রনিতা ম্যাডামের কথা শেষ হওয়ার আগেই জলের বোতলটা ওঁর মাথায় উপুড় করে দিল সম্পি৷ তাই রনিতার শেষ দিকের ‘আঃ!’-টা আরামের শীৎকার থেকে যন্ত্রণার চিৎকারে বদলে গেল৷
মানুষের মাথার ওপরে গাঢ় সালফিউরিক অ্যাসিডের বোতল উপুড় করে দিলে যে-দশা হয় রনিতা ম্যাডামের দশা তার চেয়েও দশগুণ খারাপ হয়ে গেল৷
ওর শরীর গাঢ় ধোঁয়ায় ঢেকে গেল৷ গরম তেলের ওপর জলের ফোঁটা পড়ল যেরকম চড়বড়-চড়বড় শব্দ হয় সেরকম শব্দ হতে লাগল৷ তার সঙ্গে অসহ্য যন্ত্রণার মরণ আর্তনাদ৷
ধোঁয়াটে রনিতা ম্যাডাম কেমন যেন দলা পাকিয়ে খসে পড়ল মেঝেতে৷
বৃষ্টির জলের সত্যি-সত্যি এত শক্তি!
সম্পি তাজ্জব হয়ে গেল৷ এই পিশাচটাকে নিকেশ করার জন্য ও কতদিন ধরে বৃষ্টির জল জমিয়ে রেখেছিল৷ দুটো প্লাস্টিকের বোতলে সেই জল ভরে ও সেই কবে থেকে স্কুল-ব্যাগে বোতলগুলো বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে!
আজ সেটা কাজে এল৷
ধেড়ে পিশাচ তো পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়েছে, কিন্তু কচিটা?
সেটা তখন সম্পিকে জাপটে ধরে ইস্পাতের দাঁতের পাটি ফাঁক করেছে৷ এবং সেই ধারালো দাঁত বসিয়ে দিতে চাইছে সমর্পিতার গলায়৷
সম্পি এক ভয়ংকর চিৎকার করে উঠল—অনেকটা যুদ্ধের ডাকের মতো৷ তারপর বোতলে যে-সামান্য জল ছিল সেটা ছুড়ে দিল দ্বিতীয় পিশাচের গায়ে৷
পিশাচটার গা থেকে ধোঁয়া বেরোল৷ ওটা চকিতে দু-পা পিছিয়ে গেল সম্পির কাছ থেকে৷
সমর্পিতা এইটুকু সময়ই চাইছিল৷ যন্ত্রের মতো নির্ভুল দ্রুতগতিতে ও ব্যাগ থেকে দ্বিতীয় জলের বোতলটা বের করে নিল৷ একলাফে আহত পিশাচটার কাছে পৌঁছে গেল৷ ছিপি খুলে বোতলের জল ঢেলে দিল ওটার মাথায়৷
ধোঁয়া৷ চড়বড় শব্দ৷ যন্ত্রণার চিৎকার৷
পিশাচটা পড়ে গেল মেঝেতে৷ ধোঁয়ায় মাখামাখি হয়ে ছটফট করতে লাগল৷
দুটো ধোঁয়ার কুণ্ডলীকে পিছনে ফেলে দরজার দিকে পাগলের মতো ছুট লাগল সম্পি৷ একইসঙ্গে খ্যাপাটে চিৎকার করতে লাগল৷ হাতের খালি বোতলটা এক ঝটকায় ছুড়ে ফেলে দিয়ে টয়লেটের দরজার কাছে পৌঁছে গেল৷ তারপর ছিটকিনি খুলে সোজা বাইরে৷
সম্পি বাইরে এলেও ওর চিৎকার থামেনি৷ চিৎকার করতে-করতে ও ছুটে গেল ফেস্টিভ্যাল হলের দরজার দিকে৷
ওর চিৎকার শুনে অনেকেই বাইরে বেরিয়ে এসেছে৷ কিন্তু দরজার কাছে ভিড় করে সবাই দাঁড়িয়ে৷ পুরোনো ঘটনার কথা মনে রেখে কেউই এগোতে সাহস পায়নি৷
সম্পি ছুটতে-ছুটতে এসে কাকলি ম্যাডামকে দেখতে পেয়ে ওঁর ওপর একেবারে ঝাঁপিয়ে পড়ল৷ বিকৃত গলায় হাঁপাতে-হাঁপাতে বলল, ‘পিশাচ! পূর্ণিমা! পিশাচ! টয়লেটে৷ রনিতা…রনিতা ম্যাডাম…পিশাচ!’
এটুকু শুনেই কাকলি ম্যাডাম চোখ কপালে তুলে অজ্ঞান হয়ে গেলেন৷
সম্পি টাল সামলাতে না পেরে আর-একটু হলেই পড়ে যাচ্ছিল— কোনওরকমে নিজেকে সামলে নিল৷
মেয়েরা কাকলি ম্যাডামকে ধরাধরি করে ভেতরে নিয়ে গেল৷
অন্যরা সমর্পিতাকে ঘিরে ধরে হাজারটা প্রশ্ন করতে লাগল৷
ও বড়-বড় শ্বাস টেনে অনেক কিছু বলতে চাইল, কিন্তু ওর মুখ দিয়ে জড়ানো এলোমেলো শব্দ বেরিয়ে আসতে লাগল৷
কয়েক মিনিটের মধ্যেই ধাতস্থ হয়ে সম্পি টয়লেটের ভয়ংকর ঘটনা সবাইকে খুলে বলল৷ তারপর জিগ্যেস করল, ইলিনা, সজনী, অনুষ্কা ওরা কোথায়৷
কেউই কিছু বলতে পারল না৷ সবাই শুধু মুখ চাওয়া-চাওয়ি করতে লাগল৷ ভয়ে এক জায়গায় জড়ো হয়ে রইল৷
হঠাৎই একটি মেয়ে বলল, ‘তোমার সঙ্গেই তো ওরা তিনজন হল থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল৷ তারপর তো আর দেখিনি—৷’
তা সত্ত্বেও সম্পির চোখ ভিড়ের মধ্যে তিন বন্ধুকে খুঁজতে লাগল৷ কোথায় গেল ওরা? ওদের ফোন করার কোনও উপায় নেই, কারণ মোবাইল ফোন ও টয়লেটে ব্যাগে ফেলে এসেছে৷
সম্পি এতক্ষণে ভয় কাটিয়ে দম ফিরে পেয়েছিল৷ ও এদিক-ওদিক তাকিয়ে জুতসই একজন সঙ্গী খুঁজতে লাগল৷ ইলিনাদের খোঁজার জন্য কয়েকজনকে ও সঙ্গে নিতে চায়৷
ও সামনে দাঁড়ানো দুজন মেয়েকে বলল, ‘আমি ইলিনাদের খুঁজতে যাব৷ তোমরা আমার সঙ্গে যাবে?’
ওর কথায় দুজনের জায়গায় ছ’জন ওর কাছে এগিয়ে এল : ‘চলো, আমরা যাব…৷’
সম্পির চোখ সাহসী রবিনা ম্যাডামকে খুঁজল কিন্তু দেখতে পেল না৷
কয়েকজনকে জিগ্যেস করে জানল, মিনিট পনেরো-কুড়ি আগে ক্লাস নাইনের একটি মেয়ে এসে রবিনা ম্যাডামকে কোথায় যেন ডেকে নিয়ে গেছে৷
সম্পি আর দাঁড়াল না৷ ওর মন কু-ডাক ডাকতে লাগল৷ ওর মনে হল, রবিনা ম্যাডাম, ইলিনা, সজনীদের খুব বিপদ৷ কারণ আজ পূর্ণিমা৷
অনুষ্কা কি পারবে সবাইকে বিপদ থেকে বাঁচাতে?
সম্পি পিচের রাস্তা ধরে বাস্কেটবল গ্রাউন্ডের দিকে রওনা হল৷ প্রায় সাত-আটজন মেয়ে দল বেঁধে ওর সঙ্গী হল৷ শম্পা ম্যাডাম বারবার সম্পিকে ডাকলেন, অন্ধকারে এসব খোঁজাখুঁজির কাণ্ড থামাতে বললেন৷ কিন্তু সম্পির আজ কোনও বারণ না শোনার দিন৷
নিরুপায় শম্পা ম্যাডাম তখন মোবাইল ফোন নিয়ে বড়দিকে ফোন করতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন৷
সম্পিরা তখন হইহই করে এগিয়ে চলেছে৷ থেকে-থেকে ইলিনা, সজনী আর অনুষ্কার নাম ধরে ডাকছে৷
আকাশের চাঁদের দিকে সম্পির চোখ গেল৷
মেঘের আড়াল সরিয়ে ফ্যাকাশে হলদে চাঁদ কখন যেন বেরিয়ে এসেছে৷
.
৷৷এগারো৷৷
উদভ্রান্তের মতো যে-মেয়েটি ওদের কাছে ছুটে এল ইলিনারা ওর মুখ চেনে, কিন্তু নাম জানে না৷ ক্লাস টেন-এর-ই অন্য কোন একটা সেকশানে যেন পড়ে৷
