রিহার্সাল পুরোদমে শুরু হয়ে গেল৷ প্রীতি দত্ত এখনও আসেননি৷ অফিসে কী যেন কাজ করছেন—সেটা সেরেই আসবেন৷ বড়দি যেহেতু রিহার্সালে কখনও আসেন না তাই ওঁর আসাটা একটা বড় ঘটনা৷
ইলিনারা বলাবলি করতে লাগল যে, এবার হয়তো রাশভারী বড়দিকে একটু-আধটু হাসতে দেখা যাবে৷ এ নিয়ে সজনী আর সমর্পিতা বাজিও ধরে ফেলল৷
আজকের সন্ধেটা খুব সুন্দর৷ কোনও বৃষ্টি নেই৷ সূর্য ডোবার পর হালকা ছাই রঙের আকাশ৷ তার ওপরে গাঢ় স্লেট রঙের লম্বা-লম্বা আঁচড়৷ বাতাসে গাছপালার পাতা নড়ছে৷
রিহার্সাল দিতে-দিতে বাইরেটা কখন যেন আঁধার হয়ে গেল৷
ইলিনা অনুষ্কার সঙ্গে গল্প করছিল৷ গত বছরের অ্যানুয়াল ফাংশানের কথা বলছিল৷ কে আবৃত্তি করতে গিয়ে কবিতার লাইন ভুলে গেছে, কে গানে ফার্স্ট প্রাইজ পেয়েছে, কাকলি ম্যাডামের গলা কী মিষ্টি—এই সব গল্প করছিল৷
এর মধ্যে আশাদিকে সঙ্গে করে প্রীতি দত্ত চলে এলেন৷ তিনি এসে পড়ায় অনেকেই তটস্থ হল, আবার খুশিও হল৷ তারপর টিফিনের প্যাকেট আর চা সবাইকে বিলি করা হল৷ সকলেই আনন্দ আর ফুর্তির মেজাজে টগবগ করছিল৷
ইলিনার বেশ ভালো লাগছিল৷ অনুষ্কাও জমজমাট ব্যাপারটা এনজয় করছিল৷ ও কখনও ভাবেনি এত মানুষের মাঝে ও এরকম অস্বস্তিহীনভাবে বসে থাকতে পারবে৷
ইলিনা লক্ষ করল, সম্পি ওর ব্যস্ততার ফাঁকে-ফাঁকে ফেস্টিভ্যাল হলের জানলার কাছে চলে যাচ্ছে৷ বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে দেখছে৷ হয়তো সেই বিপজ্জনক সন্ধেটার কথা ও কিছুতেই ভুলতে পারছে না৷
হলের টিনের চালে থেকে-থেকেই খড়মড় আওয়াজ হচ্ছিল৷ ইলিনা জানে, ওগুলো গাছের শুকনো পাতা আর সরু ডালপালার শব্দ৷ হল ঘিরে যেসব বড়-বড় গাছ দাঁড়িয়ে আছে সেগুলো থেকে প্রায়ই ডালপাতা খসে পড়ে৷ কিন্তু তা সত্ত্বেও ওই আওয়াজগুলো ইলিনাকে অল্প-অল্প ভয় পাইয়ে দিচ্ছিল৷
প্রথমদিন বলে বড়দি সাতটা নাগাদ রিহার্সাল শেষ করে দিতে বললেন৷ ভয় এড়াতে সবাই দলবেঁধে হল থেকে বেরিয়ে মেন গেটের পথ ধরল৷
ইলিনার সঙ্গে পিচের রাস্তা ধরে এগোতে-এগোতে অনুষ্কা বলল, ‘মনে হয়, ভয় কেটে গেছে৷ ওই পিশাচরা ঘুমিয়ে পড়েছে…৷’
‘কী করে বুঝলে?’ ইলিনা অবাক হয়ে তাকাল বেস্ট ফ্রেন্ড-এর দিকে৷
অনুষ্কা বলল, ‘ওদের কেউ হয়তো আমাকে ফেস্টিভ্যাল হলে চিনে ফেলেছে৷ ওরা জানে, আমাদের মতো ভ্যাম্পায়াররা কখনও মানুষের প্রবলেমে ইনভলভড হয় না৷ কিন্তু আমাকে দেখে নিশ্চয়ই ওদের কেউ একজন বুঝেছে আমি তোমাদের প্রবলেমে জড়িয়ে পড়েছি—তোমাদের পাশে দাঁড়িয়েছি…৷’
‘তোমাকে ওরা এত ভয় পায়!’ অবাক হয়ে বলল ইলিনা৷
অনুষ্কা হাসল : ‘খারাপ ভ্যাম্পায়াররা ভালোদের সবসময় ভয় পায়৷ ওরা আমাদের ক্ষমতার কথা জানে৷ তবে এটাও জানে, আমরা সবসময় নিজেদের পরিচয় গোপন রাখতে চাই৷’
‘ওরা নিজেদের লুকিয়ে রাখতে চায় না?’
‘চায়—কিন্তু পারে না৷ রক্তের তেষ্টা ওদের পাগল করে দেয়৷ মানুষের গন্ধ ওদের মাথা খারাপ করে দেয়৷ তা ছাড়া পূর্ণিমার সময় ওদের এই পাগলামিটা মারাত্মক বেড়ে ওঠে৷ তখন ওরা পশু কিংবা মানুষ মেরে তেষ্টা মিটিয়ে উল্লাসে নেচে বেড়ায়—কোনও জ্ঞান থাকে না৷’
‘যেদিন রাতে আমি ওরকম তিনটে পিশাচকে গাছে নাচানাচি করতে দেখেছিলাম সেদিন কি তা হলে পূর্ণিমা ছিল?’
‘বোধহয় ছিল৷ সেদিন মেঘ-বৃষ্টি ছিল—তাই হয়তো বুঝতে পারোনি৷’
ইলিনা কিছুক্ষণ কী যেন চিন্তা করল৷ তারপর ভয়ে-ভয়ে আকাশের দিকে তাকাল৷
দূরে খেলার মাঠের কিনারায় শুকনো মরা গাছটা দাঁড়িয়ে আছে৷ তার ডালপালার আড়ালে চাঁদ দেখা যাচ্ছে৷ প্রায় গোল হয়ে এসেছে৷ কয়েকদিন পরেই শুক্লপক্ষের শেষ—তারপর পূর্ণিমা৷
চাঁদটা অনুষ্কাকে দেখাল ইলিনা : ‘ওই দ্যাখো—ক’দিন পরেই পূর্ণিমা৷’
‘কী করে বুঝলে?’ চাঁদের দিকে তাকিয়ে অনুষ্কা জানতে চাইল৷
‘খুব সোজা৷’ ইলিনা বলল, ‘চাঁদের ওপরদিকটা যদি ডানদিকে হেলে থাকে, তা হলে শুক্লপক্ষ চলছে৷ আর যদি বাঁ-দিকে হেলে থাকে তা হলে কৃষ্ণপক্ষ৷ চাঁদের নীচের দিকের বাঁকটা সেই অনুযায়ী কৃষ্ণপক্ষের ‘ঋ’-ফলা আর শুক্লপক্ষের হ্রস্ব ‘উ’-কারের বাঁকের সঙ্গে বেশ মিলে যায়৷ এটা আমাকে মা শিখিয়ে দিয়েছে—৷’ ইলিনা হাসল৷ কিন্তু তারপরই আসন্ন পূর্ণিমার কথা ভেবে ভয়ের গলায় বলল, ‘পূর্ণিমার সময় ওরা কিছু করতে পারে…৷’
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে অনুষ্কা বলল, ‘শুধু পূর্ণিমা কেন? ভয় তো এমনিতেই আছে, কিন্তু পূর্ণিমার সময় ভয়টা আরও বেশি—’
হঠাৎই একটা ব্যাপার মনে পড়ে যাওয়ায় ইলিনা জিগ্যেস করল, ‘তুমি যে বললে তোমাকে ওরা চিনে ফেলেছে—কী করে চিনতে পারল?’
অনুষ্কা আলতো গলায় বলল, ‘আজ রিহার্সালে আমি টিফিন খাইনি—চা-ও খাইনি৷ সেটা হয়তো ওদের কেউ লক্ষ করেছে৷ তা ছাড়া আমাদের দেখতে খুউব সুন্দর হয়৷ আর আমাদের গা থেকে একটা গন্ধ বেরোয় অনেকটা দারচিনির গন্ধের মতো…৷’
চেনার চিহ্নগুলো মনে-মনে খতিয়ে দেখল ইলিনা৷ তারপর গন্ধটার কথা ওর মনে পড়ল৷ ও অনুষ্কার গাড়িতে আর বাড়িতে এইরকম গন্ধ পেয়েছিল৷ কিন্তু গা থেকে ওরকম গন্ধ বেরোলে তো এখনও সেই গন্ধ ইলিনার নাকে আসার কথা!
ওর মনের কথা কী করে যেন টের পেয়ে গেল অনুষ্কা৷ বলল, ‘ইলিনা, তোমার সঙ্গে আমার একটা মেন্টাল ম্যাচিং হয়ে গেছে৷ অনেকটা যেন রেডিয়ো স্টেশান ধরার টিউনিং-এর মতো৷ তাই তুমি হয়তো দু-একবার আচমকা ওই স্মেলটা পেয়ে গেছ৷ আসলে ওই গন্ধটা কুকুরের নাকে ধরা পড়ে—আর ওই পিশাচদের নাকেও৷ কুকুর প্রায় ন’হাজার রকম গন্ধ চিনতে পারে, মনে রাখতে পারে৷ আমরা প্রায় পাঁচশো রকম গন্ধ চিনতে পারি৷ রনিতা ম্যাডামের মতো পিশাচরাও তাই৷ তবে…৷’
