এর মধ্যেই ঝড় কিছুটা কমে গেছে৷ বৃষ্টি একটু জোরালো হয়েছে৷ গাছের পাতার খসখসানি শব্দও খানিকটা স্তিমিত৷ ওরা তখনও লোকটাকে জাগানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল৷
হয়তো বৃষ্টির জল মুখে পড়ার জন্যই হঠাৎ লোকটা চোখ খুলে তাকাল৷ চারটে মুখ ওর ওপরে ঝুঁকে রয়েছে দেখে ভয়ের একটা চাপা চিৎকার করে উঠল৷
নিধু ওকে আশ্বাস দিয়ে বলল, ‘ভয় পেয়ো না৷ কোনও ভয় নেই৷’
দীপায়ন জিগ্যেস করল, ‘তুমি কে? নদীর পাড়ে এখানে কোত্থেকে এলে?’
লোকটা ভয়ের চোখে ওদের মুখগুলোর ওপরে একবার নজর বুলিয়ে নিল৷ তারপর ডানহাতটা শূন্যে তুলে নদীর দিকে দেখাল৷ যেদিক থেকে ঘিয়া নদী বয়ে আসছে সেদিকে৷ রাহুল লক্ষ করল, লোকটার হাত কাঁপছে৷
রাহুল তাকাল নদীর উজানের দিকে৷ তা হলে কি লোকটা নদীর জলে ভেসে এসেছে?
রাহুল জিগ্যেস করল, ‘আপনি কোথায় যাবেন?’
লোকটা সরল চোখে ফ্যালফ্যাল করে তাকাল রাহুলের দিকে৷ তারপর দু-হাতের আঙুল এমনভাবে ঘোরাল যার মানে কোথায় যাবে ও জানে না৷
‘তোমার বাড়ি কোথায়?’ গোপাল জানতে চাইল৷
লোকটা কোনও উত্তর দিল না৷ শূন্য চোখে গোপালের দিকে তাকিয়ে রইল৷
‘আপনার সঙ্গে আর কেউ আছে?’ রাহুল জিগ্যেস করল৷
ভাঙা কর্কশ গলায় লোকটা টেনে-টেনে জবাব দিল, ‘কেউ…নেই৷’ মনে হচ্ছিল ওর কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে৷
রাহুল কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল কিন্তু তার আগেই লোকটা একটা অদ্ভুত কাণ্ড করল৷
‘কেউ…নেই৷ কেউ…নেই৷’ বলতে লাগল বারবার এবং হাউহাউ করে কাঁদতে শুরু করল৷ রাহুলের পায়ের ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ল৷ পাগলের মতো পায়ে মাথা ঘষতে লাগল আর কাঁদতে লাগল৷
রাহুল কোনওরকমে এক পা পিছিয়ে এল৷ সবাই মিলে ধরাধরি করে ওকে দাঁড় করাল৷ লোকটা তখনও মুখ বিকৃত করে কাঁদছে৷ গুঙিয়ে-গুঙিয়ে কী বলছে কিছু বোঝা যাচ্ছে না৷
রাহুল অবাক হয়ে লোকটার সরল কান্না-ভেজা মুখের দিকে তাকিয়ে রইল৷
দীপায়ন, নিধু আর গোপাল তখন নিজেদের মধ্যে কথাবলাবলি করতে লাগল৷
কী করা যায় লোকটাকে নিয়ে?
কেউ বলল, ‘ছাড় তো৷ ও এখানেই পড়ে থাক৷ পরে যেখানে যায় যাবে৷’
একজন বলল, ‘চল, আমরা গিয়ে থানায় খবর দিই…৷’
আর-একজন বলল, ‘দাদাদের ক্লাবে নিয়ে গিয়ে ছেড়ে দিলে হত৷’
‘না, তার চেয়ে বরং পার্টি অফিসে নিয়ে চল৷ ওরা থানা-পুলিশ যা করার করবে৷’
বৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ এরকম এলোমেলো কথাবার্তা শোনার পর রাহুল ফস করে বলে উঠল, ‘আমি ওকে বাড়িতে নিয়ে যাব৷’
সঙ্গে-সঙ্গে নিধু, গোপাল আর দীপায়ন চুপ করে গেল৷ ওরা এমন চোখে রাহুলের দিকে তাকাল যেন রাহুলের মাথা খারাপ হয়ে গেছে৷
রাহুল ভ্যাবাচ্যাকা খাওয়া আহত লোকটার দিকে তাকাল৷ হাত বাড়াল ওর দিকে৷ সঙ্গে-সঙ্গে লোকটা এমনভাবে ওর হাতটা আঁকড়ে ধরল যেন এটা ছেড়ে দিলে ও আর বাঁচবে না৷ ভয়ের চোখে রাহুলের দিকে তাকাল৷
রাহুল চাপা গলায় ওকে বলল, ‘কোনও ভয় নেই৷’
নিধু, গোপাল আর দীপায়নের সঙ্গে তর্ক করতে-করতে রাহুল এগোল৷ ওর হাত আঁকড়ে ধরে মাথা নীচু করে লোকটাও এগোল৷
বৃষ্টি আরও বেড়ে গেছে৷ ওদের জামাকাপড় ভিজে যাচ্ছে৷ গাছের পাতায় বৃষ্টির ফোঁটা পড়ার শব্দ হচ্ছে৷ ভেজা মাটি থেকে বৃষ্টির অদ্ভুত গন্ধ উঠছে৷
দীপায়নদের নানান উপদেশ আর খোঁচার জবাবে রাহুল বলল, ‘আজ রাতটা তো ও আমাদের বাড়িতে থাক৷ কাল সকালে বাপি যা করার করবে…৷’
কাঁচা রাস্তায় বৃষ্টির জল পড়ে কাদা তৈরি হচ্ছিল৷ তার ওপরে ওরা ছপছপ শব্দে পা ফেলে এগোচ্ছিল৷ খালি পায়ে চলার জন্য লোকটার বেশ অসুবিধে হচ্ছিল৷ কারণ, পথের নানা জায়গায় ইট-পাথরের টুকরো, গাছের ভাঙা ডাল মাড়িয়ে চলতে হচ্ছিল৷ কিন্তু লোকটা মুখে টুঁ শব্দটিও করছিল না৷ সরল মুখে মাথা নীচু করে হাঁটছিল৷
একটা পুকুরের কাছে এসে রাহুলের পথ আলাদা হয়ে গেল৷ ও লোকটাকে নিয়ে বাড়ির পথ ধরল৷ গোপালদের বলল যে, কাল কী হয় না হয় সেটা কাল ওদের জানাবে৷
রাহুল বৃষ্টিতে বেশ ভিজে গেছে৷ ও বাঁ-হাতের পাতা কপালের সামনে গাড়িবারান্দার মতো রেখে বৃষ্টির ছাট আটকাতে চেষ্টা করছিল৷ লক্ষ করল, এতটা পথ আসার সময় লোকটা একবারও বৃষ্টি আড়াল করার চেষ্টা করেনি৷ বরং এমনভাবে ও পথ চলছে যেন বৃষ্টি পড়ছেই না৷
রাহুল হঠাৎই ওকে জিগ্যেস করল, ‘তোমার নাম কী?’
লোকটা ওর দিকে মুখ ফিরিয়ে তাকাল৷ ভাবলেশহীন নিষ্পাপ মুখ৷ কোনও উত্তর দিল না৷
রাহুল আবার একই কথা জিগ্যেস করল৷
কোনও উত্তর নেই৷
তবে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে রাহুলের মনে হল, ও যেন তীব্রভাবে কিছু একটা ভাবার চেষ্টা করছে৷ হয়তো ওর নামটাই মনে করার চেষ্টা করছে৷
রাহুল হাল ছাড়ল না৷ তৃতীয়বার ওর নাম জানতে চাইল৷
এবার লোকটা ভাঙা কর্কশ গলায় টেনে-টেনে জবাব দিল, ‘কোকো৷ আমার নাম কোকো৷ কো-কো…৷’
কোকো! কী অদ্ভুত নাম! আপন-মনেই ভাবল রাহুল৷
কালচে আকাশে বিদ্যুৎ ঝলসে উঠল৷ তারপরই প্রচণ্ড শব্দে বাজ পড়ল৷
বাড়ির সামনে এসে গিয়েছিল রাহুল৷ বাউন্ডারির গ্রিলের গেটের হুড়কো খুলে ভেতরে ঢুকল৷ ওর হাত আঁকড়ে থাকা কোকোও ঢুকে পড়ল ওর সঙ্গে৷
বাউন্ডারির গেট থেকে ইট-পাতা পথ চলে গেছে একতলা বাড়িটা পর্যন্ত৷ বাড়ির বাঁ-দিকটায় বেশ কয়েকটা গাছপালা৷ অযত্নে বেড়ে ওঠা বাগান৷ তার একটা ছোট অংশে অনেক ফুলগাছ৷ আর তার পাশে একটা টিউবওয়েল৷
