বোধহয় অন্ধকারে ঢাকা কোনও জুতসই ডালে রবিনা পা দুটো আঁকশির মতো আটকে রেখেছেন৷
রবিনার শরীর থেকে একটা নীলচে আভা বেরোচ্ছে৷ সেই আভার জন্যই ওঁকে দেখা যাচ্ছে, কিন্তু উলটো হয়ে থাকার জন্য স্পষ্টভাবে চেনা যাচ্ছে না৷
রবিনার গাল বসে গিয়ে চোয়ালটা সামনে বেরিয়ে এসেছে৷ চোখ দুটো অন্ধকার কৃষ্ণগহ্বর৷ আর তার কেন্দ্রে সার্চলাইটের মতো উজ্জ্বল সাদা আলোর বিন্দু৷
‘তেষ্টায় আমার বুক ফেটে যাচ্ছে রে…অসম্ভব পাগল করা তেষ্টা৷’ গাছের গায়ে উলটো হয়ে ঝুলে থাকা পিশাচটা বলল, ‘সেদিন রনিতাদি কী যে কামড় বসাল ঘাড়ে, তারপর থেকেই যত অশান্তি আর ভোগান্তির শুরু৷ তোরা তো আর বুঝবি না, পূর্ণিমার তেষ্টা কী জিনিস! আয়, তোরা কাছে আয়…আয়…৷’
এইসব কথা বলার সঙ্গে-সঙ্গে রবিনার শরীরটা পেন্ডুলামের মতো অল্প-অল্প দুলতে লাগল৷ ঠিক যেন হাওয়ায় দুলছে৷ আর ওঁর মুখটা হাঁ হয়ে গেল৷
ইস্পাতের দাঁতের পাটি দেখা গেল৷ তার ফাঁক দিয়ে একটা লম্বা কালো জিভ সাপের মতো সড়সড় করে বেরিয়ে এল৷ ঝুলে পড়ল নীচের দিকে৷ তারপর সেই দেড়ফুট লম্বা জিভটা নড়তে লাগল, দুলতে লাগল৷
পিশাচটার চোখের দৃষ্টিতে বোধহয় সম্মোহন ছিল৷ কারণ, ইলিনা আর সজনী উলটোভাবে ঝুলে থাকা রবিনার নীল আলো মাখা দেহের দিকে এগিয়ে যেতে চাইল৷
অনুষ্কা ওদের হাত ধরে টেনে আটকে রাখল৷ চিৎকার করে বলল, ‘যেয়ো না—এখানে চুপ করে দাঁড়াও! যেয়ো না! আমার কথা শোনো—!’
হঠাৎই দারচিনির গন্ধে বাতাস মিষ্টি হয়ে গেল৷ এক ঝটকায় ইলিনা আর সজনীকে ছিটকে ফেলে দিল অনুষ্কা৷ তারপর ওর ডানহাত চোখের পলকে লম্বা হয়ে ছোবল মারল রবিনা ম্যাডামের গলায়৷ এবং একটানে পিশাচটাকে গাছ থেকে ছাড়িয়ে নিল৷
ইলিনা আর সজনী মাটিতে লুটিয়ে পড়ে ওদের বন্ধুর অলৌকিক কাণ্ডকারখানা দেখছিল৷ মনে হচ্ছিল, ওদের চোখের সামনে যা-যা ঘটে চলেছে সেগুলো বাস্তব নয়, একটা গাঁজাখুরি সিনেমা৷
সেই ‘সিনেমা’-য় অনুষ্কার হাতের ইস্পাতের কাঁটাগুলো পিশাচটার গলায় আমূল গেঁথে গেল৷ ওর হাতের টানে পিশাচটা রবারের সুতোয় বাঁধা বলের মতো ছিটকে চলে এল অনুষ্কার কাছে৷
পিশাচটা যন্ত্রণার হাহাকার তুলছিল৷ মাথাটা এপাশ-ওপাশ নাড়ছিল৷ অনুষ্কা বাঁ-হাতে খপ করে পিশাচটার নাক টিপে ধরল৷ সঙ্গে-সঙ্গে শুরু হল পিশাচটার মরণ গোঙানি৷ বারবার হাঁ করে বাতাস নিতে চাইল৷
একটু পরেই ওটার সব লড়াই শেষ হয়ে গেল৷ সব তেষ্টা মিটে গেল৷
অনুষ্কা ছেড়ে দিতেই ওটা এক টুকরো কাঠের মতো খসে পড়ে গেল মাটিতে৷
অনুষ্কার ডানহাতটা আবার স্বাভাবিক হয়ে গেল৷ ও এতক্ষণ যেন একটা ঘোরের মধ্যে ছিল৷ ঘোর কেটে যেতেই ওর বন্ধুদের কথা মনে পড়ল৷ ও ফিরে তাকাল ইলিনার দিকে, সজনীর দিকে৷ ওদের বিপদে কাজে লাগতে পেরে মনটা ভীষণ ভালো লাগছে৷ এই ভালো লাগা আগে কখনও ও টের পায়নি৷
অনুষ্কা ইলিনাকে তুলে ধরল৷ তারপর ওকে বুকে জড়িয়ে নিল : ‘শিগগির চলো, তোমাকে ডাক্তার দেখাতে হবে…৷’
সজনী নিজে থেকেই উঠে দাঁড়িয়েছিল৷ ও অনুষ্কার কাছে এসে ওর হাত ধরল৷ চাপা গলায় বলল, ‘থ্যাংক য়ু—৷’
ইলিনাও অনুষ্কার কানে-কানে ফিসফিস করে বলল, ‘ও যা বলল, তাই…৷’
অনুষ্কার কানে এল অনেকের হইচই চিৎকার৷
ও চাঁদের দিকে তাকাল৷ কী স্পষ্ট, কী সুন্দর!
চাঁদকে এই মুহূর্তে ওর ভীষণ ভালোবাসতে ইচ্ছে করল৷
ঠিক তখনই সম্পির গলা কানে এল৷ ওদের তিনজনের নাম ধরে চেঁচিয়ে ডাকছে৷
.
৷৷বারো৷৷
আমি একজন পিশাচ৷ এ ছাড়া অন্য কোনও পরিচয় আমার নেই৷
এখন আমাকে আবার নতুন আশ্রয়ের খোঁজে বেরোতে হবে৷
আত্মা যদি অবিনশ্বর হয় তা হলে প্রেতাত্মার অবিনশ্বর হতে অসুবিধে কী! সুতরাং আমি অমর৷
তোমার কি মনে নেই, গীতার সাংখ্যযোগে শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, ‘নৈনং ছিন্দন্তি শস্ত্রাণি নৈনং দহতি পাবকঃ৷’ অর্থাৎ, কোনও শস্ত্র এই আত্মাকে ছেদন করিতে পারে না৷ অগ্নি ইহাকে দহন করিতে পারে না৷
তিনি আরও বলেছেন, জল ইহাকে আর্দ্র করিতে পারে না, বায়ু ইহাকে শুষ্ক করিতে পারে না৷
তা হলে আমার ‘মৃত্যু’ হবে কেমন করে?
তাই আকাশে, বাতাসে ধুলোয় মিশে আবার শুরু হোক আমার পথ চলা৷
চলতে-চলতে আবার আমাকে খুঁজতে হবে নতুন আশ্রয়৷ নিতে হবে আবার কোনও নতুন পরিচয়৷ তারপর আবার বিশ্রাম আর আরাম৷
নতুন জায়গায়, নতুন পরিবেশে, নতুন করে শুরু হবে আমার নতুন জীবন৷
আঃ, ভাবতেই কী তৃপ্তি!
