অনুষ্কার মুখচোখ লাল হয়ে উঠল৷ বড়-বড় শ্বাস নিয়ে ও বলল, ‘আমাদের প্রবলেম একটাই : আমরা সেদ্ধ, ভাজা, পোড়ানো—মানে, রান্না করা খাবার একদম খেতে পারি না৷ আমাদের সিস্টেম নেয় না৷ তাই আমরা সবকিছু কাঁচা খাই৷
‘কিন্তু তা বলে আমরা হাল ছাড়িনি৷ আমরা প্রাণপণ চেষ্টা করছি৷ মানুষের বন্ধু হতে চেষ্টা করছি৷ মানুষের মতো হতে চাইছি৷ বিশ্বাস করো, প্লিজ…৷’
অনুষ্কার চোখ দিয়ে জল পড়ছিল৷ যেন হিরের কুচি ওর ফরসা গালের ওপরে চিকচিক করছিল৷
ওর দুঃখী মুখের দিকে তাকিয়ে ইলিনার মনে হল, এ চোখের জল মিথ্যে হতে পারে না৷ এর মধ্যে কোথায় যেন সত্যের ঝিলিক আছে৷
মুহূর্তের মধ্যে ইলিনার মনে এক আশ্চর্য আবেগ তৈরি হয়ে গেল৷ ও সামনে ঝাঁপিয়ে পড়ে অনুষ্কাকে জাপটে ধরল৷ সঙ্গে-সঙ্গে ওর চোখেও জল এসে গেল৷ কান্না জড়ানো গলায় ও বারবার বলতে লাগল, ‘তুমি আমার বন্ধু, অনুষ্কা৷ তুমি আমার বেস্ট ফ্রেন্ড…বেস্ট ফ্রেন্ড…৷’
.
৷৷নয়৷৷
সমর্পিতা যখন স্কুলে আবার এল তখন ওর জ্বর সেরে গেছে, কিন্তু শরীর খুব দুর্বল৷ আগের চেয়ে রোগা দেখাচ্ছে ওকে৷ পিঠের স্কুল-ব্যাগটা প্রকাণ্ড আর বেঢপ মনে হচ্ছে৷
সমর্পিতা এখন অনুষ্কার পাশে বসে৷ ফাঁক পেলেই ওর সঙ্গে গল্প করে৷ আর রনিতা ম্যাডামের ভয়ের কথা আলোচনা করে৷
অনুষ্কার অন্যপাশে বসে ইলিনা৷ অনুষ্কার পাশে বসতে ওর ভালো লাগে তাই৷
অনুষ্কার সঙ্গে আলাপ হওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই সমর্পিতা বুঝতে পেরেছে, অনুষ্কার বুদ্ধি অনেক তীক্ষ্ণ এবং গভীর৷
অনুষ্কার পরামর্শেই এখন ইলিনা, সজনী আর সমর্পিতা মোবাইল ফোন সঙ্গে নিয়ে স্কুলে আসে৷ সেটা হয় সাইলেন্ট মোডে রাখে অথবা অফ করে রাখে৷ কারণ দিদিমণিরা টের পেলেই শাস্তি পেতে হবে৷
সেদিন অনুষ্কার বাড়ি থেকে ফিরে আসার পর ইলিনা রাতে ঘুমোতে পারেনি৷ অন্ধকারে জেগে থেকে শুধু ওই অদ্ভুত মেয়েটার কথা ভেবেছে৷
ভ্যাম্পায়ারের গল্প ইলিনা বইয়ে পড়েছে, দু-একটা সিনেমাতেও দেখেছে৷ কিন্তু বাস্তবে ভ্যাম্পায়ার হয় বলে কখনও ভাবেনি৷ তা ছাড়া ভ্যাম্পায়াররাও যে খারাপ এবং ভালো দু-রকমের হতে পারে সেটাও কখনও ভেবে দেখেনি৷
অনুষ্কা ওকে বলেছে, ‘আমরা কখনও কারও ক্ষতি করি না৷ আমাদের ধর্মে অকারণে শক্তি ব্যবহার করা বারণ৷ আমাদের অনেকরকম সুপার ন্যাচারাল পাওয়ার আছে৷ কিন্তু সেগুলো খুব জরুরি সিচুয়েশান না হলে আমরা ইউজ করি না৷ আমরা সবসময় চুপচাপ থাকি, কারও ব্যাপারে নাক গলাই না৷ কারণ, আমরা…আমরা নিজেদের আসল পরিচয় গোপন রাখতে চাই৷’
অনুষ্কার গোপন কথা ইলিনা কাউকে বলেনি৷ এমনকী মা-বাবাকেও নয়৷
স্কুলে অনুষ্কার পাশে রোজ বসতে পেরে ইলিনার নিজেকে অনেক বেশি সাহসী, শক্তিশালী আর বুদ্ধিমতী মনে হচ্ছিল৷ মনে হচ্ছিল, রনিতা ম্যাডাম—কিংবা ওইরকম কোনও পিশাচ—ওর কোনও ক্ষতি করতে পারবে না৷
ইলিনা পরানের কথা ভাবছিল৷
পরান মারা যাওয়ার পর যে-ঢেউ উঠেছিল সপ্তাহদুয়েকের মধ্যে সেটা থিতিয়ে গেল৷ রাজা চন্দ্রভানু মালটিপারপাস গার্লস স্কুল আবার স্বাভাবিক ছন্দে ফিরে এল৷ এবং স্কুলের অ্যানুয়াল ফাংশানের রিহার্সাল আবার শুরু হয়ে গেল৷ হেডমিসট্রেস প্রীতি দত্ত নোটিশ জারি করে সে-কথা সব ক্লাসে জানিয়ে দিলেন৷
সমর্পিতা মাঝে-মাঝে রনিতা ম্যাডামের সঙ্গে দেখা করে৷ বন্ধুদের বলে ইতিহাস পড়া বুঝতে যাচ্ছে৷ আসলে ও এ-কথাই বলতে যায় যে, ও সেদিনকার কথা কাউকে বলেনি৷
রনিতা ম্যাডামকে দেখে ও অবাক হয়ে যায়৷ এত স্বাভাবিক, এত স্নেহ-মাখানো ব্যবহার! সেদিন কর্কশ-স্বরে-কথা-বলা ভয়ংকর চেহারার যে-পিশাচকে সমর্পিতা দেখেছিল সেটা মনে হয় যেন সত্যি-সত্যি দেখার ভুল, হ্যালুসিনেশান৷
রনিতা ম্যাডামের ওপর নজরদারির কাজটা ইলিনা, সজনী আর সমর্পিতা—তিনজনে মিলে করতে লাগল৷ ওরা চোখ-কান খোলা রেখে খুব সাবধানে পা ফেলতে লাগল৷ আর অনুষ্কাকে সব খবর জানাতে লাগল৷
স্কুলের পিছনদিকে বাউন্ডারি ওয়ালের কাছে অনেক বড়-বড় গাছ আছে৷ সেখানে গাছের ফাঁকে-ফাঁকে অনেক পুরোনো টিন, অ্যাসবেস্টস শিট, ভাঙা কাঠ, আর শ্যাওলা ধরা কয়েকশো ইট ডাঁই করে রাখা আছে৷
একদিন টিফিনের সময় বাইরের মাঠে অনুষ্কা আর ইলিনা গল্প করছিল৷ হঠাৎ কোকিলের মিষ্টি ডাক শোনা গেল৷
স্কুলের বাগানে সবসময়েই কোকিলের ডাক শোনা যায়৷ শুনে মনে হয় কোকিলরা শুধু বসন্তকাল নয়, বর্ষাকালেরও ইজারা নিয়ে নিয়েছে৷ ইলিনার খুব ইচ্ছে যে, ও ‘ডাকন্ত’ কোকিল দেখবে৷ ওর চোখ প্রায়ই সেই দৃশ্যটা খুঁজে বেড়ায়৷ কিন্তু সেই ‘দুর্লভ’ দৃশ্যটা ও আজও খুঁজে পায়নি৷
তাই টিফিনের সময় কোকিলের ডাক শুনেই ইলিনা একেবারে লাফিয়ে উঠল৷ ও অনুষ্কার হাত ধরে টানতে-টানতে ডাকের উৎস লক্ষ করে ছুট লাগাল৷
আন্দাজে ভর করে এদিক-ওদিক ছোটাছুটি করে শেষ পর্যন্ত ওরা চলে এল স্কুলের পিছনের বাউন্ডারি ওয়ালের কাছে৷ গাছপালার অঞ্চলে ঢুকে ওপরদিকে মুখ তুলে গাছের ডালপালা আর পাতার ফাঁকে কোকিলটা খুঁজতে লাগল৷
অনুষ্কাই প্রথম দেখতে পেল পাখিটাকে৷ কুচকুচে কালো রং৷ একটা লম্বা গাছের ওপরদিকে একটা ডালের একেবারে গোড়ায় বসে আছে পাখিটা৷ ‘কু-উ, কু-উ’ করে ডাকছে৷
