তিনমাইলের ফুটবল খেলায় রাহুলরা কোনও দলের সাপোর্টার ছিল না৷ স্রেফ ফুটবল খেলার নেশাতেই ওরা চারজন ফাইনাল ম্যাচ দেখতে গিয়েছিল৷ ম্যাচ শেষ করে ফেরার সময় আকাশের অবস্থা ঠিক যেন বৃষ্টি হব-হব৷ তাই কখনও হেঁটে কখনও ছুটে ওরা মণিমেলার দিকে ফিরছিল৷
একটু পরেই ওরা ঘিয়া নদীর পাড়ে পৌঁছে গেল৷ এবার নদী পেরোলেই মণিমেলা৷ উঁচু পাড় থেকে মাটির ঢাল জলের দিকে নেমে গেছে৷ নদীতে জল এখন বেশি নেই৷ গত দু-সপ্তাহে দু-তিনদিন বৃষ্টি হলেও বর্ষা সেরকমভাবে এখনও শুরু হয়নি৷ তাই ঘিয়া এখন শান্ত, নিরীহ৷ বর্ষার দাপটে এই শান্তশিষ্ট নদীটার রূপ বদলে যায়৷ তখন ঘিয়ার এত স্রোত থাকে যে, সাঁতরে এপার-ওপার করতেও ভয় হয়৷
রাহুলরা নদীর পাড়ে যেখানটায় এসে দাঁড়াল সেখানে কোনও ব্রিজ নেই৷ তবে খেয়া পারাপারের ব্যবস্থা আছে৷ ছোট ডিঙিনৌকো—বড়জোর দশ-বারোজন দাঁড়াতে পারে৷ খেয়া পার হয়ে গেলে রাহুলদের বাড়িটা কাছাকাছি হয়৷ ব্রিজ দিয়ে ঘিয়া পেরোতে হলে অনেকটা ঘুরপথ হয়ে যায়৷
রাহুল-গোপালরা সবাই সাঁতার জানে৷ তাই বেশ সহজভাবে ওরা নৌকোর ওপরে দাঁড়িয়ে ছিল আর ফাইনাল খেলা নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছিল৷
কথা বলতে-বলতে রাহুল বারবার আকাশের দিকে তাকাচ্ছিল৷ যদি বৃষ্টি নামে তা হলে আর রক্ষে নেই৷ না, বৃষ্টিতে ভেজার ভয় ও করছে না৷ আসলে স্কুল-লাইব্রেরির দুটো গল্পের বই ও টেবিলের খোলা জানলার কাছে রেখে এসেছে৷ ওগুলো যদি ভিজে যায়!
ঘিয়া পার হয়ে ওরা চারজন নদীর পাড় বেয়ে উঠতে শুরু করল৷ ঠিক তখনই আচমকা ঝড় উঠল৷ ঠান্ডা বাতাস ওদের ঘিরে পাক খেতে লাগল আর কালো আকাশ থেকে কয়েক ফোঁটা বৃষ্টি টপাটপ করে পড়তে শুরু করল৷
নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা বেশ কয়েকটা বড়-বড় গাছ ঝোড়ো বাতাসে হেলে পড়েছিল৷ ওদের ডালপালা-পাতা পতাকার মতো উড়ছিল৷
চোখে হাত চাপা দিয়ে রাহুল ধুলো আটকাচ্ছিল৷ সেই অবস্থায় পা হড়কে গিয়ে ও বেশ খানিকটা পিছিয়ে পড়ল৷ ততক্ষণে নিধু, গোপাল আর দীপায়ন নদীর ঢাল পেরিয়ে ওপরের কাঁচা রাস্তায় উঠে পড়েছে৷
নিধু একবার চেঁচিয়ে রাহুলকে ডাকল, ‘জলদি আয়৷ এখুনি জোরে বৃষ্টি আসবে…৷’
সেই চেষ্টাই করছিল রাহুল৷ এছাড়া খোলা জানলার কাছাকাছি রাখা বইগুলো ভিজে যাবে, এই ব্যাপারটাও মাথায় ছিল৷ তাই আরও জোরে পা চালাল৷ আর ঠিক সেই সময়েই সীসের মতো আকাশে নীলচে সাদা বিদ্যুৎ ঝলসে উঠল৷ পলকের জন্য চারপাশটা আলোয় আলো হয়ে গেল৷ আর তখনই লোকটাকে দেখতে পেল ও৷ সঙ্গে-সঙ্গে বিকট শব্দে বাজ পড়ল৷
নদীর পাড়ে দাঁড়ানো ঝুরি-নামা একটা বটগাছের নীচে পড়ে আছে একটা মানুষ৷ রাহুলের কাছ থেকে প্রায় কুড়ি-পঁচিশ ফুট দূরে৷ এই মেঘলা কমজোরি আলোয় লোকটাকে হয়তো চোখেই পড়ত না যদি না ওর শরীর থেকে চকচকে কিছু একটা বিদ্যুতের আলোয় ঝিলিক মেরে উঠত৷
রাহুলের পথ বেঁকে গেল৷ ও পায়ে-পায়ে এগিয়ে গেল লোকটার কাছে৷ ওর ওপরে ঝুঁকে পড়ল৷
বৃষ্টি এখনও না পড়ার মতন, অথচ মানুষটার জামা-প্যান্ট সব জলে ভিজে সপসপে৷ পায়ে জুতো নেই৷ গায়ের রং ফরসা৷ তাই শরীরের কাটা দাগগুলো স্পষ্ট চোখে পড়ছে৷ ছুরির ডগা দিয়ে কেউ যেন ওর হাত-পায়ে দাগ কেটেছে৷ সেই চেরা জায়গাগুলো থেকে রক্ত চুঁইয়ে পড়ছে৷
পাশ ফিরে মাটির দিকে মুখ ঘুরিয়ে অসাড়ভাবে পড়ে আছে লোকটা৷ বেঁচে আছে না মরে গেছে বোঝার উপায় নেই৷
যে-জিনিসটা বিদ্যুতের আলোয় ঝিলিক মেরে উঠেছিল এবার সেটার দিকে তাকাল রাহুল৷ গলায় আটকানো একটা মেটাল ব্যান্ড৷ অনেকটা কুকুরের বকলসের মতো৷ এক কি দেড় সেন্টিমিটার চওড়া৷
রাহুলের একবার মনে হল, লোকটা কি নেশা করে পড়ে আছে? আবার মনে হল, লোকটা ঘিয়া নদীর জলে ভেসে আসেনি তো? ও ঝুঁকে পড়ে লোকটাকে ডাকল : ‘এই যে, শুনছেন! এই যে—৷’
কোনও সাড়া নেই৷
লোকটা কি মরে গেছে? নাকি অজ্ঞান হয়ে গেছে?
কয়েক সেকেন্ড অপেক্ষা করে মরিয়া হয়ে লোকটাকে ঠেলা মারল রাহুল : ‘এই যে, শুনছেন!’
না, কোনও সাড়া নেই৷ শুধু বাতাসের সোঁ-সোঁ শব্দ আর গাছের পাতার ছটফটানির আওয়াজ৷
এদিকে রাহুলকে পিছনে দেখতে না পেয়ে নিধু-গোপালরা ফিরে আসছিল৷ রাহুলের নাম ধরে বারবার ডাকছিল৷
দু-হাতে লোকটার ডানকাঁধ ধরে টান মারল রাহুল৷ লোকটার শরীরটা আধপাক ঘুরে চিত হয়ে গেল৷
লোকটাকে ভালো করে দেখল রাহুল৷
বয়েস কত হবে, বড়জোর সাতাশ-আটাশ৷ মাথায় কদমছাঁট চুল৷ ছোট-ছোট চোখ৷ নাকটা সামান্য থ্যাবড়া৷ ঠোঁটজোড়া একটু ফাঁক হয়ে থাকায় দাঁত দেখা যাচ্ছিল৷
রাহুল লক্ষ করল, লোকটার দু-গালে নতুন দশ পয়সার মাপের তিনটে কালচে গোল দাগ৷ কেউ যেন কড়ে আঙুল দিয়ে কাজলের টিপ পরিয়ে দিয়েছে৷
লোকটার মুখে বৃষ্টির ফোঁটা পড়ছিল৷ একইসঙ্গে রাহুল ওকে ধাক্কা দিচ্ছিল, ডাকাডাকি করছিল৷
এমন সময় গোপালরা রাহুলের কাছে পৌঁছে গেল৷ লোকটাকে দেখে ওরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা শুরু করে দিল, তর্ক জুড়ে দিল৷ আর লোকটার হাত ধরে ঝাঁকুনি দিতে লাগল৷ থুতনি ধরে এপাশ-ওপাশ নাড়তে লাগল৷ বুকে হাত দিয়ে পরীক্ষা করতে লাগল৷
ওরা এটুকু বুঝল, জামা-প্যান্ট ভিজে থাকলেও লোকটার শরীরে তাপ আছে৷ বুকে কান পেতে ধরলে ধুকপুকুনি দিব্যি টের পাওয়া যাচ্ছে৷ লোকটা যে বেঁচে আছে তাদে কোনও সন্দেহ নেই৷ কিন্তু ওর শরীরের কাটা দাগগুলো এল কেমন করে? আর ওর গলার মেটাল ব্যান্ডটাই বা কী?
