এই টয়লেটটা সাধারণত তালা দেওয়া থাকে৷ এখন রিহার্সাল চলছে বলে বড়দির নির্দেশে তালা খুলে দেওয়া হয়েছে৷ মাঠে যখন প্যান্ডেল বেঁধে স্কুলের কোনও ফাংশান-টাংশান হয় তখন এই টয়লেটটা গেস্টদের জন্য খুলে দেওয়া হয়৷
ওরা চারজন টয়লেটের দরজার কাছে এসে দাঁড়াল৷ ঝিলমিল লাগানো বিশাল দরজা—প্রায় দেড়মানুষ উঁচু৷ তিনটে সিঁড়ির ধাপ উঠে তারপর টয়লেটে ঢুকতে হয়৷
সম্পি বলল ও আগে যাবে৷ তখন ইলিনা বলল, ‘তোর ব্যাগটা আমার কাছে দিয়ে যা—৷’
তাতে ও স্পষ্ট জবাব দিল, ‘না রে, ব্যাগ আমার সঙ্গে থাক…৷’ তারপর দরজা ঠেলে ঢুকে গেল৷
ব্রিটিশ আমলের টয়লেট৷ তার সিলিং যেমন উঁচু, আকারও তেমনি বিশাল৷ তবে মাত্র একজন ব্যবহার করতে পারে৷
টয়লেটে চল্লিশ ওয়াটের দুটো বালব জ্বলছে৷ বাঁ-দিকের দেওয়ালে বড় ওয়াশ বেসিন৷ তার ওপরে বিরাট মাপের বেলজিয়ান আয়না৷ তার পাশে একটা প্রকাণ্ড বাথটাব৷ লম্বায় প্রায় আট ফুট হবে৷ তার সাদা রং অনেক জায়গায় চটে গিয়ে জং ধরা লোহা বেরিয়ে পড়েছে৷
ডানদিকে বড় মাপের ইউরিনাল কিউবিকল, আর তার পাশে একটা ছোট ঘর হল ল্যাট্রিন৷
টয়লেটের দেওয়ালে-দেওয়ালে ঝুল-কালি আর মাকড়সার জাল দেখে বোঝাই যায় এটা খুব কম ব্যবহার হয়৷
টয়লেটের দরজা বন্ধ করল সম্পি৷ তারপর দু-পাল্লার ঝিলমিলের ওপরে কাঠের লক আটকে দিল৷
এবার ও টয়লেটের প্রতিটি আনাচকানাচ খতিয়ে দেখে নিল যে, টয়লেটে সত্যিই ও একা৷
সিলিং-এর দিকে তাকাল সম্পি৷ অনেক উঁচুতে চার দেওয়ালে চারটে বড় মাপের ভেন্টিলেটার৷ তার চারপাশে মোটা-মোটা ঝুল জমে আছে৷
সম্পির একটু ভয়-ভয় করছিল৷ ও ব্যাগটা শুকনো মেঝেতে নামিয়ে রেখে তাড়াতাড়ি ইউরিনাল কিউবিকল-এ ঢুকল৷ তখনই যেন একটা ছোট্ট কাশির শব্দ শুনতে পেল৷
ও গলা বাড়িয়ে বাইরেটা আবার দেখে নিল৷ কেউ নেই৷
ভাগ্যিস ও ভয়ে চিৎকার করে ওঠেনি! স্কুলে ডাকাবুকো বলে যার পরিচয় তাকে সবাই ভিতুর ডিম বলে ডাকুক এটা ও কিছুতেই চায় না৷
কিন্তু ইউরিনাল কিউবিকল থেকে ও যখন বাইরে বেরিয়ে এল তখন টয়লেটে ও একা নয়৷ টয়লেটের দরজার কাছে রনিতা ম্যাডাম দাঁড়িয়ে রয়েছেন৷ ওঁর মুখটা এখনও পালটে যায়নি, কিন্তু দু-চোখে সাদা আলো জ্বলছে৷
ম্যাডামের পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে স্কুল ইউনিফর্ম পরা একটা মেয়ে৷ সম্পি ওর নাম জানে না, তবে মুখটা চেনে৷ যতদূর মনে পড়ছে, মেয়েটা ক্লাস নাইনের ‘সি’ সেকশানে পড়ে৷ ওর চোখেও সাদা আলো ধকধক করে জ্বলছে৷
যতটা ভয় পাওয়ার কথা সম্পি ততটা ভয় পেল না৷ কারণ, দরজার বাইরে ওর তিন বন্ধু দাঁড়িয়ে আছে৷ তার মধ্যে আবার অনুষ্কা রয়েছে৷
কিন্তু এই পিশাচ দুটো কোথায় লুকিয়ে ছিল? সম্পি তো এদের খুঁজে পায়নি! তা হলে কি ল্যাট্রিনের ছাদের ওপরে লেপটে শুয়ে ছিল?
সম্পি চিৎকার করার কথা ভাবল৷ কিন্তু দরজার ঠিক বাইরেই যখন তিন বন্ধু দাঁড়িয়ে আছে তখন চিৎকার না করে ওদের স্বাভাবিক গলায় ডাকলেই হয়৷ তা হলে ওরা বুঝবে, সম্পি ভিতু নয়৷
সম্পি ‘ইলিনা! ইলিনা!’ বলে ডেকে উঠল৷ ডাকটা সম্পির অনিচ্ছা সত্ত্বেও চিৎকারের মতো হয়ে গেল৷
কিন্তু কোনও সাড়া পেল না৷
পিশাচ দুটো চাপা খিলখিল হাসিতে ঢলে পড়ল৷ গোপন রসিকতায় এ ওর গায়ে ঠেলা মারতে লাগল৷ রনিতা ম্যাডাম ওঁর ছাত্রীর যেন ইয়ার-দোস্ত হয়ে গেছেন৷
‘ওরা কেউ নেই রে৷ ওরা চলে গেছে৷’ হেসে বললেন রনিতা৷ ওঁর গলাটা অস্বাভাবিকরকম মিহি শোনাল : ‘আমাদের মতো আর-একজন ওদের মিছে কথা বলে ডেকে নিয়ে গেছে৷ তোর পাহারা থেকে সরিয়ে দিয়েছে৷’
পিশাচের কথা বিশ্বাস করল না সমর্পিতা৷ ও আবার ইলিনা আর অনুষ্কার নাম ধরে জোরে-জোরে ডেকে উঠল—একবার, দু-বার, তিনবার৷
না, কেউ সাড়া দিল না৷ সম্পির গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল৷
পিশাচ দুটো আবার খিলখিল করে হেসে উঠল৷ কাচের চুড়ির সঙ্গে কাচের চুড়ি ঠোকাঠুকি লাগল যেন৷ তারপর আহ্লাদে আটখানা হয়ে এ ওর গায়ে ঢলে পড়তে লাগল৷
‘কেউ নেই—’ আঙুল ঘুরিয়ে ব্যঙ্গের গলায় বললেন রনিতা, ‘তুই এখন আমাদের৷ তোর বন্ধু অনুষ্কা—ওই ন্যাকা ভ্যাম্পায়ারটা—ওকেও আজ আমরা খতম করব৷ ভ্যাম্পায়ার, কিন্তু মানুষ ধরা পছন্দ করে না৷ ন্যাকাষষ্ঠী! বেড়াল বলে মাছ ছোঁব না! তার উপর আমাদের পিণ্ডি চটকানোর প্ল্যান আঁটছে! আজ দেখব কত দৌড়!’
‘তোকে আজ কেউ বাঁচাতে পারবে না৷’ রনিতার সঙ্গী পিশাচটা বলল, ‘আজ আমাদের পূর্ণিমা ফেস্টিভ্যাল…৷’
সম্পি ঝুঁকে পড়ে ওর ব্যাগ খুলল৷ একটা জলের বোতল বের করে ছিপি খুলল৷ ভীষণ তেষ্টা পাচ্ছে৷
পিশাচ দুটো বিদ্যুৎঝলকের মতো লাফ দিল৷ এক লহমায় চলে এল সম্পির কাছে৷ ওর দু-পাশে ঘন হয়ে দাঁড়াল৷ লম্বা জিভ বের করে ওর ঘাড়-গলা চাটতে লাগল৷ আর মুখ থেকে জড়ানো গলায় ‘আঃ—! আঃ—!’ করে লোভের শব্দ বের করতে লাগল৷
সমর্পিতার গা ঘিনঘিন করছিল কিন্তু একইসঙ্গে আরাম কিংবা তৃপ্তির ঝিমুনি লাগছিল৷ সেই অবস্থাতেই ওর মনে প্রশ্ন জাগল : এই পিশাচগুলো কি সম্মোহন জানে?
রনিতা ম্যাডাম সম্পির হাতের জলের বোতলের দিকে তাকিয়ে নেশা-ধরা গলায় বললেন, ‘সম্পি, তোর তেষ্টা পাচ্ছে, তেষ্টা?…আমাদেরও পাচ্ছে…দারুণ তেষ্টা…তেষ্টা—আ—আ—আঃ…!’
