সেই হাতে বজ্রমুঠিতে পিশাচটার ঘাড় চেপে ধরল অনুষ্কা৷ শরীর থেকে যেমন করে জোঁক ছাড়ায় সেভাবে পিশাচটাকে ইলিনার কাছ থেকে ছাড়িয়ে নিল, এক হ্যাঁচকায় টেনে নিল নিজের কাছে৷
ইলিনা আর সজনী এবার প্রাণপণ চিৎকার জুড়ে দিল৷ সেই চিৎকারে গাছপালার ঘুমন্ত পাখিরা জেগে উঠে ডাকতে লাগল, ওড়াউড়ি শুরু করল৷
ইলিনারা টের পেল দারচিনির গন্ধে জায়গাটা ভরে গেছে৷
ইলিনার গলা থেকে রক্ত পড়ছিল, মাথা টলে যাচ্ছিল৷ ও কোনওরকমে উঠে বসল৷ তাকাল অনুষ্কার দিকে৷
সজনীও তাকাল৷
ওই তো দাঁড়িয়ে রয়েছে ইলিনার প্রিয়তম ভ্যাম্পায়ার! শত্রুর সঙ্গে লড়াই করছে৷
অনুষ্কার হাতের মুঠোয় পিশাচটার দম বন্ধ হয়ে আসছিল৷ ওটা হাঁ করে বাতাস টানার চেষ্টা করছিল৷ যন্ত্রণার চিৎকার করছিল৷ ইস্পাতের দাঁতের পাটি ঝকঝক করছে৷ আর তার ফাঁকে সাপের মতো কুণ্ডলী পাকানো একটা কালো রঙের জিভ৷ সেটা কখনও-কখনও লম্বা হয়ে বেরিয়ে আসছে বাইরে৷
অনুষ্কার শক্তি এতটাই যে, পিশাচটা তার কানাকড়িও ডিঙোতে পারছিল না৷ তাই জেতার চেষ্টা করতে-করতে ওটা কাহিল হয়ে পড়ল৷
অনুষ্কা মোবাইল ফোন ফেলে দিয়ে বাঁ-হাতে পিশাচটার নাক চেপে ধরল৷ সঙ্গে-সঙ্গে অদ্ভুত একটা গোঙানির শব্দ করে পিশাচটার মাথা কাত হয়ে গেল একপাশে৷
অনুষ্কা ওটাকে ছেড়ে দিল৷ ওটার নিষ্প্রাণ শরীরটা ভেজা কাপড়ের মতো খসে পড়ল মাটিতে৷ পড়েই রইল৷
অনুষ্কার ডানহাতটা আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এল৷
ইলিনা আর সজনী থরথর করে কাঁপছিল৷ ভয়ে কুঁকড়ে যাচ্ছিল৷
এই তা হলে অনুষ্কার গোপন শক্তি! অনুষ্কা না থাকলে ইলিনারা আজ বাঁচত না৷
কৃতজ্ঞতার আবেগে ইলিনার কান্না পেয়ে গেল৷ একইসঙ্গে গলার অসহ্য যন্ত্রণা ওকে অজ্ঞান করে দিতে চাইছিল৷ ও সজনীকে প্রাণপণে আঁকড়ে ধরে রইল৷
সজনীর অবস্থা তখন সাংঘাতিক৷ ওর বুক ধড়াস-ধড়াস করছিল৷ আধো-অন্ধকারে এইমাত্র ও কী দেখল? ওদের বন্ধু অনুষ্কা! সে কেমন পালটে ভয়ংকর হয়ে গেল! অমানুষের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অমানুষিক লড়াই করল!
সজনীর বুক ঠেলে কান্না উথলে উঠছিল৷ একইসঙ্গে একটা অচেনা ভয় ওকে অবশ করে দিচ্ছিল৷
ইলিনা আর সজনী নেমে এল ইটের পাঁজা থেকে৷ দুজনেই ভয়ে কাঁপছে, কাঁদছে৷
ইলিনার স্কুল-ড্রেস রক্তে ভেসে যাচ্ছে৷ ও সজনীকে আঁকড়ে ধরে পা ফেলছিল৷ যন্ত্রণায় গুঙিয়ে উঠছিল৷
অনুষ্কা ছুটে গিয়ে ওদের জাপটে ধরল৷ ওরা তিনজনেই হাঁপাচ্ছিল৷ কাঁদছিল৷ আর সজনী শিউরে উঠছিল৷
একটু পরে অনুষ্কা সজনীকে বলল, ‘শিগগির সম্পিকে একটা ফোন করো…৷’ কথাটা বলেই ও ইলিনার গলায় নিজের রুমালটা চেপে ধরল৷ যে করে হোক রক্তটা বন্ধ করা দরকার৷
সজনী কান্না-ভাঙা কাঁপা গলায় বলল, ‘আমাদের দুজনের কারও মোবাইল নেই৷ গণ্ডগোলের সময় কোথায় ছিটকে পড়েছে জানি না…৷’
‘আমার ফোন থেকে ফোন করো৷ ওই তো আমার ফোন ওখানে পড়ে আছে৷’
সজনী এগিয়ে গেল সামনে৷ অন্ধকারে হাতড়ে অনুষ্কার মোবাইলটা মাটি থেকে কুড়িয়ে নিল৷
সম্পিকে ও ফোন করতে যাবে, তখনই অনুষ্কা জিগ্যেস করল, ‘আমরা যে পিশাচটাকে খতম করলাম সেটাই কি টয়লেটের ওখানে আমাদের ডাকতে গিয়েছিল?’
সজনী নাক টেনে-টেনে সহজ হওয়ার চেষ্টা করে বলল, ‘না, ও ভালো মেয়ে৷ এখানে এসে দূর থেকে জায়গাটা আমাদের দেখিয়ে দিয়েই ও ছুটে আবার ফেস্টিভ্যাল হলে চলে গেছে৷ আমরা এখানে এসে রবিনা ম্যাডামকে খুঁজছি, তখনই ওই শয়তান পিশাচটা এগিয়ে এল৷ তারপর…৷’
সজনী কথা বলছিল আর একইসঙ্গে সম্পির নম্বর ডায়াল করে মোবাইল ফোনটা কানে চেপে ধরেছিল৷
রিং হয়ে যাচ্ছে৷ ফোন কেউ ধরছে না৷
সে-কথাই ও বলল অনুষ্কাকে৷
অনুষ্কা বিরক্ত হয়ে বলল, ‘ওঃ, আবার সেই সাইলেন্ট মোড! শিগগিরই চলো, ইলিনাকে এখুনি ডাক্তারখানায় নিয়ে যেতে হবে৷ কুইক—৷’
ইলিনা অনুষ্কার গায়ে প্রায় এলিয়ে পড়েছিল৷ চোখ বুজে ‘ও—ওঃ! ও—ওঃ!’ শব্দ করে কাতরাচ্ছিল৷
ওকে যে করে হোক সুস্থ করে তুলতে হবে৷ অনুষ্কা ভাবল৷ আরও গাঢ় করে ইলিনাকে জাপটে ধরল ও৷
সজনীকে ডেকে নিয়ে ও এগোতে যাবে তখনই ওর মনে পড়ল রবিনা ম্যাডামের কথা৷ যাঁর নাম করে সেই মেয়েটা ওদের ডেকে নিয়ে এল সেই রবিনা ম্যাডাম কোথায়? আর কোন আর্জেন্ট কাজের জন্য তিনি ওদের তিনজনকে তড়িঘড়ি ডেকে পাঠিয়েছিলেন?
সজনীকে রবিনা ম্যাডামের কথা জিগ্যেস করতেই ও বলল, ‘জানি না৷ এখানে এসে রবিনা ম্যাডামকে আমরা একবারও দেখিনি৷ যখন ম্যাডামকে খোঁজাখুঁজি করছি তখন ইটের পাঁজার আড়াল থেকে ওই ভয়ংকর পিশাচটা আমাদের ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ল৷ তারপর তো তুমি এলে…৷’
ইলিনা যন্ত্রণায় রুদ্ধ গলায় কোনওরকমে বলল, ‘অনুষ্কা, রবিনা ম্যাডামের কোনও বিপদ হয়নি তো?’
সজনী সে-কথায় সায় দিয়ে হাঁপাতে-হাঁপাতে বলল, ‘আমিও ঠিক এই কথাটাই বলছিলাম৷ রবিনা ম্যাডামের কোনও বিপদ হয়নি তো!’
‘না রে, আমার কোনও বিপদ হয়নি৷’ উত্তর দিলেন রবিনা ম্যাডাম নিজেই, ‘এখন আমার আর কোনও বিপদের ভয় নেই…৷’
ওরা তিনজনে চমকে উঠল৷ শব্দ লক্ষ করে তাকাল৷
কাছেই একটা গাছের গুঁড়ির সঙ্গে রবিনা ম্যাডামের দেহটা লেপটে আছে৷ মাটি থেকে প্রায় চার-পাঁচ হাত উঁচুতে ওঁর শরীরটা উলটোভাবে শূন্যে ঝুলছে৷ পা ওপরে৷ মাথা নীচের দিকে৷
