‘আর আমরা? আমরা কতরকম গন্ধ চিনতে পারি?’
হাসল অনুষ্কা : ‘কিছু মনে কোরো না৷ তোমাদের বেলায় সংখ্যাটা মাত্র সত্তর থেকে আশি৷ আর তার মধ্যে এই দারচিনির মতো গন্ধটা পড়ে না৷ যেমন, তুমি এখন এই গন্ধটা পাচ্ছ না, তাই না?’
বিহ্বলভাবে মাথা নেড়ে সায় দিল ইলিনা৷ সত্যিই ওই গন্ধটা ও এখন পাচ্ছে না৷ ওই দু-বার ছাড়া কখনও পায়নি৷
হঠাৎই অনুষ্কার জন্য ভয় পেল ইলিনা৷ যদি ওই পিশাচগুলো অনুষ্কার কোনও ক্ষতি করে?
সে-কথাই জিগ্যেস করল ওকে৷
অনুষ্কা ছোট্ট করে হেসে বলল, ‘ভয় পেয়ো না৷ সেটা কিছুতেই পারবে না৷’
ওরা গাড়ির কাছে এসে গিয়েছিল৷ অনুষ্কা ইলিনাকে ওর বাড়িতে নামিয়ে দেবে এরকমই কথা হয়েছিল৷ তাই দুজনেই উঠে বসল গাড়িতে৷
অনুষ্কার বাবা গাড়ি স্টার্ট দিলেন৷ হেডলাইট জ্বেলে গাড়িটা এগিয়ে নিয়ে যেতে-যেতে বললেন, ‘কী, ফাংশানের রিহার্সাল কেমন হল?’
দুজনেই বলল, ‘ভালো—৷’
‘গুড—ভেরি গুড৷’ বলে অনুষ্কার বাবা হাসলেন৷
.
৷৷দশ৷৷
চাঁদকে দেখে পূর্ণিমা বোঝার উপায় ছিল না, কারণ, আকাশের মেঘ পুরু আড়াল তৈরি করেছিল৷ গতকাল থেকেই বৃষ্টির আশা তৈরি হচ্ছিল, কিন্তু বৃষ্টি এখনও সবাইকে অপেক্ষায় রেখেছে৷
ফেস্টিভ্যাল হলে রিহার্সাল চলছিল৷ যাদের হাজির থাকার কথা তারা সবাই হাজির৷ দুটো গ্রুপে ভাগ হয়ে মেয়েরা কাকলি ম্যাডাম আর শম্পা ম্যাডামের কাছে তালিম নিচ্ছিল৷ রবিনা ম্যাডাম একপাশে বসে রবীন্দ্রনাথের ‘সঞ্চয়িতা’র পাতা ওলটাচ্ছিলেন আর মাঝে-মাঝে কয়েকটা সাদা পাতায় কী যেন টুকে নিচ্ছিলেন৷
বড়দি আজ আসেননি, তবে ওঁর চালু করে দেওয়া টিফিন আর চায়ের নিয়মটা পালটায়নি৷
আজও যথারীতি অনুষ্কা চা-টিফিন খায়নি৷ ‘বাইরের জিনিস খাওয়া ডাক্তারের বারণ’ বলে এড়িয়ে গেছে৷
ও একটা কাগজ হাতে ধরে বসেছিল৷ তাতে রবীন্দ্রনাথের ‘প্রশ্ন’ কবিতাটা লেখা৷ রবিনা ম্যাডাম ওকে এই কবিতাটা তৈরি করতে বলেছেন৷
রিহার্সালের জন্য সামান্য হট্টগোল চলছিল৷ তার মধ্যে হঠাৎই একটা শব্দ সমর্পিতার কানে গেল৷ হলের টিনের চালে একটা জোরালো শব্দ হয়েছে৷ বোধহয় বড় মাপের কোনও গাছের ডাল ভেঙে পড়েছে৷
সম্পি বোধহয় ওর ডাকাবুকো স্বভাবের পুরোটা ছাড়তে পারেনি৷ আর তার সঙ্গে ওর শখের গোয়েন্দা হয়ে ওঠার শখ৷ তাই ও চট করে উঠে দাঁড়াল৷ ওর ঢাউস স্কুল-ব্যাগটা হাতে নিয়ে বেরিয়ে গেল হলের বাইরে৷
ইলিনা ব্যাপারটা লক্ষ করেছিল৷ ও অনুষ্কাকে বলল, ‘যাই, কী ব্যাপার একবার দেখে আসি—৷’ তারপর উঠে রওনা হল৷
হলের বাইরে বেশ কয়েকটা আলো লাগানো, কিন্তু উঁচু চালের কাছটায় অন্ধকার৷ চালের ওপরে গাছের ডালপালা আর পাতা ঝুঁকে পড়েছে৷ কিন্তু তারই মধ্যে কী যেন নড়েচড়ে বেড়াচ্ছে, গাছের ডাল আর পাতা সরিয়ে খুব ক্ষিপ্রভাবে এদিক থেকে ওদিক চলাফেরা করছে৷
সম্পিকে দেখতে পেল ইলিনা৷ ব্যাগটা হাতে ঝুলিয়ে ওপর দিকে তাকিয়ে কিছু একটা দেখার চেষ্টা করছে৷
রনিতা ম্যাডামের সঙ্গে টিচার্স রুমের সেই ঘটনার পর থেকে সম্পির একটা ব্যাপার ইলিনা লক্ষ করেছে : সম্পি কখনও ওর স্কুল-ব্যাগটা কাছ-ছাড়া করে না৷
ইলিনা সম্পির কাছে গিয়ে দাঁড়াল : ‘কিছু দেখতে পেলি?’
‘হ্যাঁ—কিছু একটা হলের চালের ওপরে ঘোরাফেরা করছে৷’
‘বোধহয় ভাম-টাম কিছু হবে৷’
ইলিনা এ-কথা বলল কারণ, স্কুল চত্বরে মাঝে-মাঝে ভাম দেখা যায়৷
ওর কথার উত্তরে সম্পি বলল, ‘হ্যাঁ, ভাম হতে পারে৷ তবে প্রবলেমটা হল ভামটা আমাদের মতো স্কুল-ড্রেস পরে রয়েছে৷’
ইলিনা কিছুক্ষণ হাঁ করে তাকিয়ে রইল সম্পির দিকে৷ তারপর মোবাইল ফোন উঁচিয়ে ধরে বলল, ‘অনুষ্কাকে ফোন করে ডাকব?’
‘না, না—এখনও সেরকম কিছু সিচুয়েশান হয়নি৷’ সম্পি হাত নেড়ে বারণ করল : ‘তা ছাড়া অন্য সবাই সন্দেহ করতে পারে৷ তারপর রনিতা ম্যাডাম জানতে পারবেন…৷ চল, ফিরে যাই৷’
ওরা দুজন হলে ফিরে চলল৷
সম্পি বলল, ‘রনিতা ম্যাডামের সঙ্গের দুটো মেয়েকে আমরা চিনতে পারিনি৷ তা ছাড়া এর মধ্যে কারও ঘাড়ে ওরা কামড় বসিয়েছে কি না কে জানে! সংখ্যাটা তা হলে তিন থেকে আরও বেড়ে যাবে…৷’
ইলিনার অনুষ্কার কথা মনে পড়ল৷ মনে পড়ল, পূর্ণিমার রাতে ওই পিশাচগুলো পাগলের মতো হয়ে ওঠে৷ আজ ওরা একটা কিছু করবেই৷ অনুষ্কাকে ছাড়া আর কাউকে ওরা ভয় পায় না৷ ওরা এখন বোধহয় সুযোগের অপেক্ষায় আছে৷
ইলিনা আর সমর্পিতা ফেস্টিভ্যাল হলে ঢুকে পড়ল৷ অনুষ্কা আর সজনীর কাছে গিয়ে বসে পড়ল৷
সম্পি চাপা গলায় চালে শব্দ হওয়ার ব্যাপারটা ওদের বলল৷
একটু পরেই সম্পি বলল, ‘অ্যাই, আমাকে টয়লেটে যেতে হবে৷’ ও ব্যাগ হাতে উঠে দাঁড়াল৷
সঙ্গে-সঙ্গে বাকি তিনজনও উঠে পড়ল, বলল, ‘চল আমরাও যাই—৷’
অনুষ্কা রবিনা ম্যাডামের কাছে গিয়ে চাপা গলায় টয়লেটে যাওয়ার পারমিশান নিল৷ তারপর ওরা চারজন আবার বেরিয়ে এল হলের বাইরে৷
আকাশে এখনও মেঘ৷ চাঁদ মেঘের আড়ালে থাকলেও চাঁদের ঘোলাটে জ্যোতি দেখা যাচ্ছে৷ বাতাস বেশ জোরে বইছে৷ বড়-বড় গাছের পাতা এলোমেলো নড়ছে, পাতায়-পাতায় ঘষা লেগে খসখস শব্দ হচ্ছে৷
ফেস্টিভ্যাল হল থেকে বেরিয়ে প্রায় পনেরো-কুড়ি মিটার দূরে টয়লেট৷ জায়গাটা স্কুল-বিল্ডিং-এর পিছনদিক৷ টয়লেটের বাঁ-দিকে রেলিং ঘেরা বাগান৷ আর ডানদিকে ঘোরানো লোহার সিঁড়ি৷
