ইলিনা কোকিলটাকে দেখতে পেয়ে আনন্দে হাততালি দিয়ে উঠল৷ বলল, ‘আমার বহুদিনের একটা ইচ্ছে আজ ফুলফিলড হল—৷’
একটু পরেই পাখিটা উড়ে চলে গেল অন্যান্য গাছের আড়ালে৷
ওরা যখন ফিরে আসছে তখনই ইলিনার চোখে পড়ল, ইট-কাঠের স্তূপের পাশে দুটো লোমশ প্রাণী পড়ে আছে৷
দেখে চেনা গেল৷ একটা কাঠবিড়ালি, আর একটা বেজি৷ দুটো প্রাণী যেন পাশাপাশি ঘুমিয়ে আছে৷
ওরা চট করে সেগুলোর কাছে গিয়ে দাঁড়াল৷ ঝুঁকে পড়ে কাঠবিড়ালির দেহটা হাতে তুলে নিল অনুষ্কা৷
হালকা৷ ফাঁপা৷ বোঝাই যাচ্ছে, ভেতরে সারবস্তু কিছু নেই৷ গলার কাছটায় রক্ত জমাট বেঁধে আছে৷
ইলিনা বেজির দেহটা একবার তুলেই ফেলে দিল৷ সেটাও চরিত্রে কাঠবিড়ালিটার মতো৷
অনুষ্কা বলল, ‘বুঝতে পারছ, ডেডবডিগুলো অন্যরকম?’
‘হ্যাঁ, বুঝতে পারছি—পরানের মতন৷’
‘এগুলো বেশি পুরোনো নয়৷ গন্ধ থেকে বুঝতে পারছি…’ কাঠবিড়ালিটা ফেলে দিল : ‘কিছু একটা করা দরকার…৷’
ইলিনা ঘড়ি দেখল৷ এখুনি টিফিন শেষের ঘণ্টা পড়বে৷ রবিনা ম্যাডামের ক্লাস শুরু হয়ে যাবে৷ তাই ওরা স্কুল বিল্ডিং-এর দিকে প্রায় ছুট লাগাল৷
ওদের এই কয়েকদিনের গোয়েন্দাগিরিতে একটা ব্যাপার ওরা লক্ষ করেছে৷ ক্লাস নাইনের ‘এ’ সেকশানের একজন ছাত্রী আর ক্লাস টেন ‘সি’ সেকশানের একজন ছাত্রী প্রায়ই রনিতা ম্যাডামের সঙ্গে দেখা করতে যায়৷
ইলিনা, সজনী, সমর্পিতা আর অনুষ্কা ওরা যে যখন যা জানতে পারে সেটা এস-এম-এস করে বা ফোন করে বাকিদের জানিয়ে দেয়৷
পরানের মৃত্যুর ঘটনার পর স্কুলের সার্ভেন্টস কোয়ার্টারের সামনে অনেকগুলো বাড়তি আলো লাগানো হয়েছে৷ স্কুল ক্যাম্পাসের রাস্তায় যেসব ল্যাম্পপোস্টের আলো খারাপ ছিল সেগুলো পালটানো হয়েছে৷ এ ছাড়া বড়দি উদ্যোগ নিয়ে জঙ্গলের কিনারায়, বাস্কেটবল গ্রাউন্ড আর ফেস্টিভ্যাল হলের চারপাশে অনেকগুলো নতুন আলোর ব্যবস্থা করে দিয়েছেন৷
এই চেষ্টা দেখে রনিতা ম্যাডাম একদিন ব্যঙ্গ করে সম্পিকে বলেছেন, ‘আলো দিয়ে ভূত তাড়ানোর কনসেপ্ট বহুকাল হল বাতিল হয়ে গেছে৷ আলোয় আমাদের কোনও প্রবলেম নেই৷’ হাসলেন ম্যাডাম৷ তারপর : ‘যখন আমাদের তেষ্টা পায় তখন কীসের আলো আর কীসের অন্ধকার! তুই-ই বল…৷’
সম্পি কোনও জবাব না দিয়ে চলে এসেছিল৷ তারপর স্কুল ছুটির সময় বাকি তিনজন বন্ধুকে খবরটা জানিয়েছিল৷ তারপর বলেছিল, ‘ওর কথার টোনে আমার মনে হয়েছে খুব শিগগিরই ওরা আর-একটা বড় কুকীর্তি করতে চলেছে…৷’
ইলিনা ঠোঁট কামড়ে বলল, ‘রিহার্সাল আবার শুরু হয়েছে৷ আমার মনে হচ্ছে, ওই পিশাচটা যতই বলুক, রাতের আলোতেই ওদের অ্যাক্টিভিটি বেশি…৷’
এই দুশ্চিন্তাটা ইলিনার সঙ্গে বাড়ি পর্যন্ত গিয়েছিল৷ চিন্তায়-চিন্তায় বহুক্ষণ একা-একা ছটফট করার পর ও অনুষ্কাকে ফোন করেছে৷
অনুষ্কা ফোন ধরতেই ইলিনা বলেছে, ‘শোনো, তোমাকে একটা রিকোয়েস্ট করব—৷’
‘বলো৷’
‘কাল থেকে অ্যানুয়াল ফাংশানের রিহার্সাল আবার শুরু হচ্ছে৷ তুমি কাল থেকে রিহার্সালে চলো…৷’
অনুষ্কা ইতস্তত করল : ‘কী করে যাই বলো তো! একে তো কোনও প্রোগ্রামে আমি নাম দিইনি, তার ওপর আমি—মানে, আমরা—মানুষদের এড়িয়ে চলি৷ নইলে ধরা পড়ে যেতে হয়৷ যেমন তোমার কাছে ধরা পড়ে গেলাম৷’
‘কিন্তু তুমি যদি হেলপ না করো তা হলে কেমন করে হয়! তুমিই তো বলেছ, তুমি সব জানো৷ তুমি ভরসা দিয়ে বলেছ ‘‘আমি তো আছি!’’ ফাংশানের রিহার্সাল রোজ সাতটা-সাড়ে সাতটা পর্যন্ত চলবে৷ যদি কারও কোনও বিপদ হয়! যদি সম্পির আবার কোনও বিপদ হয়! ও তো রনিতা ম্যাডামের টার্গেট হয়ে আছে…৷’
অনুষ্কা চুপ করে ভাবছিল৷
ইলিনা আবার বলল, ‘ওসব জানি না, তুমি কাল রিহার্সালে যাবে৷ আর কিছু না পারো অন্তত একটা আবৃত্তি করবে৷ রবিনা ম্যাডামকে বলবে৷ তুমি রিহার্সালে থাকলে আমরা সবাই ভরসা পাব…৷’
কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর অনুষ্কা বলেছে, ‘ঠিক আছে—কাল থেকে আমি রিহার্সালে যাব৷’
আনন্দে ফুলঝুরি হয়ে গেল ইলিনা৷ বলল, ‘থ্যাংক য়ু, মাই বেস্ট ফ্রেন্ড৷’
পরদিন অনুষ্কাকে রিহার্সালে দেখে অনেকেই অবাক হল৷ এই মুখচোরা ইনট্রোভার্ট মেয়েটা অ্যানুয়াল ফাংশানে পার্টিসিপেট করবে! কিন্তু ওকে কেউ অপছন্দ করতে পারল না৷
ইলিনা জানে, অনুষ্কার মধ্যে এমন অনেক নাম-না-জানা গুণ আছে যার জন্য ওকে কেউ অপছন্দ করতে পারে না৷
অনেকদিন পর ফেস্টিভ্যাল হলটা জমজমাট হয়ে ওঠায় ইলিনাদের খুব ভালো লাগছিল৷ ওরা সবাই মিলে কলকল করে এমন গল্পে মেতে উঠল যে, ওদের চুপ করানোর জন্য শম্পা ম্যাডাম, রবিনা ম্যাডাম, কাকলি ম্যাডামকে বেশ কয়েকবার বকুনি দিতে হল৷ তাতে গুঞ্জনের আওয়াজ কমল বটে কিন্তু থামল না৷
রিহার্সালের তদারকিতে সমর্পিতা, অঙ্গনা, সজনী, রবিনা ম্যাডাম সবাই এদিক-ওদিক ব্যস্তভাবে ছুটোছুটি করছিলেন৷ কাকলি ম্যাডাম হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান তোলানো শুরু করে দিয়েছেন৷ শম্পা ম্যাডাম ক্লাস টেনের মধুরিমা আর শ্রাবন্তীকে নাচের একটা মুদ্রা বোঝাচ্ছেন৷
সব মিলিয়ে মনে হচ্ছিল, কিছু একটা হচ্ছে বটে!
একটা অশুভ ঘটনার পর রিহার্সাল আবার শুরু হচ্ছে৷ তাই বড়দি বলেছেন তিনি রিহার্সালে আজ আসবেন—তা হলে সবাই উৎসাহ পাবে৷ তা ছাড়া আগে রিহার্সালে শুধু চা-বিস্কুট খাওয়ানো হত—আজ থেকে বড়দি টিফিন দেওয়ার ব্যবস্থা চালু করেছেন৷ বলেছেন, রিহার্সাল অনেকদিন বন্ধ থাকায় হাতে সময় অনেক কমে গেছে৷ তাই রোজ একটু বেশিক্ষণ ধরে রিহার্সাল করতে হবে আর সেইজন্যই ‘স্পেশাল’ টিফিন৷
