ইলিনা, সজনী আর অনুষ্কা টয়লেটের দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ছিল৷ সমর্পিতার বেরিয়ে আসার জন্য অপেক্ষা করছিল৷
মেয়েটা হাঁপাতে-হাঁপাতে বলল, ‘তোমাদের তিনজনকে…রবিনা ম্যাডাম…এক্ষুনি ডাকছেন৷ তোমাদের নাম ইলিনা, সজনী আর…আর অনুষ্কা তো?’
ওরা মাথা নাড়ল৷ হ্যাঁ৷
‘তোমাদের…তোমাদের রবিনা ম্যাডাম…এক্ষুনি ডাকছেন…খুব দরকার৷’
ল্যাম্পপোস্টের আলোয় যতটুকু দেখা গেল তাতে ‘খুব দরকার’ ভাবটা মেয়েটির চোখে-মুখেও ফুটে উঠেছিল৷
‘ম্যাডাম কোথায়? ফেস্টিভ্যাল হলে?’
‘না, ম্যাডাম হল থেকে বেরিয়ে ক্যাম্পাসের পেছনের দিকে গেলেন৷ তোমাদের তিনজনকে তাড়াতাড়ি সেখানে যেতে বললেন…৷’
ইলিনারা ইতস্তত করল৷ এ ওর দিকে তাকাল৷ রবিনা ম্যাডাম হঠাৎ ক্যাম্পাসের পিছনদিকে কী করতে গেলেন?
অনুষ্কা বলল, ‘ইলিনা, সজনী—তোমরা বরং যাও, আমি এখানে থাকছি৷’
মেয়েটি অসহায়ের মতো বলল, ‘কিন্তু ম্যাডাম যে তিনজনকেই ডেকেছেন—বলেছেন ভীষণ আর্জেন্ট…৷’
তখন অনুষ্কা ওকে বুঝিয়ে বলল, ‘আমাদের এক বন্ধু টয়লেটে গেছে৷ আমরা ইন ফ্যাক্ট ওর জন্যেই ওয়েট করছি৷ ও বেরোলে আমরা…৷’
মেয়েটি বেশ বিপন্ন গলায় বলল, ‘তা হলে তো খুব প্রবলেমে পড়লাম! ম্যাডাম যেভাবে বললেন…৷’
ইলিনা মোবাইল ফোন বের করে সমর্পিতাকে ফোন করতে লাগল৷
রিং বেজে গেল, কিন্তু কেউ ফোন ধরল না৷ তখন ইলিনা ফোন কেটে দিল৷
‘ফোন বেজে যাচ্ছে৷ ও ধরছে না—৷’
সজনী বলল, ‘ওর ফোনটা নিশ্চয়ই সাইলেন্ট মোডে আছে—৷’
অনুষ্কা বলল, ‘ঠিক আছে৷ তোমরা দুজন যাও—নিশ্চয়ই ওখানে কোনও প্রবলেম হয়েছে৷ আমি এখানে থাকছি৷ সম্পি টয়লেট থেকে বেরোলে তারপর আমি যাব৷ কোনও ভয় নেই—৷’
‘ভয়? ভয় কীসের?’ অন্য মেয়েটি কৌতূহলে জানতে চাইল৷
ইলিনা আর সজনী তাড়াতাড়ি বলে উঠল, ‘না, না—এমনি৷ চলো, যাই…৷’
ওরা দুজনে যখন মেয়েটির সঙ্গে এগোচ্ছে তখন অনুষ্কা ডেকে বলল, ‘কোনও প্রবলেম হলেই আমাকে সঙ্গে-সঙ্গে ফোন কোরো৷ সম্পি বেরোলেই আমি ওকে নিয়ে যাচ্ছি—৷’
‘ঠিক আছে৷’ বলে ওরা জোর পায়ে হাঁটা দিল৷
দু-পাশে গাছপালা, মাঝখান দিয়ে পিচের রাস্তা৷ ল্যাম্পপোস্টের হলদে আলো এখানে-সেখানে ছিটকে পড়েছে৷ অন্ধকার আর আলো দাবার ছক তৈরি করেছে যেন৷
রিহার্সালের গানের আওয়াজ কানে আসছে৷ তার সঙ্গে ঘুঙুরের শব্দ৷
অনুষ্কা আনমনাভাবেই আকাশের চাঁদের দিকে তাকাল৷ কী সুন্দর গোল আর স্পষ্ট৷ ওর ঘরের দেওয়ালে টাঙানো ছবিটার কথা মনে পড়ে গেল৷ ছবির চাঁদটা মেঘে ঢাকা পড়েছে কি না কে জানে! প্রকৃতির সঙ্গে ওই ছবিটা সবসময় মেলে না৷
চাঁদের দিকে তাকিয়ে অনুষ্কার কেমন ঘোর লেগে গেল৷ ও অপলকে তাকিয়ে নিশিনাথকে দেখতে লাগল৷
হঠাৎই অনুষ্কার হাতের মুঠোয় ধরা মোবাইল ফোন থরথর করে কেঁপে উঠল৷ ও চমকে উঠে ফোনের পরদার দিকে তাকাল৷
ইলিনা৷
ফোন ধরতেই ইলিনার বিপন্ন গলা শোনা গেল৷ শুধু বিপন্ন নয়, ওর গলা কাঁপছে৷
‘অনুষ্কা, শিগগির এসো—সর্বনাশ হয়েছে!’
‘তোমরা কোথায়?’
‘পিছনদিকের পাঁচিলের কাছে—যেখানে তুমি আর আমি কোকিল দেখতে গিয়েছিলাম৷ সেই ইটের পাঁজা…৷’
আর শোনার দরকার মনে করল না অনুষ্কা৷ ফোন কেটে দিয়ে পিছনের বাউন্ডারি ওয়ালের দিকে বিদ্যুৎগতিতে ছুটতে শুরু করল৷
আলো আর অন্ধকারে ওর শরীরটা একবার দেখা যাচ্ছিল, একবার মিলিয়ে যাচ্ছিল৷ যেন ওর ছুটন্ত শরীরটা জ্বলছে-নিভছে৷
ছুটতে-ছুটতে অনুষ্কার মনে হল, টয়লেটের দিক থেকে একটা মিয়োনো ডাক যেন ভেসে এল৷ ইলিনার নাম ধরে কেউ ডেকে উঠল যেন৷
কিন্তু ওর সামনে দু-বন্ধুর ডাক, পিছনে এক বন্ধুর ডাক৷ তাই অনুষ্কা দৌড় থামাল না—ছুটতেই থাকল৷ সেই অবস্থাতেই ও লম্বা-লম্বা লাফ দিয়ে শূন্যে ভেসে উঠে অলৌকিক গতিতে দুরত্ব কমাতে লাগল৷
মনে হচ্ছিল যেন ও উড়ে চলেছে৷ অন্ধকার কিংবা গাছপালা ওর গতি রুখতে পারছিল না৷ ওকে এই অবস্থায় দেখলে যে-কেউ স্তম্ভিত হয়ে যেত, ভয় পেত৷
অকুস্থলে পৌঁছতে অনুষ্কার সময় লাগল আট সেকেন্ডেরও কম৷ রাস্তা ছেড়ে গাছপালার ভেতরে ঢুকে পড়ল ও৷
ওই তো, পুরোনো টিন, কাঠ আর অ্যাসবেস্টস৷ তার পাশে ইটের পাঁজা৷ ইটের পাঁজার ওপরে শুয়ে আছে ওরা দুজন কে? শুয়ে-শুয়ে ছটফট করছে? গায়ে স্কুল-ড্রেস?
জায়গাটা অন্ধকার৷ গাছপালার পাতার আড়াল থাকায় চাঁদের আলোও সেখানে ঢোকেনি৷ কিন্তু তা সত্ত্বেও ভ্যাম্পায়ার মেয়ের দেখতে কোনও অসুবিধে হল না৷
চিত হয়ে শুয়ে আকুলিবিকুলি করছে ইলিনা আর সজনী৷ ওরা যে চিৎকার করতে পারছে না তার কারণ স্কুল-ড্রেস পরা একটা পিশাচ ওদের ওপর উপুড় হয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ে আছে৷ পিশাচটার মুখ ভয়ংকর, চোখ জ্বলছে, ইস্পাতের দাঁত ঝিলিক দিচ্ছে৷
কিন্তু রবিনা ম্যাডাম কোথায়?
প্রশ্নটা অনুষ্কার মনে ঝলসে গেলেও একইসঙ্গে ও প্রতিরক্ষার কাজ শুরু করল৷
ও ইলিনাদের কাছ থেকে প্রায় পাঁচ-ছ’ হাত দূরে দাঁড়িয়ে ছিল৷ সেই দূরত্বটাকে ও মোটেই কমাতে চেষ্টা করল না৷ ওখানে দাঁড়িয়েই ওর ডানহাতটা বাড়িয়ে দিল৷
হাতটা পলকে রবারের মতো লম্বা হয়ে গেল৷ একইসঙ্গে হাতের পেশি, শিরা-উপশিরা সব দেখা গেল৷ যেন অনুষ্কার হাতটা স্বচ্ছ কাচের তৈরি৷
পিশাচটা ততক্ষণে ইলিনার গলার খাঁজে কামড় বসিয়েছে৷ আর ঠিক তখনই অনুষ্কার হাতের চেটোতে কতকগুলো কাঁটা গজিয়ে গেছে—ছুচলো ইস্পাতের কাঁটা৷
