ফুলের বাগানে এলোমেলো উড়ে বেড়াচ্ছে আর কোকো তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে ওটার পিছন-পিছন ছুটছে৷
না, প্রজাপতিটা ধরার জন্য ও মোটেই ছুটছে না৷ বরং এক বিচিত্র উল্লাসে লাফিয়ে-ঝাঁপিয়ে ওটাকে অনুসরণ করছে৷
সাতাশ-আটাশ বছরের ছেলেটাকে একটা বাচ্চা ছেলে বলে মনে হল রাহুলের৷ সরল ভোলাভালা চোখ, শরীরের কাটা-ছেঁড়া সম্পর্কে উদাসীন, কোথা থেকে ও এসেছে, কোথায় যাবে, সে-সম্পর্কে ওর চিত্ত ভাবনাহীন৷
বারান্দার গ্রিলের দরজা ঠেলে সরিয়ে দু-ধাপ সিঁড়ি নামল রাহুল৷ পায়ে-পায়ে বাগানের দিকে এগোল৷
বাগানের মাটি ভেজা৷ কোথাও-কোথাও কাদা প্যাচপেচে হয়ে আছে৷
ফুলগাছগুলোর দিকে তাকাল রাহুল৷ হলদে-কালো প্রজাপতিটা ছাড়াও কয়েকটা ফড়িং ওড়াউড়ি করছে সেখানে৷ কিন্তু কোকোর যত আগ্রহ প্রজাপতিটাকে নিয়ে৷
রাহুলকে দেখতে পেয়েই খুশিতে উজ্জ্বল হল কোকোর মুখ৷ ও চেঁচিয়ে বলল, ‘এই…দ্যাখো৷ প্রজা…পতি৷ হলুদ…আর…কালো৷ প্রজা…পতি৷’
একইরকম কর্কশ স্বর আর টেনে-টেনে কথা বলা৷ যেন ঠান্ডা লেগে বরাবরের জন্য গলা ভেঙে গেছে৷
কোকোর উৎসাহ, খুশি, আর কথা বলার ঢং রাহুলের সমবয়েসি কোনও বন্ধুর মতন৷ কাল সন্ধে থেকেই ব্যাপারটা রাহুল লক্ষ করেছে৷ তাতে ও বেশ মজাও পেয়েছে৷
প্রথমটায় কোকোকে দেখে রাহুলের মাম আর বাপি খুব অবাক হয়েছিলেন৷ কোকোকে বাইরের ঘরে বসিয়ে ভেতরের ঘরে রাহুলকে ডেকে নিয়ে মাম ওকে অনেক প্রশ্নও করেছেন৷
সেসব কথা শুনতে পেয়ে বাড়ির ভেতর থেকে বাপিও সেখানে এসে হাজির হয়েছেন৷ দুজনের প্রশ্নের ঠেলায় রাহুলের তো অবস্থা কাহিল!
বাপি বললেন, ‘বোঝোই তো…দিন-কাল ভীষণ খারাপ৷ ওকে তুমি চেনো না, জানো না…৷’
সেইসঙ্গে মাম যোগ করলেন : ‘তা ছাড়া ওর গায়ে অত জায়গায় কাটা…রক্ত পড়ছে৷ কে জানে খুন-টুন করে পালিয়ে এসেছে কি না৷ তারপর থানা-পুলিশ হয়ে একেবারে কেলেংকারি হবে৷’
রাহুল অবাক হয়ে বলল, ‘তা হলে কোকো এখন কোথায় যাবে, মাম? ওর তো কেউ নেই! ও মনে হয় ঘিয়ার জলে ভেসে এসেছে৷ বললাম তো, ভিজে জামাকাপড়ে একটা গাছের তলায় অজ্ঞান হয়ে পড়েছিল…৷’
বাপি কপালে ভাঁজ ফেলে বললেন, ‘কাল থেকে সবাই তো ওর কথা জিগ্যেস করবে৷ তখন কী জবাব দেব?’
‘কেন বাপি, যা সত্যি তাই বলবে!’ রাহুল সঙ্গে-সঙ্গে সমাধান জুগিয়ে দিল, ‘কোকো আমাদের কাছে থাকলে তাতে কার কী!’
‘এভাবে বলতে নেই, রাহুল৷’ মাম ওকে শাসনের গলায় বললেন, ‘তা ছাড়া তুমি তো জানো, এখন চার-পাশে যা চলছে তাতে কোনও অচেনা লোককে এভাবে শেলটার দেওয়া ঠিক নয়৷ কে বলতে পারে যে, লোকটা চোর কিংবা ডাকাত নয়! কাল বরং থানায়…৷’
‘আমি…চোর…না৷ আমি…ভালো৷’
এ-কথা শুনে তিনজনেই চমকে ঘুরে তাকিয়েছে৷
কোকো বাইরের ঘর ছেড়ে কখন যেন ঢুকে পড়েছে ভেতরের ঘরে৷ তারপর ওর ভাঙা গলায় নিজের ক্যারেকটার সার্টিফিকেট নিজেই প্রচার করে চলেছে৷
‘বিশ্বাস…করো৷ আমি…চোর…না৷ আমি…খুব…ভালো৷’
ভ্যাবাচ্যাকা খাওয়া সরল ছেলেটার মুখে এ-কথা শুনে বাপি হেসে ফেললেন৷
